অর্থনীতি

প্রশাসকমুক্ত সংগঠনের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারির পরই ভোট চান ব্যবসায়ীরা

প্রায় দেড় বছর ধরে প্রশাসক দিয়ে চলছে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)। প্রশাসক দিয়ে চলা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দুই সংগঠন বেসিস ও ই-ক্যাবেও অচলাবস্থা চলছে। প্রশাসক দিয়ে চলায় আরও বেশকিছু সংগঠনও স্থবির হয়ে পড়েছে।

Advertisement

অন্তর্বর্তী সরকারের গত প্রায় দেড় বছরে এই বাণিজ্য সংগঠনগুলোতে নির্বাচন দেওয়ার জোরালো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। এতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই এসব সংগঠনে নির্বাচিত ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দেখতে চায় দেশের ব্যবসায়ী সমাজ। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, নির্বাচিত সরকারের প্রথম কাজ হবে প্রশাসক থাকা সংগঠনগুলোতে দ্রুত নির্বাচন দেওয়া।

বর্তমানে প্রশাসক আছে যেসব বাণিজ্য সংগঠনেপ্রশাসক থাকা উল্লেখযোগ্য সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে- এফবিসিসিআই, বেসিস, ই-ক্যাব, বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ), চট্টগ্রাম চেম্বার ও সিলেট চেম্বার।

‘এফবিসিসিআইয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় দেশের ব্যবসায়ী সমাজ অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে। কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বেশকিছু ভুলভ্রান্তি করেছে এবং মূল সংকটে হাত দিতে পারেনি। ফলে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকর হয়নি।’— এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আবদুল হক

Advertisement

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর বাইরে নির্বাচন হয়েছে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিতে (বিসিসিসিআই)।

জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনো সংগঠনের নির্বাচন নয়আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। এই নির্বাচনের আগে দেশে কোনো পেশাজীবী সংগঠন, সাংবাদিক সংগঠন ও বাণিজ্য সংগঠনে নির্বাচন না করার নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরমধ্যে সব রিটার্নিং কর্মকর্তাকে এ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।

ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন ছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব ধরনের নির্বাচন, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমিতি, সাংবাদিক সমিতি, বণিক সমিতি, সমবায় সমিতি, ট্রেড ইউনিয়নসহ দেশের সব সংগঠনের নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির পরে আয়োজন করতে হবে।

‘দীর্ঘদিন ধরে ট্রেড বডিগুলো আমলাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ী নেতৃত্ব না থাকায় গত দেড় বছরে আইসিটি খাতের প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা হয়নি।— বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর

Advertisement

এফবিসিসিআইপ্রায় দেড় বছর ধরে প্রশাসক দিয়ে চলছে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। প্রথম প্রশাসকের মেয়াদ শেষে দ্বিতীয় প্রশাসক এলেও সংগঠনটির নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো তোড়জোড় নেই। গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে সময় বাড়ানো হয় ৪৫ দিন। এফবিসিসিআই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সাতটি রিট মামলা করেন ব্যবসায়ী ও তাদের প্রতিনিধিরা। এসব মামলার জেরে এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন ঝুলে যায়।

এফবিসিসিআই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে এফবিসিসিআই নির্বাচন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ সময়ে শীর্ষ এ সংগঠনটির নির্বাচন দেওয়াও সম্ভব নয়।

জানতে চাইলে এফবিসিসিআইর নতুন প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আশা করি জাতীয় নির্বাচনের পর এফবিসিসিআইর নির্বাচন দেওয়া সম্ভব হবে।’

আরও পড়ুনদুই বাণিজ্য সংগঠনে প্রশাসক নিয়োগব্যবসায়ী সংগঠনের দুর্বলতায় খেয়ালখুশি মতো সিদ্ধান্ত সরকারেরই-ক্যাবে প্রশাসক নিয়োগ, ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের নির্দেশ

তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তীসময়ে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন এফবিসিসিআইর সভাপতি মাহবুবুল আলম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পরে ওই পর্ষদ বাতিল করে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব হাফিজুর রহমানকে। গত বছরের জুনের মাঝামাঝি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে এফবিসিসিআই নির্বাচন বোর্ড।

‘নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও প্রশাসক অনির্দিষ্টকালের জন্য তা স্থগিত করেন। পরে নতুন তারিখ ঘোষণার পরও নির্বাচনের চারদিন আগে আদালতের স্থগিতাদেশে নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হয়নি।— ই-ক্যাবের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন

তফসিল অনুযায়ী, গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে নির্বাচনের সময়সীমা আরও ৪৫ দিন বাড়ানো হয়। সময় বাড়ানোর পর প্রশাসক হিসেবে হাফিজুর রহমানের মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর। পরে গদ বছরের ২ নভেম্বর সংগঠনটির প্রশাসক হিসেবে নতুন দায়িত্ব নেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান।

আদেশ অনুযায়ী, তিনি ১২০ দিনের মধ্যে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্নের মাধ্যমে নির্বাচিত বোর্ডের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। তবে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও নির্বাচন নিয়ে তোড়জোড় নেই।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘শীর্ষ এ সংগঠনে নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় দেশের ব্যবসায়ী সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। সংগঠনটির কাঠামোগত দুর্বলতা ঠিক করতে চেয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ কাজটি করতে গিয়ে তারা বেশকিছু ভুলভ্রান্তি করেছে। গভীর যে সংকট রয়েছে সেখানে তারা হাত দিতে পারেনি। যেখানে ক্যানসার হয়েছে সেখানে তারা টিউমারের অপারেশন করার চিন্তা করেছে। তাতে কোনো কাজ হয়নি। আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় নির্বাচনটি ঝুলে গেছে।’

আবদুল হক বলেন, ‘আমি মনে করি নির্বাচিত সরকারের প্রথম দায়িত্ব হবে বেসরসকারি খাতের উন্নয়ন। যদি তারা চায়, এসব জায়গায় যে অন্ধকার অবস্থা তৈরি হয়েছে, অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, এগুলোর সংস্কার করে নির্বাচন দেওয়া। দ্রুত নির্বাচন হতে হবে, কিন্তু নির্বাচনের আগে ট্রেড বডিগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের কনসালটেন্ট দিয়ে সংস্কার করা উচিত।’

জানতে চাইলে এফবিসিসিআইর সাবেক সহ-সভাপতি ও সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদের আহ্বায়ক মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শীর্ষ এ সংগঠনে নির্বাচন না হওয়ায় আমরা ব্যবসায়ীরা বিপদে আছি। ব্যবসায়ীদের সমস্যার কথা এফবিসিসিআই ছাড়া কোথায় বলা যাবে? আমাদের সমস্যাগুলো, ভ্যাট-ট্যাক্স নিয়ে কথা বলার জায়গা পাচ্ছি না। আমরা তো বিপদে আছি। নির্বাচনটি যত তাড়াতাড়ি হয় ততই ভালো। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন যেহেতু এফবিসিসিআই, এ সংগঠন ব্যবসায়ীদের হাতে থাকাই উচিত।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ট্রেড বডিগুলোতে দ্রুত ব্যবসায়ী প্রতিনিধি আসা উচিত। আমি মনে করি যাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকবে, তাদের ট্রেড বডির নেতৃত্বে আসা উচিত নয়। এতে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণ হয় না। নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকলে ট্রেডের স্বার্থ সংরক্ষণের কথা বলার জন্যে, পলিসি তৈরির জন্য লোক থাকে না। যিনি প্রশাসক থাকেন, তিনি আর এ বিষয়গুলো ওভাবে গুরুত্ব দেন না।’

