দেশজুড়ে

জরাজীর্ণ ভবনে চলছে ৬১ স্কুলের পাঠদান, নতুন আতঙ্ক ভূমিকম্প

মাথার ওপর খসে পড়ছে পলেস্তারা, দেয়ালের বুক চিরে বড় বড় ফাটল—আর এই ‘মৃত্যুফাঁদেই’ প্রতিদিন স্বপ্ন বুনতে আসছে মাদারীপুরের হাজারো কোমলমতি শিশু। সারাদেশে সাম্প্রতিক ঘন ঘন ভূমিকম্পের কম্পন যেন এই আতঙ্ককে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। জেলার ৬১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে প্রশাসন ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষণা করলেও, বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই চলছে পাঠদান। যে-কোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার আশঙ্কা আর কম্পন আতঙ্কে প্রতিটি দিন কাটছে চরম উৎকণ্ঠায়।

Advertisement

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মাদারীপুরের ৫টি উপজেলায় ৭১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এর মধ্যে ৬১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে এই বিদ্যালয়গুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করে প্রশাসন। নতুন ভবন নির্মাণ না হওয়ায় এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পাঠদান চলছে। এতে করে ভূমিকম্পের আতঙ্কের মধ্যে আছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার ৭৫ নম্বর গোসাইদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪৪ নম্বর বলাইরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কালকিনি উপজেলার দক্ষিণ কৃষ্ণনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সদর উপজেলার কোলচরি এলাকার ক,খ,গ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রিজিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৬১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ থাকলেও সেখানেই চলছে পাঠদান। সম্প্রতি দেশে একাধিকবার ভূমিকম্প হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুনভাবে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তারা দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার ৭৫ নম্বর গোসাইদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে পুরাতন ভবনটি ১৯৯০ সালে নির্মাণ করা হয়। পরে ২০১০ সালে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একতলা বিশিষ্ট আরও একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। সেটিও গত ৫ বছর ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিদ্যালয়ের ভবন থেকে কখনও পলেস্তারা খসে পড়ছে, কখনও আবার ইট বা শুরকি মাথার ওপর পড়ছে। এরমধ্যে দিয়েই পাঠদান কর্মসূচি চলছে।

Advertisement

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পুরাতন ভবন ব্যবহার করা গেলেও নতুন ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতো তাড়াতাড়ি নতুন ভবন নষ্ট হয়ে যাবে, তা ভাবিনি। বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে বসার উপায় থাকে না, এছাড়া বারবার নতুন ভবন থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। বর্তমানে ভূমিকম্পের আতঙ্ক থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান করতে শিক্ষার্থীরা ভয় পাচ্ছে। তাই দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানাই।

মাদারীপুর সদর উপজেলার ৪৪ নম্বর বলাইরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরও একই অবস্থা। পুরোনো ভবনটি অনেক আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে প্রশাসন। একটি কক্ষেই দুটি শ্রেণির পাঠদান কার্যক্রম করতে হচ্ছে। একটু বৃষ্টি হলেই ছাদ থেকে পানি পড়ে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কয়েকবার মাদারীপুরের ভূমিকম্পে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের মাঝে আতঙ্ক বেড়েছে। অনেক সময় শিক্ষকরাও পাঠদান করাতে ভয় পান।

কালকিনি উপজেলার দক্ষিণ কৃষ্ণনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯৭৩ সালে এমপিও ভুক্ত হয়। এরপর সেখানে ১৯৯৩ সালে একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে জরাজীর্ণ আর ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো টিনশেড ঘর। এছাড়াও ২০০৯ সালে দোতলা একটি ভবন নির্মাণ করা হলেও সেটিরও অবস্থা ভালো না। এতে করে চরম আতঙ্কে আছে শিক্ষার্থীরা।

Advertisement

আরও পড়ুনভবন আছে শিক্ষক নেই, এক কক্ষেই চলে ৩ ক্লাসের পাঠদানস্কুলে যাওয়ার পথ বন্ধ, গাছতলায় পাঠদাননিয়োগ হলেও থাকেন না শিক্ষক, বিপর্যয়ে পদ্মা চরের প্রাথমিক শিক্ষা

এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন বলেন, অনেক আগেই টিনশেড ঘরের দরজা-জানালা ভেঙে গেছে। একটু ঝড়ো বাতাস হলে, প্রচণ্ড শীত পড়লে বা গরমে শিক্ষার্থীদের কষ্ট হয়। তাছাড়া সম্প্রতি ভূমিকম্প বারবার হওয়ায়, অনেকেই আতঙ্কে আছেন।

মাদারীপুর সদর উপজেলার কোলচরি গ্রামের ক,খ,গ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রিজিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ মাদারীপুরের ৬১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অংশ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

বিদ্যালয়টির ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. হামজা বলেন, ক্লাসে থাকাকালীন সময়ে প্রায়ই মাথার উপরে শুরকি ও বালু পড়ছে। ভবনের এই অবস্থায় আমরা আতঙ্কে থাকি। এখন নতুন ভবন নির্মাণ না হলে পাঠদান করতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তাছাড়া বর্তমানে ঘন ঘন ভূমিকম্প হচ্ছে। তাই আমরা ভূমিকম্পের ভয়েও আছি।

ক,খ,গ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মা আমেনা বেগম বলেন, আমাদের ছোট ছোট বাচ্চারা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যেই ক্লাস করছে। এতে করে তারা চরম ঝুঁকিতে আছে। তাই দ্রæত নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।

বিষয়টি নিয়ে মাদারীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফজলে ইলাহী জাগো নিউজকে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভবনের নামের তালিকা করে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেবে কর্তৃপক্ষ। আশা করছি, দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) মাদারীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী বাদল চন্দ্র কির্ত্তনীয়া বলেন, সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তাই জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিস এই তালিকা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন হওয়ার পর প্রকল্প হাতে আসলেই ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আয়শা সিদ্দিকা আকাশী/কেএইচকে/এমএস