গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারি কর্মচারীদের প্রচারে সংবিধান কিংবা প্রচলিত আইনে কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সরকারি অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
Advertisement
তিনি বলেন, এ বিষয়ে সাবেক বিচারপতি, সাংবিধানিক মামলা পরিচালনায় অভিজ্ঞ আইনজীবী ও আইন বিভাগের শিক্ষকদের পরামর্শ নিয়েছে সরকার। তাদের অভিমত অনুযায়ী, সংবিধান, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও), গণভোট সংক্রান্ত অধ্যাদেশ কিংবা সরকারের জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান সংস্কার) আদেশ-২০২৫—কোনোটিতেই সরকারি কর্মচারীদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে নিষেধাজ্ঞা নেই।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে আয়োজিত ঢাকা বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বক্তব্য রাখেন।
সরকারি কর্মচারীরা নৈতিকভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার করতে পারেন না—এমন দাবির জবাবে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বর্তমান সরকার কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়। এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের রাজপথে মানুষের রক্তের বিনিময়ে।
Advertisement
তিনি বলেন, আপনি এটাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মনে করেন? যে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে? এটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়। নৈতিক জোর হচ্ছে মানুষের আত্মদান।
আলী রীয়াজ বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসক পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। সংবিধানের সাত অনুচ্ছেদে জনগণের অভিপ্রায়ের কথা বলা হয়েছে, যা রাজপথে প্রতিফলিত হয়েছে। সেই অভিপ্রায়ের ভিত্তিতেই এই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, সংবিধানের কোথাও অন্তর্বর্তী সরকারের উল্লেখ নেই। তবে সরকার প্রথম দিন থেকেই বলে আসছে, তাদের দায়িত্ব হলো প্রথমে সংস্কার, এরপর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং সবশেষে নির্বাচন।
সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, সরকার কোনো সংস্কার চাপিয়ে দিচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে। সরকার নিজেরা সংস্কার বাস্তবায়ন করছে না; গণভোটে যে বিষয়গুলো তোলা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করবেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা।
Advertisement
তিনি জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরুর পর ১৮০ দিনের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ দায়িত্ব পালন করবে।
আলী রীয়াজ বলেন, যে সরকার রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যার এজেন্ডা সংস্কার—তার চেয়ে বড় নৈতিক ভিত্তি আর কী হতে পারে? কেউ যদি এই সরকারকে এমন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার মনে করে, যার কাজ ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে চলে যাওয়া, তাহলে তা হবে জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
তিনি আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ কাউকে ক্ষমতায় বসানোর কিংবা কাউকে ক্ষমতার বাইরে রাখার এজেন্ডা নয়। এটি সব মানুষের সম্মতি নেওয়ার প্রক্রিয়া। সেই কারণেই গণভোট।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে মানুষকে বোঝাতে সরকারি কর্মচারীদের নির্দেশনা দিয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, যারা গণভোটকে পরাজিত করার চেষ্টা করছে, তাদের সঙ্গে নিজ উদ্যোগে কথা বলে বোঝাতে হবে। আমি বিশ্বাস করতে চাই, তাদের অসৎ উদ্দেশ্য নেই, কিন্তু তারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ৪৮টি গণভোট হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে। সরকার আন্তর্জাতিক পথ-পদ্ধতির বাইরে কিছু করছে না বলেও দাবি করেন তিনি।
কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মানুষকে জিজ্ঞাসা করতে হবে—‘রক্তে লেখা সনদ যে পথরেখা দেখাচ্ছে, আমি তার সঙ্গে আছি কি না।’ এটাই ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এর প্রশ্ন। তিনি বলেন, দেশের চাবি মানুষের হাতেই দেওয়া হয়েছে, আর সেই সিদ্ধান্তের সুযোগ সবার। সরকারি কর্মচারীদের কাজ হলো সেই বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া।
গণভোটের ফলাফল নির্ধারণে ভোটের কোনো ন্যূনতম সীমা নেই বলেও জানান আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় এমন কোনো ন্যূনতম ভোটের সীমা নির্ধারিত নেই।
কেএইচ/ইএ/জেআইএম