মুন্সিগঞ্জের বিস্তীর্ণ মাঠে চোখে পড়ছে হলুদের সমারোহ। আগাম জাতের সরিষার হলুদ ফুলে ঢেকে গেছে মাঠের পর মাঠ। হিমেল হাওয়ায় দোল খাওয়া সরিষা ফুল যেন প্রকৃতিতে যোগ করেছে অনন্য সৌন্দর্য। এমন দৃশ্য প্রাণ জুড়িয়ে দিচ্ছে কৃষকের। আনন্দে আছেন সরিষা থেকে মধু আহরণকারীরাও।
Advertisement
জানা গেছে, কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় এবং তেলের চাহিদা বাড়ায় মুন্সিগঞ্জে গত কয়েক বছরের মতো চলতি বছরও কৃষকেরা ঝুঁকেছেন সরিষা চাষে। ভোজ্যতেলের বাজারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে সরিষার তেল। একই সঙ্গে বাজারে সরিষার তেল-বীজের চাহিদা থাকায় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
এবার ৪ হাজার ৭৯৩ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। বর্তমানে জেলার ৬টি উপজেলায় মাঠজুড়ে দেখা মিলছে সরিষার। এ যেন আলুর রাজ্যে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। তাই তো হলুদ ফুলে দুলছে জেলার কৃষকদের রঙিন স্বপ্ন। অন্যদিকে কৃষকের আগ্রহ বাড়াতে চলতি মৌসুমে সরকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিনা মূল্যে বিভিন্ন উন্নত জাতের সরিষা বীজ ও সার বিতরণ করেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলার ৬টি উপজেলায় ৪ হাজার ৩৭৭ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আবাদ হয়েছে ৪ হাজার ৭৯৩ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪০০ হেক্টর জমিতে বেশি চাষ হয়েছে। গত বছর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ হাজার ৫ হেক্টর, চাষ হয়েছিল ৪ হাজার ৯৭৭ হেক্টর। তার আগের বছর জেলায় ৩ হাজার ৪৯ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রার হিসেবে গত বছরের তুলনায় এ বছর সরিষার চাষ বেড়েছে।
Advertisement
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৪ হাজার ৬০০ জন কৃষককে এ বছর ১ কেজি সরিষা বীজ, ১০ কেজি ডিএপি সার ও ১০ কেজি এমওপি সার প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। ২৪৩ জন কৃষককে সরিষা প্রদর্শনী ও উপকরণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
আবু সোহান নামের এক স্থানীয় চাষি বলেন, ‘আমরা মূলত সরিষা চাষ করি লাভ বেশি আর খরচ কম হওয়ায়। গত বছর ৫ হাজার টাকা খরচ করে সরিষা আবাদ করে লাভ হয়েছে ১০ হাজার টাকা। বর্তমানে সরিষা বীজ ও তেলের দাম বাজারে ভালো আছে। সরকারের পক্ষ থেকেও সরিষা বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে।’
আরও পড়ুনসরিষায় নতুন স্বপ্ন দেখছেন পাবনার কৃষকেরা হলুদ ফুলে দুলছে কৃষকের রঙিন স্বপ্ন
জেলা সদরের পাঁচগড়িয়াকান্দির চাষি সবুজ মোল্লা বলেন, ‘আগে আলু চাষ করতাম কিন্তু লোকসানের শিকার হয়েছি। বর্তমানে সরিষার তেলের দাম বেড়েছে। যে কারণে সরিষার দাম বেশি। এজন্য সরিষা চাষ করে ব্যবসা হয় বেশি। খরচ হয় ১০ হাজার টাকা, বিক্রি হয় ২০-২৫ হাজার টাকা। সরকারিভাবে কৃষককে বীজ ও সার দিয়ে সহায়তা করায় চাষ বেড়েছে।’
Advertisement
টঙ্গিবাড়ীর ধামারণ গ্রামের কৃষক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘এবার আলু চাষ কমিয়ে সরিষা চাষ বেশি করেছি। এক কানি জমিতে সরিষা চাষ করেছি। সরিষার জমিতে বেশি চাষ দিতে হয় না, ওষুধও বেশি লাগে না। খরচ কম।’
কৃষক ইব্রাহিম কাজী জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার ৪ গণ্ডা জমিতে সারিষা চাষে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি।’
বাংলাবাজার ইউনিয়নের কৃষক গফুর চাঁন বলেন, ‘দেশি সরিষার জাতগুলোর চেয়ে উন্নত জাতে ফলন বেশি। এ বছর সরিষার আবাদ ভালো হয়েছে। আশা করছি এ বছর সরিষার বাজারও ভালো যাবে। এবার ৫ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এবার যথেষ্ট পরিমাণ সরিষা চাষ হয়েছে। সম্পূরক রবিশস্য হিসেবে সরিষা চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিনা মূল্যে বীজ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। এবার সরিষা চাষে কৃষকেরা বাড়তি মুনাফা পাবে।’
শুভ ঘোষ/এসইউ