মতামত

স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে: আইনি দিক

মুসলিম শরিয়াহ আইন অনুযায়ী একজন পুরুষ একসঙ্গে একাধিক স্ত্রী রাখতে পারেন। হিন্দুদের ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইন অনুযায়ী যে কোনো সংখ্যক বিয়ে করার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মেই বহুবিবাহের অনুমতি রয়েছে শুধু পুরুষদের ক্ষেত্রে। ব্যতিক্রম শুধু হিন্দু ও মুসলিম নারীদের ওপর প্রযোজ্য। তবে আইনানুগভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ করলে পুরুষ বা নারীর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বা একাধিক বিয়ে করতে কোনো বাধা নেই।

Advertisement

বাংলাদেশের মুসলিম পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ে করতে আর স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না বলে হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন, এরকম একটি সংবাদ ও ফটোকার্ড সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা ও বিতর্ক।

বহুবিবাহের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতি লাগবে কি না এ বিষয়ে একধরনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ বিষয়টি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে উঠলেও মুসলিমদের পুনরায় বিয়ের ক্ষেত্রে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের লিখিত অনুমতির যে বিধান আগে ছিল সেটিই বহাল রাখা হয়েছে। ফলে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের ৬ ধারার (বহুবিবাহের বিধান) কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের আইনটিই বহাল আছে। কাজেই স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া আবার বিয়ে করা যাবে- এমন দাবি সঠিক নয়।

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৬ ধারামতে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিশি পরিষদের কাছে অনুমতি না নিলে বিয়ে নিবন্ধন হবে না। অনুমতির জন্য নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদন এ স্ত্রীর সম্মতির বিষয়টি উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। হাইকোর্টের রায়ে স্ত্রীর সম্মতিসহ আরবিট্রেশন কাউন্সিলের মাধ্যমেই বিয়ের অনুমতির যে পদ্ধতি সেটাই বহাল আছে।

Advertisement

মুসলিম পারিবারিক আইন বিধিমালা, ১৯৬১ এর বিধি ১৪ এবং ১৫ তে স্ত্রীর সম্মতির প্রয়োজনীয়তা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বিয়ে ন্যায়সঙ্গত হবে তা বলা হয়েছে।

বিধি-১৪ তে বলা আছে, একটি বর্তমান বিয়ে বলবৎ থাকাকালীন অন্য একটি প্রস্তাবিত বিয়ে ন্যায়সঙ্গত এবং প্রয়োজনীয় কি না তা বিবেচনার সময় সালিশি পরিষদ নিম্নলিখিত পরিস্থিতিগুলির দিকে নজর রাখবেন-

১. বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব, ২. শারীরিক মারাত্মক দুর্বলতা, ৩. দাম্পত্য জীবন সম্পর্কিত শারীরিক অযোগ্যতা, ৪. দাম্পত্য অধিকার পুনর্বহালের জন্য আদালত থেকে প্রদত্ত কোনো আদেশ বা ডিক্রি বর্জন, ৫. মানসিকভাবে অসুস্থতা ইত্যাদি।

তাছাড়া বিধি-১৫ তে বলা আছে. একটি বর্তমান বিয়ে বলবৎ থাকাকালীন অন্য একটি বিয়ে চুক্তি করার অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে ৬ ধারার ১ উপধারায় কোনো দরখাস্ত লিখিতভাবে করতে হবে। এখানে বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না তা বর্ণনা করতে হবে। যে কারণগুলোর ভিত্তিতে নতুন বিয়ে ন্যায়সঙ্গত এবং প্রয়োজনীয় বলা হয়েছে সেগুলো সংক্ষিপ্তভাবে দরখাস্তে বর্ণনা করতে হবে।

Advertisement

বহু বিবাহের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা বিবেচনা করার জন্য সালিশি পরিষদ তার সুচিন্তিত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। তাই বর্তমান স্ত্রী অনুমতি দিলেও সালিশি পরিষদ বহু বিবাহের অনুমতি দিতে বাধ্য নয়।

কোনো পুরুষ যদি সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি অবিলম্বে তার বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের আশু বা বিলম্বিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা সাথে সাথে পরিশোধ করতে হবে। বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীরা আদালতে মামলা করে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করার অধিকার রাখেন। দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে প্রথম স্ত্রী আলাদা বসবাস করার সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি ভরণ-পোষণ পাবেন। এক্ষেত্রে নাবালক সন্তানদের ভরণ-পোষণ দিতে হবে বাবাকে।

ভরণ-পোষণের পাশাপাশি স্ত্রী ও সন্তানদের উত্তরাধিকারীর অধিকার কোনো অবস্থায়ই খর্ব হবে না। এছাড়া স্বামী অনুমতি না নেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে এক বছর পর্যন্ত জেল ও ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

তাছাড়া প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রতিকার পেতে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দণ্ডবিধি আইন ১৮৬০–এর ৪৯৪–এর বিধানমতে প্রথম স্ত্রী মামলা করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের কাবিননামা আদালতে দেখাতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে ৭ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন স্বামী।

লেখক: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং লিগ্যাল কাউন্সেল এর পার্টনার।

এইচআর/বিএ