বাংলার দক্ষিণ উপকূলের দিগন্তজোড়া চরাঞ্চল আর লোনা পানির ছোঁয়া যেখানে মিশেছে; সেখানেই একসময় রাজত্ব ছিল বিশাল শিংওয়ালা কালো রঙের শক্তিশালী এক প্রাণীর—মহিষ। উপকূলীয় জীবনযাত্রার নীরব কিন্তু শক্তিশালী সহচর ছিল প্রাণীটি। গ্রামীণ জনপদে মহিষ কেবল গৃহপালিত প্রাণীই নয়—ছিল ক্ষমতা, সম্পদ ও রাজকীয় প্রভাবের প্রতীক। ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মহিষ ছিল উপকূলীয় রাজত্বের অনিবার্য চিহ্ন। মহিষের গুরুত্ব এতটাই গভীর ছিল, একে বলা হতো ‘চর অঞ্চলের রাজা’। তবে কালের বিবর্তনে এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই ঐতিহ্যে আজ ভাটা পড়েছে।
Advertisement
বাংলার উপকূলীয় অঞ্চল ভোলা, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, বরগুনা, সাতক্ষীরা কিংবা সুন্দরবনের প্রান্ত ভূমিতে মহিষ পালনের ইতিহাস শতাব্দীপ্রাচীন। এ ছাড়া একসময় ভোলার চরফ্যাশন, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী কিংবা সন্দ্বীপের উপকূলীয় চরে যার যত বেশি মহিষের পাল ছিল, তাকে তত বেশি প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য মনে করা হতো। ব্রিটিশ আমলেও স্থানীয় জমিদার, তালুকদার ও প্রভাবশালী পরিবারগুলোর পরিচয় মিলতো তাদের মহিষের পালের আকারে। যত বড় পাল; তত বেশি ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি।
লোকমুখে প্রচলিত গল্পে জানা যায়, শাসকগোষ্ঠী মহিষকে রাজকীয় প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করতো। কোনো কোনো অঞ্চলে রাজ্য শক্তির প্রতীক হিসেবে মহিষের শিং বা প্রতিকৃতি ব্যবহারের প্রমাণও পাওয়া যায়। কোনো কোনো এলাকায় খাজনা পরিশোধ হতো মহিষের মাধ্যমে। তাই তো উপকূলের শাসনব্যবস্থায় মহিষ হয়ে উঠেছিল এক ধরনের ‘জীবন্ত মুদ্রা’।
লোকজ সংস্কৃতিউপকূলীয় রাজত্বের প্রতীক হিসেবে মহিষের স্থান মিলবে লোকগাঁথাতেও। লৌকিক ধর্মেও ‘দক্ষিণ রায়’ বা বনবিবির সাঙ্গপাঙ্গ হিসেবে মহিষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন বাংলার অনেক জমিদার বা জোতদার তাদের আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য মহিষের লড়াইয়ের আয়োজন করতেন। এ ছাড়া গ্রামীণ মেলা বা উৎসবে মহিষের শক্তি প্রদর্শন ছিল জনপ্রিয় বিনোদন। বিশাল দেহের প্রাণীটির ধৈর্য এবং যুদ্ধের সময় তার তেজ ছিল বীরত্বের প্রতীক।
Advertisement
অনেক পরিবারে কন্যাদানের সময় মহিষ ছিল গুরুত্বপূর্ণ যৌতুক বা উপহার। এতে বোঝা যায়, সামাজিক কাঠামোতেও মহিষ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উপকূলীয় লোকগান, প্রবাদ ও আঞ্চলিক কথ্য ভাষায় মহিষের উপস্থিতি আজও লক্ষণীয়। বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে আজও শোনা যায়—‘মহিষের পাল মানেই বাড়ির রাজত্ব।’ যা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মহিষের আধ্যাত্মিক সংযোগকে ফুটিয়ে তোলে। এই সংযোগ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান।
মহিষ কেন অনিবার্যউপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত মাটি, জলাবদ্ধ চর আর জোয়ার-ভাটার প্রতিকূল পরিবেশে গরু যেখানে টিকতে হিমশিম খেত; সেখানে মহিষ ছিল অদম্য। লোনা জল আর ঘাস খেয়েই রাজত্ব করে বেড়ায় মহিষ। কাদা ও লোনা পানিতে চলাচলে অভ্যস্ত এই প্রাণী কৃষিকাজে দিয়েছে নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা। পাওয়ার টিলার আসার আগে কর্দমাক্ত চরে লাঙল টানা কিংবা জলাভূমি পেরিয়ে চলাচলে কিংবা বড় বড় কাঠের গুঁড়ি পরিবহনে একমাত্র ভরসা ছিল শক্তিশালী প্রাণীটি। এই প্রাকৃতিক সক্ষমতাই মহিষকে উপকূলীয় অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলে।
