দেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ভুল ও চাকরিনির্ভর ডিগ্রিকেন্দ্রিক। এতে শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যেন তারা কেবল চাকরির আবেদন লিখতে পারেন।
Advertisement
তিনি বলেন, মানুষ দাস হিসেবে জন্মায় না, মানুষ জন্মায় সৃজনশীল সত্তা হিসেবে। দাসত্বের ঐতিহ্য থেকেই ‘চাকরি’ ধারণার জন্ম, যা মানুষের সৃজনশীলতা কেড়ে নেয়। সৃজনশীল মানুষকে দাসে পরিণত করা একটি অপরাধমূলক কাজ।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানীতে ‘উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা–২০২৬’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের মূল দর্শনে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা সার্ক শব্দটাই ভুলে গেছি, যা আমাদের জন্য লজ্জার। সার্কের উদ্দেশ্য ছিল একত্রিত হওয়া, মতবিনিময় করা এবং একে অপরের কাছ থেকে শেখা।’
Advertisement
ঢাকায় সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘ঢাকায় কিছু একটা ঘটেছিল বলেই আমি ও আমার সহকর্মীরা আজ এখানে আছি।’
তিনি বলেন, তরুণরা কোনো আকস্মিক আবেগে নয়, বরং সুপরিকল্পিতভাবে রাস্তায় নেমেছিল। তারা রুখে দাঁড়িয়ে আওয়াজ তুলেছে এবং এমন এক শক্তিকে উৎখাত করেছে, যা কল্পনাতীত ছিল। বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে তারা জেনেশুনেই জীবন দিয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় এক স্কুলছাত্র চিঠিতে তার মাকে লিখেছিল—‘মা, আমাকে মাফ করে দিও… আমি তো কাপুরুষ নই। ঢাকায় যা ঘটেছে, তা নেপাল বা শ্রীলঙ্কার ঘটনাকেও ছাড়িয়ে গেছে।’
ড. ইউনূস বলেন, আন্দোলনকারী ছাত্ররা একটি নিজস্ব চার্টার তৈরি করেছে এবং বর্তমান সংবিধান পরিবর্তনের দাবিও তুলেছে। তাদের মতে, বিদ্যমান সংবিধানই সমস্যার মূল।
তিনি বলেন, ছাত্ররা এরই মধ্যে নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করেছে এবং শিগগির নির্বাচনি রাজনীতিতে সক্রিয় হবে। যারা গতকাল ক্লাসরুমে ছিল, তারা আজ রাস্তায় এবং আগামীতে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে যাবে। পুরোনো ব্যবস্থায় চলা আত্মঘাতী উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্রুত পরিবর্তন আনা এখন অপরিহার্য।
Advertisement
শিক্ষা সংস্কারে ছাত্রদের সরাসরি সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘আমি আপনাদের বলবো— ওই ছাত্র নেতাদের কয়েকজনকে আমন্ত্রণ জানান। তাদের জিজ্ঞেস করুন, কেন তারা ক্লাসরুম ছেড়ে রাস্তায় এলো। শিক্ষা একপাশে আর তরুণরা অন্যপাশে— এ অসামঞ্জস্য টিকে থাকতে পারে না।
তিনি বলেন, ‘সৃজনশীলতাই উদ্যোক্তা হওয়ার মূলভিত্তি। কেন আমরা তরুণদের চাকরিপ্রার্থী না হয়ে চাকরিদাতা হতে শেখাতে পারি না? তরুণরাই পরিবর্তনের দূত। কল্পনাশক্তিই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু আমরা শিশুদের বলি— বাস্তববাদী হও। মানুষ বাস্তববাদী হওয়ার জন্য জন্মায়নি।’
ঢাকার দেয়ালচিত্রের উদাহরণ দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ঢাকার রাস্তায় ঘুরলেই দেয়ালে দেয়ালে ছবি দেখা যায়। এসব তরুণ কেউ পেশাদার শিল্পী নয়, তারা সাধারণ পরিবারের সন্তান, নিজের টাকায় রং কিনে দেয়ালে সমাজের ভুলগুলো তুলে ধরেছে। সৃজনশীল শিক্ষা আসলে ওই রাস্তাতেই ছিল, কিন্তু আমরা তা উপলব্ধি করিনি।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘শিগগির ছাত্ররা প্রশ্ন তুলবে— শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত। তারা নিজেরাই শিক্ষা কেমন হবে তার সংজ্ঞা দেবে, আর আমাদের দায়িত্ব হবে তাদের সহায়তা করা।’
তিনি আরও বলেন, এখন শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। যেসব মেয়েকে একসময় ঘরে আটকে রাখা হতো, তারা আজ রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের কথা বলছে।
বক্তব্যের শেষাংশে আঞ্চলিক ঐক্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আমরা একটি পরিবার। রাজনীতিবিদরা আমাদের তা ভুলিয়ে দিতে চায়, তাই নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করা জরুরি।
এমইউ/এমএএইচ/এমএস