শীতের সকালে কুয়াশাচ্ছন্ন মেঠো পথে টাটকা খেজুরের রস পানের আনন্দ বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। কিন্তু গত দুই দশকে এই মধুময় ঐতিহ্যের ওপর ছায়া ফেলেছে এক মরণঘাতী ভাইরাস-নিপাহ। এটি এমন এক সংক্রামক ব্যাধি যার কোনো সুনির্দিষ্ট ঔষধ বা প্রতিষেধক নেই এবং আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
Advertisement
বিশেষ করে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে বাংলাদেশে আক্রান্তদের শতভাগ মৃত্যুহার পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ, লক্ষণ ও প্রতিকারে নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার। লিখেছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম-
নিপাহ ভাইরাস ও রোগের ইতিহাস কীনিপাহ ভাইরাস একটি প্রাণিবাহিত ভাইরাস, যা প্রধানত ফলখেকো বাদুড় থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায় শুকরের খামারে প্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত হয়।
Advertisement
তবে বাংলাদেশে এর চিত্র ভিন্ন। ২০০১ সালে মেহেরপুর জেলায় প্রথম নিপাহ আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়। এরপর থেকে প্রতি বছরই শীত মৌসুমে বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বাংলাদেশে এই ভাইরাসের মূল বাহক হলো 'টেরোপাস' প্রজাতির ফলখেকো বাদুড়।
নিপাহ ভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতি কেমন?আইইডিসিআর এর ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের নিপাহ পরিস্থিতির ধরন এবং ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৫টি জেলায় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আগে এটি নির্দিষ্ট কিছু জেলায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালে ৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন, যাদের প্রত্যেকেই মারা গেছেন। অর্থাৎ গত দুই বছরে নিপাহ আক্রান্তদের মৃত্যুহার ছিল ১০০%।
দুশ্চিন্তার ব্যাপার হলো, নিপাহ আগে কেবল শীতকালীন বা খেজুরের রসের সাথে সম্পর্কিত ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে নওগাঁয় এক শিশু আক্রান্ত হওয়ার মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, নিপাহ এখন আর কেবল শীতকালীন রোগ নয় বরং সারা বছরই এর ঝুঁকি রয়েছে।
Advertisement
সম্প্রতি কোন নতুন উপায়ে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে?খেজুরের রসের পাশাপাশি বাদুড়ের আধা-খাওয়া ফল (কালোজাম, আম, পেয়ারা, পেপে, বড়ই, তাল ইত্যাদি) খাওয়ার মাধ্যমেও মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে।
রোগটি কীভাবে ছড়ায়?নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণের চক্রটি মূলত বাদুড়-পরিবেশ-মানুষ-এই তিনের সমন্বয়ে গঠিত:১. দূষিত খেজুরের রস: বাদুড় যখন খেজুরের হাড়ি থেকে রস খাওয়ার চেষ্টা করে তখন তাদের লালা, প্রস্রাব বা মল রসের সঙ্গে মিশে যায়। এই কাঁচা রস পান করলে ভাইরাস সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
২. আধা-খাওয়া ফল: গাছ থেকে পড়া বা বাদুড়-পাখির কামড়ানো ফল সরাসরি খেলে সংক্রমণ হতে পারে।
৩. মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ: এটি নিপাহর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক। আক্রান্ত রোগীর কফ, থুথু বা লালার মাধ্যমে সুস্থ মানুষ সংক্রমিত হয়। পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ২৮% সংক্রমণ ঘটে আক্রান্ত ব্যক্তির সেবা করার সময় বা তার সংস্পর্শে আসায়।
রোগের লক্ষণসমূহ কী কী?ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশের সাধারণত ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পায়। তবে অ-মৌসুমি সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই সময় ভিন্ন হতে পারে।
প্রাথমিক উপসর্গ: তীব্র জ্বর, মাথা ব্যথা, পেশিতে ব্যথা এবং বমি বমি ভাব।
শ্বাসকষ্ট: রোগী দ্রুত নিউমোনিয়ার মতো তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগতে পারেন।
মস্তিষ্কের জটিলতা (এনসেফালাইটিস): নিপাহ মূলত মস্তিষ্কে আক্রমণ করে। ফলে রোগী প্রলাপ বকতে থাকে, ঝিঁমুনি আসে এবং খিঁচুনি দেখা দিতে পারে।
কোমা: রোগী কয়েক দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে কোমায় চলে যেতে পারেন।
আক্রান্ত হলে করণীয় কী?যদি কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার পর বা সন্দেহভাজন রোগীর সংস্পর্শে আসার পর কারো মধ্যে জ্বর ও মাথাব্যথা দেখা দেয়, তবে-
১. দেরি না করা: দ্রুত নিকটস্থ বড় হাসপাতাল বা আইসোলেশন সুবিধাযুক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিতে হবে।
২. তথ্য প্রদান: ডাক্তারকে অবশ্যই জানাতে হবে রোগী কাঁচা রস খেয়েছেন কিনা বা নিপাহ এলাকা ভ্রমণ করেছেন কি না।
৩. পৃথকীকরণ: রোগীকে সাধারণ মানুষের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা (আইসোলেশন) রাখতে হবে।
৪. নিরাপত্তা বজায় রাখা: রোগীর সেবা করার সময় অবশ্যই এন-৯৫ মাস্ক এবং গ্লাভস পরতে হবে। রোগীর ব্যবহৃত থালা-বাসন বা কাপড় অন্য কেউ ব্যবহার করবেন না।
প্রতিরোধমূলক কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন? যেহেতু এই ভাইরাসের কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন বা ঔষধ নেই, তাই সচেতনতাই আমাদের একমাত্র ঢাল।
১. কাঁচা রস বর্জন: বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে পরামর্শ দিয়েছেন যে, কোনোভাবেই কাঁচা খেজুরের রস পান করা যাবে না। রস খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা থাকলে তা অন্তত ৭০-১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটিয়ে পান করতে হবে।
২. পিঠা-গুড় নিরাপদ: রস দিয়ে তৈরি করা গুড়, পাটালি বা ভাপে তৈরি করা পিঠা খাওয়া নিরাপদ, কারণ উচ্চ তাপে ভাইরাস মারা যায়।
৩. আধা-খাওয়া ফল বর্জন: গাছ থেকে নিচে পড়া বা আংশিক খাওয়া ফল কোনোভাবেই খাবেন না। সব ফল ভালো করে ধুয়ে ও খোসা ছাড়িয়ে খান।
৪. ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি: নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ুন। বিশেষ করে অসুস্থ মানুষের সেবা করার পর অবশ্যই ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।
নিপাহ ভাইরাস এখন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় জনস্বাস্থ্য হুমকি। শীতের আনন্দ যেন কারো জীবনের শেষ আনন্দ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিপাহর ১০০% মৃত্যুহার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এক গ্লাস কাঁচা রসের মূল্য জীবনের চেয়ে বেশি হতে পারে না। আসুন, নিজে সচেতন হই এবং অন্যদেরও সচেতন করি।
আরও পড়ুন: খেজুরের রসে নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি, সতর্কতা জরুরি শীতে টাটকা খেজুরের রস থেকে হতে পারে ভয়াবহ বিপদ
এসএকেওয়াই/