প্রবাস

তেলাপোকা আত্মা ও আমাদের ‘ডিজিটাল ড্রেন’

প্রবাসে বসে যখন দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দেয়ালের দিকে তাকাই, তখন নিজেকেই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়-আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি? অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমাদের এই অহেতুক ‌‘পিএইচডি’ কি আমাদের মানসিক দারিদ্র্যেরই বহিঃপ্রকাশ নয়? আমার আজকের লেখাটি সেইসব ‘তেলাপোকা আত্মা’দের নিয়ে।

Advertisement

তেলাপোকা আত্মা ও আমাদের ‘ডিজিটাল ড্রেন’

আমি যদি সারাদিন চোখ বন্ধ করে ধ্যানে বসে থাকি, মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলি, আর দুই-তিনটা অস্পষ্ট কথা বলি, তাহলে আশপাশের মানুষ আমাকে গভীর মানুষ বলে মেনে নেবে। কিন্তু আমি যদি চোখ খুলে প্রশ্ন করি কেন গুজবে বিশ্বাস করো? কেন নিজের কাজ না বদলে দেশ বদলাতে চাও? কেন ধর্ম মুখে, কিন্তু আচরণে নেই? তখন তারাই বলবে, ‘এই মানুষটা বিপজ্জনক।’ আমাদের দেশে চোখ বন্ধ থাকলে নিরাপদ, আর চোখ খুললেই সমস্যা।

কিন্তু আসল সমস্যা এই ‘তেলাপোকা আত্মা’দের নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইদানীং এদের আচরণ লক্ষ্য করলে রাগের চেয়ে বেশি করুণা হয়। মনে হয়, যেন পৃথিবীর বড় বড় সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে-এখন কেবল অমুক নায়িকা বা গায়কের ব্যক্তিগত জীবনটাই জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য বাকি। এই প্রবণতাটা কেবল বিরক্তিকর নয়; এটি আমাদের মানসিক দারিদ্র্যের দিকটাই স্পষ্ট করে। অন্যের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে নাক গলানো এই তাড়না আসলে আত্মউন্নয়নের শূন্যতা ঢাকবার এক ধরনের চেষ্টা মাত্র। দুঃখের বিষয় হলো, আমরা এটাকে বিনোদন ভাবতে শিখে ফেলেছি।

Advertisement

হে তেলাপোকা-সদৃশ মানসিকতার মানুষজন, অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জাবর না কেটে একটু আত্মউন্নয়নের চেষ্টা করা কি খুব অসম্ভব? বই পড়ুন, ভালো সিনেমা দেখুন, বেড়ান, দয়া করে নিজের চরকায় তেল দিন। দুইটা বেশি লাইকের আশায় অন্যের জীবন নিয়ে নোংরা ব্যবচ্ছেদ করে নিজের মনের ময়লা প্রকাশ করা বন্ধ করুন।

কে তার জীবনে কোনো প্রয়োজনে কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত বিষয়। সেখানে বাইরের কারও নাক গলানোর কোনো নৈতিক বা সামাজিক অধিকার নেই। এই স্বাভাবিক সৌজন্যবোধটুকু যাদের নেই, তাদের শিক্ষা কাগজে আছে, কিন্তু দীক্ষা বহু আগেই হারিয়ে গেছে।

সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হলো-নিজের বেলায় এরা ষোলো আনার ওপর আড়াই আনা অর্থাৎ আঠারো আনা স্বার্থপর, কিন্তু অন্যের বেলায় নৈতিকতার মুখোশ পরে বিচারকের আসনে বসে।

চোখ বন্ধ করে ভবিষ্যৎ বলা যায় না। কিন্তু কিছু তেলাপোকা চোখ খোলা রেখেও কিছু দেখে না, কিছু শেখে না। সংযত, শালীন, ভদ্রতা- এই শব্দগুলোর মানে তাদের অভিধানে নেই। মানবজীবন তেলাপোকা হয়ে গেলেও ময়লা ঘাঁটাঘাঁটি তাদের থামে না। যা মনে আসে তাই শেয়ার করে, কোনো যাচাই নেই, সত্য–মিথ্যা বাছাই নেই। বিচারবুদ্ধি অনেক আগেই শিকেয় উঠেছে। কারণ তারা ডাইনোসর হয়ে বিলুপ্ত হওয়ার চেয়ে তেলাপোকা হয়ে নোংরার ভেতর টিকে থাকাকেই শ্রেয় মনে করেছে। অথচ তারা ভুলে যায়-বিলুপ্ত ডাইনোসরকেও মানুষ মনে রাখে, কিন্তু জীবিত তেলাপোকাকে সবাই ঘেন্না করে।

Advertisement

ভণ্ডধার্মিকতা, গুজবপ্রিয়তা, অনধিকার চর্চা আর নিজেকে না বদলে অন্যকে দোষারোপ-এই অভ্যাসগুলো থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া কোনো সমাজের ভবিষ্যৎ নেই। দেশকে এগিয়ে নিতে চাইলে সর্বপ্রথম স্ব আত্মার সংস্কার জরুরি।

চোখ বন্ধ করে বসে থাকলে ভবিষ্যৎ দেখা যায় না। ভবিষ্যৎ বোঝা যায় চোখ খুলে ইতিহাস পড়লে, সমাজ দেখলে এবং সমাজের মানুষের আচরণ বিশ্লেষণ করলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনৈতিকভাবে অনধিকার চর্চা বন্ধ হোক নইলে এই ‘ডিজিটাল ড্রেন’-এর ময়লা তেলাপোকা আপনার পরিচয় হয়ে থাকবে।

এমআরএম/এমএস