বয়স কেবল চুলে পাক ধরায় না, শরীরের ভেতরের জটিল অঙ্গগুলোকেও ধীরে ধীরে বদলে দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গ হলো মস্তিষ্ক। মধ্যবয়সে পৌঁছানোর পর থেকেই মস্তিষ্কে শুরু হয় কিছু সূক্ষ্ম কিন্তু ধারাবাহিক পরিবর্তন, যা বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও ভেতরে ভেতরে প্রভাব ফেলতে থাকে স্মৃতি, মনোযোগ ও চিন্তাশক্তিতে।
Advertisement
গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণত ৩০ বা ৪০ বছর বয়সের পর থেকেই মস্তিষ্কের সামগ্রিক আয়তন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। বয়স ৬০ পেরোলে এই সঙ্কোচনের গতি আরও বাড়ে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মস্তিষ্কের সব অংশ একই হারে ক্ষয় হয় না। কিছু নির্দিষ্ট অংশ বয়সের প্রভাবে তুলনামূলক দ্রুত ও বেশি সঙ্কুচিত হয়।
বয়স বাড়লে মস্তিষ্কে কী ধরনের পরিবর্তন আসে?বয়সের সঙ্গে মস্তিষ্ক সঙ্কুচিত হওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। এটি কোনো রোগ নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের বাইরের কুঁচকানো স্তর, যাকে সেরিব্রাল কর্টেক্স বলা হয়, ধীরে ধীরে পাতলা হতে থাকে। এই স্তরই মূলত আমাদের চিন্তা, সিদ্ধান্ত, আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষ করে দুটি অংশে বয়সজনিত পরিবর্তন বেশি লক্ষ করা যায়। যথা-
ফ্রন্টাল লোব: মস্তিষ্কের সামনের অংশে অবস্থিত ফ্রন্টাল লোব বয়সের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি সঙ্কুচিত হয়। এই অংশ স্মৃতি ধরে রাখা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, আত্মসংযম, সমস্যা সমাধান, সামাজিক আচরণ এবং শরীরের নড়াচড়া পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়া, মনোযোগ কমে যাওয়া বা আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
Advertisement
টেম্পোরাল লোব: কানের পেছনের দিকে থাকা টেম্পোরাল লোবের কিছু অংশও ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে যায়। এই অংশটি কথা বলা, শোনা, পড়া, লেখা এবং শব্দের অর্থ বোঝার সঙ্গে যুক্ত। তাই বয়স বাড়লে অনেকের শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা হয় বা নতুন তথ্য মনে রাখতে কষ্ট হয়।
‘লাস্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ তত্ত্ব কী?বিশেষজ্ঞদের মতে, কৈশোর ও তারুণ্যে যেসব মস্তিষ্কের অংশ সবচেয়ে দেরিতে পরিপক্ব হয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোই আগে ক্ষয় হতে শুরু করে। এই ধারণাকেই বলা হয় ‘লাস্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ তত্ত্ব। অর্থাৎ, যেসব অংশ সবচেয়ে শেষে বিকশিত হয়, সেগুলো বয়সের আঘাতে প্রথম দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই অংশগুলোর ভেতরে থাকে গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুতন্তু ও নিউরনের সংযোগ, যা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ এবং শরীরের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের কাজ করে। বয়সজনিত সঙ্কোচনের ফলে এই সংযোগগুলো দুর্বল হয়ে যায় এবং স্নায়ুর রাসায়নিক বার্তাবাহক ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসে।
আরও পড়ুন: চোখের অসুখ নাকি সাধারণ মাথাব্যথা? যা বলেছেন চিকিৎসকমন ভালো রাখার ছোট ছোট অভ্যাসস্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে চোখের পানি দ্রুত শুকিয়ে যায়
Advertisement
• স্মৃতি দুর্বল হয়ে যাওয়া বা বারবার ভুলে যাওয়া• কথা বলতে বা ভাব প্রকাশে ধীরগতি• পরিচিত শব্দ বা নাম মনে করতে কষ্ট হওয়া• নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে অসুবিধা• আঘাত বা অসুস্থতায় প্রদাহের প্রবণতা বাড়া• স্নায়ুকোষের যোগাযোগ কমে যাওয়ায় কাজের গতি ধীর হওয়া• মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়া
এই পরিবর্তনগুলোকেই অনেক সময় বয়সজনিত মানসিক সক্ষমতা হ্রাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
বয়স বাড়লেও কীভাবে মস্তিষ্ক সুস্থ রাখা যায়?বার্ধক্য থামানো সম্ভব নয়, তবে কিছু অভ্যাস গড়ে তুললে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য অনেকটাই ধরে রাখা যায়। যেমন-
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন: নিয়মিত হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম শরীরের পাশাপাশি মস্তিষ্কেও রক্তপ্রবাহ বাড়ায়। এতে মানসিক চাপ কমে এবং স্মৃতিশক্তি ভালো থাকে।
স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিন: হৃদ্যন্ত্রের জন্য উপকারী খাবার মস্তিষ্কের জন্যও ভালো। তাজা ফল, শাকসবজি, মাছ, কম চর্বিযুক্ত মাংস ও চামড়াহীন মুরগি খাদ্যতালিকায় রাখুন।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন: বয়স বাড়লে অতিরিক্ত মদ্যপান স্মৃতিভ্রংশ, বিভ্রান্তি ও মানসিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ায়।
মানসিকভাবে সক্রিয় থাকুন: নিয়মিত পড়াশোনা, শব্দের খেলা, নতুন কোনো দক্ষতা শেখা, বাদ্যযন্ত্র চর্চা বা নতুন শখ মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে।
সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখুন: পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এতে একাকিত্ব ও বিষণ্নতা কমে।
হৃদ্রোগজনিত সমস্যার দিকে নজর দিন: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মস্তিষ্কের ক্ষতি দ্রুত বাড়তে পারে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রয়োজন।
ধূমপান ছাড়ুন: ধূমপান বয়সজনিত মানসিক অবক্ষয় ত্বরান্বিত করতে পারে। তাই এটি ত্যাগ করাই শ্রেয়।
ভিটামিন বি এবং মস্তিষ্কের সম্পর্কভিটামিন বি–এর বিভিন্ন ধরন স্নায়ুর কার্যকারিতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ঘাটতি হলে মস্তিষ্ক দ্রুত সঙ্কুচিত হতে পারে এবং ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ে। সাধারণত সুষম খাদ্য থেকেই ভিটামিন বি পাওয়া সম্ভব। যেমন-
• কালো মটর, ছোলা ও বিভিন্ন ডাল• কিডনি বিন বা পিন্টো বিন• ছোলা দিয়ে তৈরি হুমাস• টোফু ও শাকসবজি
তবে কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে ভিটামিন বি শোষণে বাধা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।
তথ্যসূত্র: ওয়েবএমডি
জেএস/এএসএম