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘গত এক বছরে প্রথম নির্বাচন হয় বিকেএমইএতে। আমি নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে কথা বলে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আর কোনো সঙ্গী পাচ্ছিলাম না। এফবিসিসিআই নীরব। এফবিসিসিআই এ পর্যন্ত কোনো বিষয়ে কোনো কথা বলেনি। যে কারণে আমি মনে করি প্রতিটি সংগঠনে নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকা উচিত। জাতীয় নির্বাচনের পরপরই ব্যবসায়ী প্রতিনিধি না থাকা সংগঠনগুলোতে দ্রুত নির্বাচন হওয়া উচিত।’

এ বিষয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ বাণিজ্য সংগঠন দলমত নির্বিশেষে সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এসব সংগঠনের কার্যকর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। তবে বর্তমানে এফবিসিসিআইসহ বেশ কয়েকটি বাণিজ্য সংগঠনে নির্বাচন না হওয়ায় বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্ট নীতি প্রণয়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সদস্যদের স্বার্থ রক্ষা এবং বিভিন্ন কাঠামোগত বিষয়ে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কিছুটা সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে নতুন বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালার কিছু বিধি নিয়ে বিদ্যমান মতানৈক্য। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সংশোধনী আনার জন্য কাজ করছে, যা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। আশা করি শিগগির সংশোধিত বিধিমালা পাওয়া যাবে। এ বিধিমালা সংস্কার যত দ্রুত হবে, এর মাধ্যমে অধিকাংশ বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচন কার্যক্রম সহজতর হবে।’

তিনি বলেন, ‘সাধারণত জাতীয় রাজনৈতিক পরিবেশ বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিবেশও খুব একটা স্থিতিশীল নয়, যার প্রভাব কিছুটা দৃশ্যমান। আমরা প্রত্যাশা করি নির্বাচন পরবর্তী একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাণিজ্য সংগঠনগুলো সামগ্রিকভাবে বেসরকারিখাত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও কার্যকরি ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।’

আরও পড়ুনফুটপাত দখল করে ব্যবসা করলে ট্রেড লাইসেন্স বাতিল: ডিএনসিসি প্রশাসকবাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতিতে প্রশাসক নিয়োগকেমিস্টস সমিতিতে প্রশাসক নিয়োগ

বেসিসদেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) নির্বাচনও থমকে আছে প্রায় দেড় বছর ধরে। সংগঠনটিতে এখন পর্যন্ত দুই দফা প্রশাসক নিয়োগ হয়েছে। ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর বেসিসের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মুহম্মদ মেহেদী হাসান। পরে গত বছরের ৪ মে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন তিনি। এরপর গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর বেসিসের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খান। নির্বাচন আয়োজনে একটি নির্বাচন বোর্ড গঠন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিটিও সেল। গত ৮ নভেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গঠিত বেসিসের নবগঠিত নির্বাচনি বোর্ড, নির্বাচনি আপিল বোর্ড ও নির্বাচনি সহযোগী পরিষদ ও সহায়ক কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপরে আর কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পরোক্ষ হস্তক্ষেপ ও বেসিসের কিছু সদস্যর কারণে এই নির্বাচনও থমকে আছে।

জানতে চাইলে বেসিসের বর্তমান প্রশাসক আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বোর্ড গঠন করে দিয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি তাদের সঙ্গে বসেছি। বেশকিছু সদস্য ও অনেকের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে- এখানকার বেশকিছু সদস্য নিয়ে আপত্তি রয়েছে। এ কার্যক্রম চলমান ছিল। একটি অডিট কার্যক্রম চলছিল, সেই কাজ শেষ করে নির্বাচন দিলে সেটি একটি ইফেক্টিভ নির্বাচন হবে বলে তারা মত দিয়েছে। নির্বাচন বোর্ডও এ কথার সঙ্গে একমত হয়েছে। আমি যখন দায়িত্ব নিয়েছি, আমাকে একটি সময় দেওয়া হয়েছে। তাহলে এ সময়ে আমি তো নির্বাচন শেষ করতে পারবো না। মন্ত্রণালয়কে আমি জানিয়েছে আমার মেয়াদ শেষ হলে কিন্তু আমার থাকার সুযোগ নেই। মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, তারা আরও দু-তিন মাস সময় বাড়াবে। আমরা যত তাড়াতাড়ি পারি নির্বাচনটা শেষ করতে চাই।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমাকে দেওয়া সময় এ মাসেই শেষ হবে। আমি এরই মধ্যে চিঠি লিখেছি। আর জাতীয় নির্বাচনের পরপরই বেসিস নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। জাতীয় নির্বাচনের পরেই রোজা শুরু হবে। রোজার ঈদের এক সপ্তাহ পর্যন্ত ছুটির আমেজ থাকে। সে কারণে এপ্রিল টার্গেট করা হয়েছে। এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।’

