আহমাদ সাব্বির
Advertisement
কোরআন মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত ও চূড়ান্ত পথনির্দেশনা। এটি কোনো মানব-রচিত গ্রন্থ নয়; বরং সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান ও সকল ত্রুটি থেকে পবিত্র আল্লাহ তাআলার কালাম। কোরআনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে, বিভ্রান্তি থেকে হেদায়াতে এবং সীমাবদ্ধ মানবজ্ঞান থেকে অসীম সত্যের দিকে পরিচালিত করা। এই গ্রন্থ মানবজীবনের জ্ঞান, দর্শন, নৈতিকতা ও চূড়ান্ত সফলতার এক নির্ভুল মানচিত্র।
আল্লাহ তাআলা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—সমস্ত কালের জ্ঞান একসঙ্গে ধারণ করেন। তাঁর জ্ঞান কোনো সীমা বা প্রতিবন্ধকতায় আবদ্ধ নয়। সেই অসীম ও নির্ভুল জ্ঞান থেকেই কোরআনের অবতরণ, যা মানবজাতির জন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। এই আলো শুধু বাহ্যিক জীবনকে নয়, মানুষের অন্তর্জগৎ, বিশ্বাস, চিন্তা ও কর্মকে আলোকিত করে। কোরআন এমন এক নূর, যা জীবনের সকল অন্ধকার দূর করে সত্য ও সঠিক পথকে সুস্পষ্ট করে তোলে।
আল্লাহ তাআলার একটি মহান পরিচয় হলো—তিনি ‘রাব্বুল আলামীন’, অর্থাৎ সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক। তিনি কেবল সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হননি; বরং প্রত্যেক সৃষ্টিকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী আকৃতি, প্রকৃতি ও পথনির্দেশ দিয়েছেন। প্রাণিজগতের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। পাখির ছানা ডিম ফুটেই ওড়ার চেষ্টা করে, মাছ জন্মের পরপরই সাঁতার কাটে, মানবশিশু জন্মের পরই কাঁদতে জানে এবং মায়ের দুধ গ্রহণ করে। এই সহজাত জ্ঞান বা প্রবৃত্তি কোনো শিক্ষা থেকে আসে না; বরং স্রষ্টার পক্ষ থেকেই প্রত্যেক প্রাণীর মধ্যে প্রোথিত।
Advertisement
শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে পরিযায়ী পাখিদের নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো, বিপদে প্রাণীদের আত্মরক্ষামূলক আচরণ—এসবই প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করার পর প্রত্যেককে পথ দেখিয়েছেন। কোরআনের ভাষায়, তিনিই সেই রব, যিনি সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন এবং পরে হেদায়েত দান করেছেন। এই সার্বজনিক হেদায়াত প্রাণিজগতের জন্য সহজাত প্রবৃত্তির মাধ্যমে হলেও মানুষের জন্য এর পরিসর আরও বিস্তৃত।
মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা ও শ্রেষ্ঠ এই কারণে যে, তাকে দান করা হয়েছে চিন্তাশক্তি, বিবেক ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা। পঞ্চেন্দ্রিয় ও অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষ জীবনকে সহজ ও আরামদায়ক করেছে, সভ্যতা গড়ে তুলেছে এবং নানা আবিষ্কারের মাধ্যমে পৃথিবীকে নিজের অনুকূলে এনেছে। কিন্তু এই জ্ঞান মূলত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতেই সীমাবদ্ধ। অদৃশ্য জগৎ, পরকাল, চূড়ান্ত বিচার কিংবা জীবনের পরম উদ্দেশ্য—এসব বিষয়ে মানববুদ্ধি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।
মানুষের বিবেক তাকে ন্যায়-অন্যায় ও ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখালেও সেটিও সীমাবদ্ধ ও প্রভাবগ্রস্ত। পরিবেশ, সমাজ, স্বার্থ, প্রবৃত্তি ও লালসা মানুষের নৈতিক সিদ্ধান্তকে দুর্বল করে দেয়। ফলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানুষের তৈরি নীতিমালা ও মতবাদ কখনোই চূড়ান্ত সত্য হতে পারেনি। এক যুগে যে দর্শনকে মুক্তির পথ মনে করা হয়েছে, অন্য যুগে সেটিই বিভ্রান্তি ও বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মানবজ্ঞান বারবার সংশোধিত হয়েছে, বাতিল হয়েছে এবং নতুন করে গঠিত হয়েছে।
