বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান ধানের শীষ মার্কায় ভোট দেওয়ায় অপরাধে ২০১৮ সালে নির্বাচনের রাতে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার সেই নারী। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের খুব ইচ্ছা ছিল পারিনি। এখন আমি তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে মনকে হালকা করতে চাই।
Advertisement
রোববার (১৮ জানুয়ারি) সুবর্ণচরের চরজুবলি ইউনিয়নের মধ্য বাগ্যা গ্রামের বাড়িতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জাগো নিউজের কাছে এ আকুতি জানান।
তিনি বলেন, ‘গত ৭ বছর সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। এমন নারকীয় রাত যেন কারো জীবনে না আসে। আজও সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। অনেক সময় বিছানা থেকে উঠতে পারি না। টাকার অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারিনি। সারারাত ব্যথায় ছটফট করি। সেই রাতের পর জীবন আর আগের মতো নেই।’
তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা কীভাবে করাবো সংসারইতো ঠিকমতো চলে না। স্বামী দীর্ঘদিন অসুস্থ, এক ছেলে প্রতিবন্ধী। বড় ছেলে আব্দুল কুদ্দুস অটোরিকশা চালিয়ে যা পায় তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। তাই নুন আনতে পানতা পুরায়।’
Advertisement
ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘তৎকালীন প্রশাসন আমাকে ঘর ও জমি দেওয়ার আশ্বাস দিলেও দল বিবেচনায় আমাকে কিছু দেওয়া হয়নি। তবে ঘটনার পর থেকে আমার দল বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান ও ‘নিজেরা করি’-এর সমন্বয়কারী খুশি কবিরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা যেভাবে খোঁজখবর নিয়েছেন তাতে আমি খুশি।’
তিনি বলেন, ‘এখন মামলায় ফাঁসির রায় হওয়া আসামিদের দ্রুত ফাঁসি চাই। সেইসঙ্গে ত্রয়োদশ ভোটের আগে সম্ভব হলে আমি আমার দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই। আমার মনের কথাগুলো তার কাছে বলতে চাই। অন্তত মরার আগে এটুকু সান্ত্বনা নিয়ে মরলেও শান্তি পাবো। এ জন্য আমি আমার দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
ওই নারীর স্বামী সিরাজ উদ্দিন বলেন, ‘আর্থিক সংকট ছাড়াও সামাজিক অপবাদ ভোগ করছি আমরা। বাজার-দোকানে গেলে নানা কটু কথা শুনতে হয়। অপরাধীদের আত্মীয়-স্বজনরা আমার বাড়ির নাম রেখেছে ‘ধর্ষণের বাড়ি’। আমি সামাজিক মর্যাদাসহ স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা চাই।’
বড় ছেলে আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘রাস্তাঘাটে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য শুনে আসছি। অনেক জায়গায় আমাদের বসতেও দেওয়া হয় না। সমাজ আমাদের সম্মান করে না, যেন আমরাই অপরাধী। আসামিদের পরিবারের পক্ষ থেকেও নানা হুমকি দেওয়া হয়। সামনে যে সরকার আসুম আমরা আমাদের স্বাভাবিক জীবনের নিরাপত্তা চাই।’
Advertisement
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকালে ভোটকেন্দ্রে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের পছন্দের বাইরে গিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেন ওই নারী। তাকে সেই ভোট প্রদানের জেরে ওইরাতে বাড়িতে প্রবেশ করে আওয়ামী দুর্বৃত্তরা চার সন্তানের সামনে ওই নারীকে বেদম মারধর করেন ও দলবদ্ধ ধর্ষণ করে। পরে দেশজুড়ে এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ উঠে।
এ নিয়ে মামলা দায়ের হলে ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক (জেলা জজ) ফাতেমা ফেরদৌস ১০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও ৬ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। তবে রায় এখনো কার্যকর হয়নি।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তরা হলেন, চরব্যাগ্যা গ্রামের মৃত খুরশিদ আলমের ছেলে মো. রুহুল আমিন, মৃত আবদুল হাসেমের ছেলে মো. হাসান আলী বুলু, মৃত ইসমাইলের ছেলে মো. সোহেল, মৃত আবদুল মান্নানের ছেলে স্বপন, আবুল কাশেমের ছেলে ইব্রাহীম খলিল, মৃত ছিডু মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন আবু, ফকির আহাম্মদের ছেলে মো. সালাউদ্দিন, মো. মোতাহের হোসেনের ছেলে মো. জসীম উদ্দিন, মো. রফিকের ছেলে মো. মুরাদ ও মৃত চাঁন মিয়ার ছেলে মো. জামাল হেঞ্জু।
যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, ইসমাইল হোসেনের ছেলে মো. হানিফ, আবদুল হামিদের ছেলে মো. চৌধুরী, মৃত আহম্মদ উল্যার ছেলে মো. বাদশা আলম, তোফায়েল আহম্মদের ছেলে মোশারফ, মৃত আরব আলীর ছেলে মো. মিন্টু ওরফে হেলাল ও আবুল কালামের ছেলে মো. সোহেল।
ইকবাল হোসেন মজনু/আরএইচ/এমএস