মতামত

ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট অপহরণের নেপথ্য খতিয়ান

পৃথিবী কীভাবে চলছে তার আরেকটি জলবৎ উদাহরণ দেখা গেল। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ৩ জানুয়ারি রাতে দেশটির রাজধানী কারাকাসের প্রেসিডেন্ট প্যালেস থেকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই বিশ্বব্যাপী এ নিয়ে আলোচনা চলছে। এ আলোচনায় সরব আমাদের দেশের চায়ের দোকান, পানের দোকানও। অবাক কাণ্ডই তো! এক দেশের প্রেসিডেন্টকে আরেক দেশের প্রেসিডেন্টের আদেশে ধরে নিয়ে যাওয়া আধুনিককালে বিরল ঘটনাই বটে।

Advertisement

একই কাণ্ড যদিও যুক্তরাষ্ট্র পূর্বেও ঘটিয়েছিল। তবে মাদুরোকে সস্ত্রীক ধরে নিয়ে যাওয়া অপ্রত্যাশিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র যে ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ করতে যাচ্ছে সেটা বোঝা গিয়েছিল ২০২৫ সালের জুলাই-অগাস্ট মাসেই। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনিজুয়েলা ঘিরে ফেলে। তখন উচ্চৈঃস্বরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দোষারোপ করতে থাকেন, ভেনিজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের জন্য দায়ী। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে নারকো টেরোরিস্ট বা মাদক সন্ত্রাসী হিসাবে আখ্যায়িত করেন। শুধু দায়ী করা নয় প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে গত বছর সেপ্টেম্বর মাসের ২ তারিখে প্রথম ভেনিজুয়েলার উপকূলে একটি নৌযানে হামলা চালিয়ে ১১ জনকে হত্যা করে। তারপর থেকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র সীমায় প্রবেশ করামাত্র একের পর এক কমপক্ষে ২০টি ছোট বড় নৌযানে হামলা চালিয়ে ভেনিজুয়েলার প্রায় ১০০ ব্যক্তিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা।

প্রথম ১১ জনের মৃত্যুর একটি করুণ কাহিনীও আছে। যে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী বিনা বিচারে হত্যার সবক দিয়ে বেড়ায়, বিভিন্ন সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করে, সেই যুক্তরাষ্ট্রই ওই ১১ জনের উপর হামলা করেই ক্ষান্ত হয়নি। ক্যারিবিয়ান সাগরে ওই নৌকায় থাকা ৯ জন নিহত হলেও দুজন প্রথম আক্রমণে প্রাণে বেঁচে যায়। সেই প্রাণে বাচার ভাগ্যকেও ভোগ করতে দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয়বার হামলা করে অথৈ সমুদ্রে হত্যা করার আদেশ দেন যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স সেক্রেটারি পিট হেগসেথ এবং ওই দুজন হতভাগ্যের মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট সে সংবাদ প্রকাশ করে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনো প্রমাণ নেই অথবা তারা কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি যে ওই নৌযানে কোনো মাদক পাচার হচ্ছিল। সত্যিই কি ভেনিজুয়েলা এভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকহারে মাদক পাচার করে? এক কথায় উত্তর হল, না। পরিসংখ্যান আছে যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা মাদকের মাত্র ১০ শতাংশেরও কম যায় ভেনিজুয়েলা থেকে। ৯০ থেকে ৯৪ শতাংশ প্রবেশ করে মেক্সিকো থেকে। কিন্তু মাদকের নামে যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেটে পরিণত হয় ভেনিজুয়েলা।