আরও পড়ুন
রেজাউলের দুগ্ধ খামারের বায়োগ্যাসে চলে রান্নার কাজ অর্থনীতির চালিকাশক্তিএকসময় উপকূলীয় জনপদের অর্থনৈতিক কাঠামোর বড় অংশজুড়ে ছিল মহিষ। দুধ, ঘি, মাংস এবং শ্রম—সবদিক থেকেই মহিষ ছিল লাভজনক সম্পদ। মহিষের দুধের ঘি ও দুগ্ধজাতপণ্য স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তে সরবরাহ হতো। মহিষের দুধ থেকে তৈরি দই ছিল জগদ্বিখ্যাত। বিশেষ করে ভোলার ‘মহিষের কাঁচা দুধের দই’ এখনো আভিজাত্যের প্রতীক। অনেক পরিবারে মহিষ ছিল সঞ্চয়ের বিকল্প। দুর্যোগ বা দুর্ভিক্ষে মহিষ বিক্রি করে পরিবার টিকে থাকার নজিরও আছে অসংখ্য। সামাজিক রীতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়—বিয়েতে মহিষ ছিল মর্যাদাপূর্ণ উপহার।
Advertisement
উপকূলের মানুষ এবং মহিষের লড়াই একই সুতোয় গাঁথা। ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী গোর্কি কিংবা পরবর্তী সিডর-আইলার মতো জলোচ্ছ্বাসে অসংখ্য মহিষ প্রাণ হারিয়েছে। তবুও টিকে থাকা মহিষগুলোই ছিল দুর্যোগ পরবর্তী উপকূলীয় মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর একমাত্র অবলম্বন।
সংকটে মহিষ পালনদুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমানে চারণভূমির সংকটের কারণে মহিষের রাজকীয় ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে। বনায়ন এবং শিল্পায়নের কারণে মহিষের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র বা ‘বাথান’ কমে যাচ্ছে। পশুখাদ্যের উচ্চমূল্য এবং সঠিক প্রজনন ব্যবস্থার অভাবে খামারিরাও আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ ছাড়া আধুনিক কৃষিযন্ত্র, সড়ক যোগাযোগ ও বিকল্প জীবিকার প্রসারে মহিষের ভূমিকা অনেকটাই কমে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততার বিস্তার ও চরাঞ্চল সংকুচিত হওয়াও মহিষ পালনের বড় চ্যালেঞ্জ।
গবাদিপশুর অ্যানথ্রাক্স যখন মানবদেহে, করণীয় কী?ভোলার চরফ্যাশনে দেখা হয় প্রবীণ কৃষক আবু তাহের মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একসময় মহিষ মানেই রাজত্বের শক্তি। মহিষ ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলে গবাদিপশু পালন কমিয়ে এনেছে কৃষক পরিবারগুলো। ঝড়-বন্যার সময় গবাদিপশু রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন। তবে একটু বেশিই প্রভাব পড়েছে মহিষ পালনের ওপর। কিছু পরিবারে মহিষ টিকে আছে ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে।’
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মহিষের জাত উন্নয়ন এবং চারণভূমি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবেই চরাঞ্চলের দিগন্তে মহিষের পালের রাজকীয় দৃশ্য ফিরে আসবে। উপকূল উন্নয়নে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কার ফোরাম’র প্রধান সমন্বয়কারী সুমন সিকদার বলেন, ‘উপকূলীয় রাজত্বের প্রতীকটিকে টিকিয়ে রাখা কেবল অর্থনীতির জন্য নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বার্থেও জরুরি। মহিষ কেবল একটি পশু নয়, এটি আমাদের উপকূলীয় ডিএনএর অংশ। চরের প্রতিটি ধূলিকণা আর লোনা বাতাসে মহিষের খুরের শব্দ মিশে আছে।’
মহিষ ছিল উপকূলীয় রাজত্বের প্রতীক—এ ধারণা শুধু ইতিহাসের গল্প নয়, এটি উপকূলীয় মানুষের জীবনসংগ্রাম, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির প্রতিফলন। আধুনিকতার চাপে এই প্রতীক হয়তো অনেকটাই ম্লান কিন্তু উপকূলের স্মৃতি ও লোকজ ইতিহাসে মহিষ আজও রাজকীয় মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।
এসইউ