প্রবাস

রাষ্ট্রের নীরবতা এবং জাতির প্রশ্ন

৩ ডিসেম্বর ২০২৫ একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিয়েছিলাম। সেখানে কোনো আবেগ ছিল না। ছিল কেবল একটি তথ্যের ইঙ্গিত। আগামীকাল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হেলিকপটারযোগে সরাসরি এভার কেয়ার হাসপাতালে তারেক রহমান আসবেন, তার মাকে দেখতে। বাকি সব পরে জানানো হবে।

Advertisement

এই একটি বাক্য দেশ-বিদেশে অসংখ্য মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দেয়। অনেকে ফোন করেন। অনেকে বার্তা পাঠান। সবাই জানতে চান এটি সত্য কি না। কারণ বাংলাদেশে এখন সত্য আর গুজবের সীমারেখা প্রায় অদৃশ্য।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আমি কোনো দলের মুখপাত্র নই। রাষ্ট্রবিরোধী নই। কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভাষ্য বহন করছি না। শুধু একজন নাগরিক, যে প্রশ্ন করতে চায়। কারণ প্রশ্ন করার অধিকার হারালে রাষ্ট্র টিকে থাকে না।

একটি বিশেষ বিশ্বস্ত সূত্র থেকে আমি জেনেছিলাম, সেদিনই বেগম খালেদা জিয়া এভার কেয়ার হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে সর্বোচ্চ সম্মান জানানো হয়। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

Advertisement

রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতার কাঠামো নয়। রাষ্ট্র হলো জবাবদিহি। রাষ্ট্রের কাজ সন্দেহ দূর করা, সন্দেহ তৈরি করা নয়। যখন রাষ্ট্র নীরব থাকে, তখন প্রশ্ন জন্ম নেয়। আর প্রশ্ন জমতে জমতে এক সময় রাষ্ট্রকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

ঠিক সেই সময় আরেকটি ঘটনা ঘটে। ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা সত্ত্বেও কেন তাদের সম্পূর্ণভাবে গ্রেপ্তার করা হলো না। কেন সেফ এক্সিট নিশ্চিত করা হলো। কেন রাষ্ট্র এখানে কঠোর হলো না। এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর আজও নেই।

এরপর হঠাৎ করেই রাজনৈতিক ঘোষণা আসে। তারেক রহমান ২৫ তারিখে দেশে ফিরবেন। কী আশ্চর্য সমাপতন। একটি মৃত্যু আর একটি প্রত্যাবর্তনের মাঝখানে রাষ্ট্র যেন নিঃশব্দ পরিচালক।

ঘটনার মোড় দ্রুত পাল্টাতে থাকে। হাদিকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। পরে তার মৃত্যু হয়। লাশ ফিরে আসে। লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে হাদির ছায়া পড়ে। শিক্ষার্থীরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে। কিন্তু রাষ্ট্র যেন শুনতে পায় না।

Advertisement

হঠাৎ এ সময় বেগম জিয়ার নাম হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়। কোনো শোক নেই। কোনো রাষ্ট্রীয় ভাষ্য নেই। কোনো সংবাদ সম্মেলন নেই। কোনো স্বচ্ছতা নেই।

তারেক রহমান দেশে ফেরেন। জনসমুদ্র সৃষ্টি হয়। ঢাকা শহর কড়া নিরাপত্তার বেষ্টনীতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তিনি এভার কেয়ারে যান। কিন্তু তার মায়ের বিষয়ে একটি কথাও শোনা যায় না। নেই আবেগ। নেই স্মৃতি। আছে শুধু জাতির সন্দেহ।

মনে হয় তিনি যেন এই গ্রহের মানুষ নন। কাচের ভেতর থেকে যাকে মানুষ দেখতে চায়, কিন্তু ছুঁতে পারে না। ড. ইউনূসের কণ্ঠ শোনা যায় না। উপদেষ্টা পরিষদ নীরব। প্রশাসন জানে না বলে জানায়। কিছু ইউটিউবার এবং কিছু বিশ্লেষক ইচ্ছেমতো যা ভাবছেন, তা বলছেন। কথা তো দুটোই হতে পারে, সত্য অথবা মিথ্যা। রাষ্ট্র কিন্তু কোনো অবস্থান নেয় না।