Advertisement

কেন যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলাকে টার্গেট করেছে তা বোদ্ধাদের কাছে তখনই পরিষ্কার হয়েছিল। ওই সেপ্টেম্বর মাসেই রাজনীতি সচেতন পশ্চিমারা নিশ্চিত ছিলেন যে ট্রাম্প ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ করতে যাচ্ছেন। যদিও আমাদের অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত এবং অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। ভেনিজুয়েলায় হস্তক্ষেপের বেশ কয়েকটি কারণ একসঙ্গে জড়ো হয়েছিল। এর প্রথম এবং প্রধান কারণ দেশটির তেল। বিশে^র সবচেয়ে বড় তেলের ভাণ্ডার ভেনিজুয়েলা। কিন্তু বহু কারণে সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলির মত ভেনিজুয়েলা আগাতে পারেনি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঠিক এই মুহূর্তে ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি আমেরিকানের মাথাপিছু ১ লাখ ২৬ হাজার ডলার দায়। হু-হু করে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। ২০২৫ সালে বাসাবাড়ির বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ৬.৯ শতাংশ। এই অবস্থায় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ পরিশোধের অথবা জীবন যাত্রার মান স্থিতিশীল রাখার কোনো পথই খোলা নেই, একমাত্র বাহুবল প্রয়োগ করে অন্যের সম্পদে হাত দেওয়া ছাড়া। যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবটা পরিষ্কার: সৌদি আরবের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ তেল এবং খনিজ মূল্যবান ধাতু ভেনিজুয়েলায় পড়ে থাকবে আর যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে হিমশিম খাবে তা তো হতে পারে না!

কারাকাসে হামলার দ্বিতীয় নেপথ্য কারণটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মাদুরো বলিভিয়ার ক্যারিশম্যাটিক নেতা হুগো শ্যাভেজের শিষ্য এবং বলিভারিয়ান। দেশটির অফিসিয়াল নামই হল, বলিভারিয়ান রিপাবলিক অব ভেনিজুয়েলা। অর্থাৎ সিমন দি বলিভারের অনুসারী দেশটি মার্কসিস্ট-স্যোসালিস্ট। এই লেফট বা বাম হল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় এলার্জি, চক্ষুশুল এবং আতঙ্ক। অধিকন্তু চিন ও রাশিয়ার সরাসরি বাণিজ্য ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হুমকি বলে মনে হয়েছে।

মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার এই পরিকল্পনা ছিল সত্যিই মেটিকুলাসলি ডিজাইনড। যুক্তরাষ্ট্র অতি গোপনে রিহার্সেল দিয়েছে। মাদুরো কোন রুমে থাকেন, কখনো কোন রুমে ঘুমান, কীভাবে তাকে পাকওড়াও করা হবে সবকিছুর একটি রেপ্লিকা করে তারা অতি গোপনে বারবার রিহার্সেল দেয়। এদিকে গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকে অপারেশনের জন্য সম্পূর্ণ মুক্ত করে দেওয়া হয়। তারা ভেনিজুয়েলার কিছু মানুষকে কিনে ফেলে। এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে ভেনিজুয়েলার সাইবার সক্ষমতাকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়। ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

Advertisement

এই ভেনিজুয়েলার দিকে ঈগলের চোখ হঠাৎ পড়েনি। ১৯৯৮ সালে হুগো শ্যাভেজ নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এলে শুরু হয় পশ্চিমা বিশ্বের অসহযোগিতা। তথাপি প্রেসিডেন্ট মাদুরোর গুরু হুগো শ্যাভেজ দেশটির চেহারা পাল্টে দিয়েছিলেন। তিনি হতদরিদ্রের হার ৭০ শতাংশ কমিয়ে এনেছিলেন, দরিদ্রের হার ৫০ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলেন। বেকারত্বের হার অর্ধেকে নামিয়ে এনেছিলেন। শিক্ষার হার শতভাগে উন্নীত করেছিলেন। এবং শ্যাভেজ দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে আয়-বৈষম্য সবচেয়ে নিচে নামিয়ে এনেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতা মাদুরো রাখতে পারেননি পশ্চিমের অব্যাহত অসহযোগিতার কারণে। তবে এটাও ঠিক, মাদুরো গুগো শ্যাভেজের মত পপুলার শাসক হতে পারেননি, সরকার পরিচালনায় দক্ষতা দেখাতে পারেননি। দ্বিতীয়ত ২০০১ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় ভেনিজুয়েলার উপর তার ব্যাপক প্রভাব পড়তে থাকে দেশটিতে। ওই নিষেধাজ্ঞাগুলো শুরু হয় ভেনিজুয়েলার জাতীয় সম্পদগুলো হুগো শ্যাভেজের সময়ে জাতীয়করণের পর থেকেই। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোকে সরে আসতে হয়। বিশেষ করে ২০১৩ সালের পর থেকে দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করতে থাকে।

