জিজিয়া একটি বার্ষিক কর যা ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম যুদ্ধক্ষম সামর্থ্যবান পুরুষদের ওপর আরোপ করা হয় তাদেরকে সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিনিময়ে।
Advertisement
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা জিজিয়া প্রসঙ্গে বলেন, যারা আল্লাহর ওপর ইমান রাখেনা এবং কেয়ামাত দিনের প্রতিও না, আর ওই বস্তুগুলিকে হারাম মনে করেনা যেগুলোকে আল্লাহ ও তার রাসুল হারাম বলেছেন, আর সত্য ধর্ম (অর্থাৎ ইসলাম) গ্রহণ করেনা, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাক যে পর্যন্ত না তারা অধীনতা স্বীকার করে প্রজারূপে জিজিয়া দিতে স্বীকার করে। (সুরা তওবা: ২৯)
জিজিয়া করের পরিচয় দিতে গিয়ে ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, “আরবি জিজিয়া শব্দটি জাযা–ইয়াজযি ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো—কারো উপকারের প্রতিদান দেওয়া। অর্থাৎ, তারা যে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা লাভ করে, তার প্রতিদানস্বরূপই জিজিয়া প্রদান করে।
জিজিয়া কেবল সেই স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ও যুদ্ধক্ষম পুরুষের কাছ থেকে নেওয়া হয়, যে তা পরিশোধে সক্ষম। নারী, শিশু, দাস, পাগল, অতিবৃদ্ধ এবং যারা তা পরিশোধে অক্ষম—তাদের কাছ থেকে জিজিয়া নেওয়া হয় না। হজরত ওমর (রা.) এক দরিদ্র ইহুদিকে ভিক্ষা করতে দেখে তার ওপর থেকে জিজিয়া মওকুফ করেছিলেন।
Advertisement
ইসলামপূর্ব যুগে রোমান সম্রাটরা কর্মজীবী মানুষের কাছ থেকে তাদের উৎপাদনের অর্ধেক পর্যন্ত কর আদায় করত এবং কখনো কখনো সীমাহীনভাবে তাদের সম্পদ কেড়ে নিত। ইসলাম এসে এই জুলুমের অবসান ঘটায় এবং তাদের থেকে বছরে মাত্র এক দিনার করে গ্রহণ করার নিয়ম চালু করে।” (আল জামে লি আহকামিল কোরআন)
জিজিয়া কর আরোপের কারণইসলামি রাষ্ট্রে মুসলমানদের জন্য সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক। অমুসলিমদের এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সেই অব্যাহতির বিনিময়েই জিজিয়া ধার্য করা হয়। অর্থাৎ জিজিয়া মূলত সামরিক সেবার পরিবর্তে আরোপ করা হয়।
ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমদের সামরিক সেবা দিতে বাধ্য না করার কারণ হলো, ইসলামি রাষ্ট্র একটি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র; তাই শুধু ইসলামের আদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিরাই রাষ্ট্র রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে থাকে। কেউ যে আদর্শে বিশ্বাস করে না, সেজন্য তাকে নিজের জীবন বাজি রাখতে বলা অমানবিক। অন্যান্য ধর্মগুলোও তাদের অনুসারীদেরকে নিজেদের ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধ করার অনুমতি দেয় না এবং সেজন্য লড়াই করাকেও বৈধ মনে করে না। এ জন্য ইসলাম ইসলামি রাষ্ট্র রক্ষার জন্য জিহাদ শুধু মুসলমানদের ওপর আবশ্যক করে এবং অমুসলিমদের ওপর জিজিয়া কর আরোপ করে।
উল্লেখ্য, ইসলামি রাষ্ট্রে মুসলমানরা ধর্মীয় ফরজ বিধান হিসেবে জাকাত দিতে বাধ্য থাকে, অমুসলিমরা জাকাত দিতে বাধ্য থাকে না। ফলে জিজিয়া কর ইসলামি রাষ্ট্রের মুসলমান ও অমুসলমান নাগরিকদের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করে না।
Advertisement
ইসলামি রাষ্ট্রে জিজিয়া আরোপিত হয় শুধু অমুসলিম যুদ্ধক্ষম সামর্থ্যবান পুরুষদের ওপর যারা অস্ত্র ধারণে সক্ষম। নিম্নোক্ত ব্যক্তিরা জিজিয়া থেকে অব্যাহতি পায়:
নারী। শিশু। বৃদ্ধ পুরুষ। অর্থনৈতিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি। অন্ধ ও শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি। যাজক, সন্ন্যাসী ও ইবাদতে নিমগ্ন ধর্মীয় ব্যক্তি।এ থেকে বোঝা যায় জিজিয়া কোনো দমনমূলক কর নয়; বরং দায়িত্ব থেকে অব্যহতি পাওয়ার বিনিময়ে শুধু সামর্থ্যবানদের ওপর আরোপিত একটি নাগরিক কর।
ওএফএফ