অর্থনীতি

শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপি থেকে এক বছরে রূপালী ব্যাংকের আদায় ২৩৩৫ কোটি

ব্যাংকিং খাতের সংকটের মধ্যেও খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক পিএলসি। দক্ষ নেতৃত্ব ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার ফলে ২০২৫ সালে শ্রেণিকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণ থেকে ব্যাংকটি মোট ২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়।

Advertisement

একই বছরে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা হয় ৩৬১ কোটি টাকা নগদ। পাশাপাশি সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায় হয় আরও ১ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা আদায় রূপালী ব্যাংকের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তাছাড়া দীর্ঘদিনের চাপ কাটিয়ে শ্রেণিকৃত ঋণ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে রূপালী ব্যাংক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত ঋণ আগের বছরের তুলনায় ১ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৬৪১ কোটি টাকায়, যা দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলার ফল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী ও কার্যকর সিদ্ধান্তই এই সাফল্যের প্রধান চালিকাশক্তি। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খেলাপি ঋণ আদায়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। এর ফলশ্রুতিতে ২০২৫ সালে শ্রেণিকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণ থেকে ব্যাংকটি ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা নগদ আদায় করতে সক্ষম হয়, যা রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

Advertisement

খেলাপি ঋণ আদায়ে গতি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মামলা ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা হয়। প্রধান কার্যালয় থেকে বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে তদারকির ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮২৩টি মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়, যেখানে আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৫৭১টি। দ্রুত আইনি সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে নিয়োগ দেওয়া হয় একজন চিফ লিগ্যাল অ্যাডভাইজার।

এসব উদ্যোগের ফলে ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের চিত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৬৪১ কোটি টাকায়। একই সময়ে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৪২ শতাংশ থেকে কমে ৩৮ শতাংশে নেমে আসে। পাশাপাশি প্রভিশন ঘাটতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, যা ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদনমুখী ও এসএমই খাতে ঋণ সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেয় রূপালী ব্যাংক। ২০২৫ সালে এসএমই খাতে নতুন করে ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়, যা ব্যাংকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে রূপালী ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়েও নতুন মাত্রা যোগ করেছে রূপালী ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রযুক্তিতে পরিচালিত মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘রূপালী ক্যাশ’ চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা সহজ ও নিরাপদ আর্থিক লেনদেন সুবিধা পাচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে নিয়োগ দেওয়া হয় একজন চিফ ইনফরমেশন টেকনোলজি অফিসার।

Advertisement

২০২৫ সালে আমানত সংগ্রহ ও গ্রাহকসেবায়ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়। নতুন করে ৮ লাখ ৪৯ হাজারের বেশি হিসাব খোলা হয়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার বেশি। একই সময়ে ব্যাংকের আমানত বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা সুদবিহীন ও স্বল্প সুদের আমানত।

পরিচালনা পর্ষদের পরামর্শে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেতৃত্বে নেওয়া ১০০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে ২০২৫ সালে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার নতুন আমানত সংগ্রহ এবং প্রায় ৪ লাখ নতুন হিসাব খোলা সম্ভব হয়। এর ফলে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি আরও সুদৃঢ় হয়।

রেমিট্যান্স আহরণেও সাফল্য দেখিয়েছে রূপালী ব্যাংক। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির মাধ্যমে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। এক্সচেঞ্জ হাউসের কার্যক্রম জোরদার, প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সেবা এবং ডিজিটাল চ্যানেলের ব্যবহার বৃদ্ধিই এই অগ্রগতির মূল কারণ বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

২০২৫ সালে ব্যাংকের রেগুলেটরি ক্যাপিটাল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৩ কোটি টাকা বেশি। ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেট রেশিও দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ০৪ শতাংশে। একই সঙ্গে প্রভিশন ঘাটতি কমেছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকটি ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ডেবিট কার্ড ইস্যু করেছে, যা ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

সামগ্রিক অগ্রগতি প্রসঙ্গে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের লক্ষ্য কেবল তাৎক্ষণিক সাফল্য নয়; বরং ব্যাংককে একটি টেকসই, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। শৃঙ্খলা, জবাবদিহি এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নই আমাদের অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি।

তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালের শুরুতে বিভিন্ন কারণে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেলেও দক্ষ নেতৃত্ব ও কার্যকর কর্মকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে অক্টোবর মাসে প্রায় ৪৮ শতাংশ ও ২৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানো শ্রেণিকৃত ঋণ বছর শেষে কমে ৩৮ শতাংশ এবং ১৯ হাজার ৬৪১ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দূরদর্শী নেতৃত্ব, কার্যকর তদারকি ও প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের ফলে রূপালী ব্যাংক আবারও গ্রাহকের আস্থার প্রতীকে পরিণত হচ্ছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ব্যাংকটি রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের একটি শক্তিশালী ও উদাহরণযোগ্য প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে বলে তারা আশাবাদী।

ইএআর/এমএমকে