অবশ্য ভেনিজুয়েলার সরকারের একটি বিশেষ দুর্বলতা ছিল তাদের রাষ্ট্রীয় নীতিমালায়। তারা সম্পূর্ণরূপে তেল নির্ভর হয়ে পড়েছিল। ফলে ভেনিজুয়েলার কৃষিখাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো মার খেতে থাকে বহুবিধ কারণে। হয়ে ওঠে আমদানি নির্ভর। দেশটির অর্থনীতি তেল নির্ভর হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেই ভেনিজুয়েলায় দেখা দিতে থাকে মারাত্মক সংকট।

অন্যদিকে একের পর এক পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা। এই সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভেনিজুয়েলায় বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। বিশেষ করে টায়ার কোম্পানিগুলো, বিমান কোম্পানি, কৃষিজাত দ্রব্যের কোম্পানিগুলো ব্যবসা গুটিয়ে নিলে মূল্যস্ফীতি তুঙ্গে ওঠে। ২০১৮ এর নির্বাচনে মাদুরো নিজেকে জয়ী ঘোষণা করেন এবং প্রতিপক্ষ জুয়ান গুইডেকে সব পশ্চিমা দেশ সমর্থন দেয়। এরপর পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যায়। মুদ্রাস্ফীতি ৮০০ শতাংশে উঠে যায়।

মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার এই পরিকল্পনা ছিল সত্যিই মেটিকুলাসলি ডিজাইনড। যুক্তরাষ্ট্র অতি গোপনে রিহার্সেল দিয়েছে। মাদুরো কোন রুমে থাকেন, কখনো কোন রুমে ঘুমান, কীভাবে তাকে পাকওড়াও করা হবে সবকিছুর একটি রেপ্লিকা করে তারা অতি গোপনে বারবার রিহার্সেল দেয়। এদিকে গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকে অপারেশনের জন্য সম্পূর্ণ মুক্ত করে দেওয়া হয়। তারা ভেনিজুয়েলার কিছু মানুষকে কিনে ফেলে। এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে ভেনিজুয়েলার সাইবার সক্ষমতাকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়। ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্র খুব ভালো করে জানে, বিশ্বব্যাপী মানুষ বিদেশিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ষড়যন্ত্র করা ব্যক্তিদের পছন্দ করে না। তাই এখন বিশ্বব্যাপী প্রচারমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং পেট্রোলিয়ম মন্ত্রী ডেলসি রড্রিগেজ এবং তার ভাই প্রেসিডেন্ট অব দি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি অব ভেনিজুয়েলা ইয়র্গ জেসাস রড্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই অপারেশনে যুক্ত ছিল! বলা হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় ডেলসি এবং তার ভাই ইয়র্গ। কিন্তু এটি প্রায় অসম্ভব। কারণ তাদের পিতা ভেনিজুয়েলার সোস্যালিস্ট লীগের প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্টোনিয় রড্রিগেজকে ঠিক ৫০ বছর আগে সিআইএ অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে বন্দী অবস্থায়।

ওই ঘটনার এখন তথ্য প্রমাণও আছে। তখন দুই ভাই বোন ছিলেন ৭ এবং ৫ বছরের শিশু। পিতা রড্রিগেজকে এত নির্যাতন করা হয় যে তার পাঁজরের ২৬ টি হাড় ভেঙে গিয়েছিল। ডেলসি মাদুরোর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং একই আদর্শের মানুষ। সুতরাং তেল একেবারে বিনা বাক্যব্যয়ে ছেড়ে দেবেন তা মনে হয় না। তাই তাকে ভালনারাবল করতে চলছে খেলা। সবাইকে তো আর ধরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

অপরদিকে মারিয়া কোরিনো মাচাদোকে নিয়ে সমস্ত পশ্চিমা জগত লাফালাফি করছে। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে এ বছর তাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল। এই মাচাদো ভেনিজুয়েলার অত্যন্ত ধনী পরিবারের মেয়ে। তার পিতা হুগো শ্যাভেজের জাতীয়করণের পূর্বে ভেনিজুয়েলার বিদ্যুৎ এবং স্টিলের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। মাচাদো আজন্ম ভেনিজুয়েলার শ্যাভেজদের বিরুদ্ধে এবং পশ্চিমা মতাদর্শে বিশ্বাসী। ভেনিজুয়েলায় আসলে যা যা চোখে পড়ছে তার অন্দরমহলেও অনেক নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে।

লেখক: আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।

এইচআর/এমএস