ইতিহাস বলে, যখন রাষ্ট্র নীরব থাকে, তখন গুজব নয়, বিপর্যয় জন্ম নেয়। কোনো রাষ্ট্রই সন্দেহের ওপর দাঁড়িয়ে টিকে থাকতে পারেনি। ইতিহাস সব সময় দেরিতে কথা বলে, কিন্তু নিষ্ঠুরভাবে বলে।

একটি জাতি ভিমরতিতে আক্রান্ত। বিভ্রান্তি এখন নিত্যসঙ্গী। সবাই জানে কিছু একটা ঠিক নেই। কিন্তু কেউ কথা বলে না। কারণ প্রশ্ন এখন নিরাপদ নয়। নীরবতাই এখন নিরাপত্তা।

যাইহোক, সকল জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ৩০ ডিসেম্বর দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর ঘটনা তার পরিবারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়। শহীদ জিয়ার কবরের পাশে তার দাফন সম্পন্ন করা হয় লাখো লাখো মানুষের উপস্থিতিতে।

অন্যদিকে, ওসমান হাদির মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে রাষ্ট্র কর্তৃক ঘোষিত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনো পর্যন্ত আমরা দেখতে পাইনি। এদিকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় চলছে।

ড. ইউনূস হয়তো নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সরে পড়তে চান। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, এই শূন্যতার দায় কে নেবে।

আমি ভাবি, শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো হলো কেন। কেউ কি জানত না এরপর কী হবে। এত জ্ঞানী গুণী মানুষের ভিড়ে কেউ কি অনুমান করতে পারেনি, রাষ্ট্র আরও অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যাবে।

আজ মানুষ জানতে চায়, তারেক রহমানের বিএনপির কী অবস্থা। এনসিপির ভবিষ্যৎ কী। জামায়াত কি পারবে রাষ্ট্র সামলাতে নাকি আমরা ধীরে ধীরে একটি জাতি হিসেবে হারিয়ে যাচ্ছি।

এই প্রশ্নগুলো ষড়যন্ত্র নয়। এই প্রশ্নগুলো বিদ্রোহও নয়। এগুলো একটি জাতির বেঁচে থাকার আকুতি। রাষ্ট্র যদি কথা না বলে, তবে গুজব কথা বলবে। ইতিহাস যদি স্বচ্ছ না হয়, তবে সন্দেহই ইতিহাস হয়ে উঠবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের গত প্রায় আঠারো মাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার দরকার ছিল, সেটি হলো নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। কিন্তু দুঃখজনক হলো, অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া স্বৈরাচারী নির্বাচন কমিশনের কোনো সংস্কার ছাড়াই জাতীয় নির্বাচনের পথে গেছে। নির্বাচনের আগেই নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও জনগণের মনে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে সংস্কার ছাড়া কোনোভাবেই এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। একটি মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর এ দেশের জনগণকে আবারও আন্দোলনের পথেই যেতে হবে।

এই লেখা কোনো সিদ্ধান্ত দেয় না। এটি শুধু একটি আয়না। যেখানে রাষ্ট্র তার মুখ দেখতে ভয় পাচ্ছে। আর নাগরিক তাকিয়ে আছে কাঁপা চোখে। রাষ্ট্র যদি আজ সত্য না বলে, কাল ইতিহাস রাষ্ট্রের হয়ে কথা বলবে না। খুব জানতে ইচ্ছে করে। কবে আমরা সত্য জানতে পারব। কবে রাষ্ট্র কথা বলবে। কবে ইতিহাস অন্ধকার ছেড়ে আলোয় আসবে।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com

এমআরএম/এমএস