এই সীমাবদ্ধতা থেকেই প্রমাণিত হয়—মানুষের জন্য এমন এক জ্ঞানের প্রয়োজন, যা নির্ভুল, চিরন্তন ও সকল যুগের উপযোগী। মহান আল্লাহ তাআলা সেই প্রয়োজন পূরণ করেছেন পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে। কোরআন এমন এক নুর, যার মধ্যে কোনো বাতিল প্রবেশ করতে পারে না—না অতীত থেকে, না ভবিষ্যৎ থেকে। কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, দার্শনিক তত্ত্ব বা সামাজিক পরিবর্তন কখনোই কোরআনের সত্যতাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারেনি।
Advertisement
কোরআনের আলোতেই মানুষের জীবনদর্শন পূর্ণতা লাভ করে। এটি মানুষকে জানায়—সে কে, কেন সৃষ্টি, তার দায়িত্ব কী এবং তার চূড়ান্ত গন্তব্য কোথায়। কর্মের ফল, দায়িত্ব পালনের পুরস্কার এবং অবহেলার শাস্তি—সবকিছুর সুস্পষ্ট ধারণা কোরআন প্রদান করে। ফলে মানুষের জীবন লক্ষ্যহীন থাকে না; বরং দায়িত্ববোধ, ভারসাম্য ও আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত হয়।
কোরআনের আলো যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে অন্ধকারের পর অন্ধকার নেমে আসে। বিশ্বাসে কুসংস্কার, চিন্তায় সংকীর্ণতা, ইবাদতে আচারসর্বস্বতা, সমাজে শোষণ, রাজনীতিতে জুলুম এবং সংস্কৃতিতে অশ্লীলতা বিস্তার লাভ করে। কোরআন এই অবস্থাকে ‘অন্ধকারের ওপর অন্ধকার’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—কোরআনে ‘অন্ধকার’ শব্দটি বহুবচনে এবং ‘আলো’ শব্দটি একবচনে ব্যবহৃত হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, বিভ্রান্তির পথ অসংখ্য হলেও সত্যের পথ একটাই—আর তা হলো কোরআনের পথ।
এই কোরআনই আল্লাহর নুর। সুরা নুরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত গভীর ও নান্দনিক উপমার মাধ্যমে এই নুরের বর্ণনা দিয়েছেন—এক প্রদীপ, ঝকঝকে কাচের ভেতর, বরকতময় যাইতুন তেলে প্রজ্বলিত, যার আলো আগুনের স্পর্শ ছাড়াই দীপ্তিময়। এই ‘নুরুন আলা নুর’ মানুষের হৃদয়ে হেদায়েতের আলো জ্বালিয়ে দেয়, যদি সে হৃদয় সত্য গ্রহণে প্রস্তুত থাকে।
মানবহৃদয় স্বভাবগতভাবেই সত্য গ্রহণের যোগ্য। এই যোগ্যতার পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে আম্বিয়ায়ে কেরামের জীবনে। তাদের অন্তর ছিল ফিতরতের নুরে সর্বাধিক আলোকিত। তাদের কথা, আচরণ ও কর্মে সেই আলো প্রতিফলিত হতো। তারা ছিলেন আল্লাহর নির্বাচিত বান্দা, যাদের মাধ্যমে ওহির জ্ঞান মানবজাতির কাছে পৌঁছেছে। নবীগণ ছিলেন আসমানি নুরের জীবন্ত মিনার, যারা মানুষকে কুফর ও শিরক থেকে ইমানের আলোতে, জুলুম থেকে ন্যায়ের পথে এবং চরিত্রহীনতা থেকে মানবিক উৎকর্ষে উন্নীত করেছেন।
এই নবুওয়তের ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত পরিণতি হলেন হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)—সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল। তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য কোরআন নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন। এই কোরআন মানুষকে দুনিয়ার সাফল্যের পাশাপাশি আখেরাতের অনন্ত শান্তি, আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টির পথ দেখায়।
কোরআনই মানুষের জ্ঞানের চূড়ান্ত উৎস। এটি কেবল ধর্মীয় গ্রন্থ নয়; বরং জীবনবিধান, নৈতিক সংহিতা ও মানবমুক্তির সনদ। মানবজাতির প্রতি এই নুরে হেদায়াত প্রেরণ আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়াতের অনন্য প্রকাশ। তাই মানুষের কর্তব্য হলো—এই কোরআনের আলোকে নিজের জীবন গড়ে তোলা, কৃতজ্ঞচিত্তে আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হওয়া এবং তাঁর কাছেই তওফিক কামনা করা।
ওএফএফ