এ বিষয়ে বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিভিন্ন ট্রেড বডি সরকার গত এক-দেড় বছর ধরে আমলাদের দিয়ে যাচ্ছে, এ সংগঠনগুলো যত দ্রুত সম্ভব আমলামুক্ত করতে হবে। নির্বাচনের পরেই সংগঠনগুলোতে দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে। কারণ আমলারা ক্ষমতা উপভোগ করছে, তারা নিজেদের স্বার্থে নির্বাচন দিচ্ছে না। কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ীও নির্বাচন হওয়ার পথে অন্তরায়। সংগঠনগুলোতে ব্যবসায়ী নেতৃত্ব না থাকায় গত এক দেড় বছরে আইসিটি খাতের উন্নয়নে পলিসিতে যেসব সহায়তা দরকার ছিল তার কোনো কাজই হয়নি।’

এপ্রিলে বেসিসের নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে প্রশাসক। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘তাদের (প্রশাসক) যদি নির্বাচন দেওয়ার ইচ্ছে থাকতো, জানুয়ারি মাসেই নির্বাচন দেওয়া সম্ভব ছিল। তাদের নির্বাচন দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা সন্দিহান। আমার মনে হয়, আগামী জুন মাসেও নির্বাচন হবে না! এখানে নির্বাচনের প্রক্রিয়াগত ইস্যু নেই। নির্বাচন দেওয়ার জন্য যে আন্তরিকতা বা কমিটমেন্ট থাকা দরকার- সেটিই তাদের নেই।’

সদস্য পদ নিয়ে আপত্তির কারণে নির্বাচন বিলম্বিত হচ্ছে- প্রশাসকের এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বেসিসের এই সাবেক সভাপতি বলেন, ‘সব সংগঠনেই সদস্যপদ নিয়ে আপত্তি থাকবে। বিজিএমইএ’র সদস্য পদ নিয়েও তো আপত্তি ছিল, কিন্তু বিজিএমইএ’র নির্বাচন তো অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রায় ছয় মাস আগে। নির্বাচন করতে চাইলে সেটি করা যেতো।’

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ও বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যবসায়ী প্রতিনিধি না থাকায় গত বাজেটে আইসিটি খাতের কোনো দাবিদাওয়া তুলে ধরা যায়নি। সামনে বাজেটেও একই অবস্থার শঙ্কা রয়েছে। আইসিটি খাতে টেলিকম পলিসি হয়েছে, ডেটা পলিসি হয়েছে- এগুলো নিয়ে তো বেসিসের কথা বলা দরকার ছিল। কিন্তু বোর্ড না থাকায় হচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের পর পরই প্রশাসক থাকা বাণিজ্য সংগঠনগুলোতে নির্বাচন হওয়া উচিত। এর আগেই হতে পারতো- কিন্তু কেন হয়নি, তার সঠিক কোনো যুক্তি নেই। অনেকেই ভাবে যে নির্বাচনের পর কী হবে, সেটা বুঝে নির্বাচন হবে। তাহলে তো আমরা ট্রেড বডিকে রাজনীতিকীকরণ করতে চাই না। নির্বাচনের পর যে দলই জিতুক- ট্রেড বডি তো ট্রেড বডির মতো থাকতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের আগেই ট্রেড বডিগুলোর নির্বাচন হয়ে গেলে ভালো হতো। যেহেতু হয়নি, জাতীয় নির্বাচনের পর পরই সংগঠনগুলোর নির্বাচন হওয়া উচিত।’

ই-ক্যাবদেশের ই-কমার্স খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) নির্বাচনও স্থগিত হয়ে রয়েছে। গত বছরের ৩১ মে ই-ক্যাব নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ১৪ মে এক চিঠিতে নির্বাচন স্থগিত করে ই-ক্যাবের নির্বাচন বোর্ড। সে সময় এ বিষয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেছিলেন সংগঠনের সদস্য ও প্রার্থীরা। পরে ২৬ জুলাই নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়। প্রার্থীরাও প্রচার-প্রচারণা শুরু করেন। তবে নির্বাচনের কয়েক দিন আগে ২২ জুলাই ই-ক্যাবের ২০২৫-২৭ মেয়াদের কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন স্থগিত করেন হাইকোর্ট।

প্রথমে সংগঠনটির প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল সেলের উপসচিব মুহাম্মদ সাঈদ আলী। পরে নতুন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. সাইফ উদ্দিন আহম্মদ।

জানতে চাইলে ই-ক্যাবের নতুন প্রশাসক ড. সাইফ উদ্দিন আহম্মদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ হওয়ার কারণে এই মুহূর্তে নির্বাচন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। স্থগিতাদেশের সময় শেষ হলে আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করবো। তখন নতুন করে নির্বাচন বোর্ড ও আপিল বোর্ড গঠন করা হবে। জাতীয় নির্বাচনের পরপর ওই স্থগিতাদেশের সময় শেষ হতে পারে। তখন এই নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘যিনি রিট পিটিশন করেছিলেন, প্রথম তিনি সাড়া দিয়েছিলেন। এখন তেমনভাবে সাড়া দিচ্ছেন না। তিনি উদ্যোগ নিলে নির্বাচন আরও দ্রুততর করা সম্ভব ছিল।’

এ বিষয়ে ই-ক্যাবের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। তবে হঠাৎ করেই প্রশাসক অনির্দিষ্টকালের জন্য নির্বাচন স্থগিত করে। পরে আবার নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু নির্বাচনের চারদিন আগে একজন প্রার্থী আদালতের মাধ্যমে নির্বাচন স্থগিত করান। আদালতের ওই স্থগিতাদেশ এখনো বহাল রয়েছে। সে কারণে নির্বাচনটি আর অনুষ্ঠিত হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি অ্যাসোসিয়েশন সংশ্লিষ্ট খাতের সার্বিক প্রতিনিধিত্ব করে। ই-ক্যাব পুরো ই-কমার্স খাতের প্রতিনিধিত্ব করে এবং সংগঠনটির সঙ্গে সদস্যদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় জড়িত। সদস্যদের সার্ভিস সম্পর্কিত বিষয় রয়েছে, সরকারের সঙ্গে খাত সংশ্লিষ্ট নীতিগত কাজ রয়েছে— এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সংগঠনের ওপর থাকে। কিন্তু অ্যাসোসিয়েশন কার্যকর না থাকলে এবং নির্বাচিত বোর্ড না থাকলে এসব কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে এগোনো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে খাতটির প্রবৃদ্ধি মন্থর হয় এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো স্থবির হয়ে পড়ে।’

ই-ক্যাবের সাবেক এই নেতা আরও বলেন, ‘আদালতের স্থগিতাদেশের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই, নির্বাচন যত দ্রুত অনুষ্ঠিত হবে ও সংগঠনে বেসরকারি খাতের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব ফিরে আসবে, তত দ্রুত কার্যক্রম স্বাভাবিক ও আরও সুচারুভাবে পরিচালিত হবে। সে কারণেই আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব সংগঠনটির নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া জরুরি। জাতীয় নির্বাচনের আগে যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে জাতীয় নির্বাচনের পরপরই দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা হলে বেসরকারি খাতসহ পুরো ই-কমার্স খাতই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।’

ইএইচটি/এমএএইচ/এমএমএআর/এমএফএ/জেআইএম