যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিস শহরে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের মধ্যে ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে আরও এক মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় শহরজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সশস্ত্র ফেডারেল বাহিনী দ্রুত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের নেতারা।
Advertisement
মিনিয়াপোলিস পুলিশ বিভাগের প্রধান ব্রায়ান ও’হারা জানান, শনিবার (২৪ জানুয়ারি) গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে মারা যান ৩৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। তিনি মিনিয়াপোলিসের বাসিন্দা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন। নিহত ব্যক্তির বাবা-মা তাকে অ্যালেক্স প্রেট্টি হিসেবে শনাক্ত করেছেন। তিনি একটি হাসপাতালের আইসিইউতে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী নীতির অংশ হিসেবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মিনিয়াপোলিসে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টসহ (আইসিই) বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থার এজেন্ট মোতায়েন করা হয়েছে। এসব অভিযানের মধ্যেই এই গুলির ঘটনা ঘটে।
আরও পড়ুন>>অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে নারী নিহত, বিক্ষোভে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্র২ বছরের শিশুকে আটক করে ভিনরাজ্যে পাঠালো ট্রাম্পের আইসিই বাহিনীট্রাম্পের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিক্ষোভ
Advertisement
এর আগে, গত ৭ জানুয়ারি মিনিয়াপোলিসে আইসিই কর্মকর্তার গুলিতে রেনে গুড নামে ৩৭ বছর বয়সী এক নারী নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকেই শহরটিতে প্রতিদিন বিক্ষোভ চলছিল। গত সপ্তাহে আলাদা আরেক ঘটনায় মিনিয়াপোলিসে এক ভেনেজুয়েলান নাগরিকও ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে আহত হন।
মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর টিম ওয়ালজ সেন্ট পল শহরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিষয়টি বহু আগেই কেবল অভিবাসন প্রয়োগের সীমা ছাড়িয়েছে। তার কথায়, এটি এখন অঙ্গরাজ্যের মানুষের বিরুদ্ধে সংগঠিত নিষ্ঠুরতার এক অভিযান। তিনি জানান, এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত মিনেসোটা কর্তৃপক্ষই পরিচালনা করবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ দাবি করেছে, একজন ইউএস বর্ডার প্যাট্রোল এজেন্ট একজন সশস্ত্র ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেন। ওই ব্যক্তি একটি হ্যান্ডগান বহন করছিলেন এবং অস্ত্র নামাতে বাধা দিচ্ছিলেন। বিভাগের মুখপাত্র ট্রিসিয়া ম্যাকলাফলিন বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি সহিংসভাবে প্রতিরোধ করায় আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ এবং মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রেকে আক্রমণ করে বলেন, তারা উসকানিমূলক ও বিপজ্জনক বক্তব্য দিয়ে বিদ্রোহে প্ররোচনা দিচ্ছেন। ট্রাম্প দাবি করেন, আইসিই কর্মকর্তাদের রক্ষা করতে স্থানীয় পুলিশকে কেন অনুমতি দেওয়া হয়নি, সে প্রশ্নের জবাব দেওয়া দরকার।
Advertisement
প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, অ্যালেক্স প্রেট্টি রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের মোবাইল ফোনে ফেডারেল এজেন্টদের ছবি তুলছিলেন। একপর্যায়ে এক এজেন্ট পিপার স্প্রে ব্যবহার করলে প্রেট্টি তা ঠেকানোর চেষ্টা করেন এবং অন্য বিক্ষোভকারীদের সাহায্য করেন। এরপর একাধিক এজেন্ট তাকে মাটিতে ফেলে মাথা ও শরীরে আঘাত করতে থাকে। মাটিতে ধরে রাখার সময় এক এজেন্ট অস্ত্র বের করেন এবং একাধিক গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে প্রেট্টির নিথর দেহ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
US federal agents have shot and killed a 37-year-old US citizen in Minneapolis amid an immigration crackdown in the city. Authorities say the man had a handgun and ‘resisted attempts to be disarmed’. He died in hospital after suffering multiple gunshot wounds. pic.twitter.com/vUgDrF9yY9
— Al Jazeera English (@AJEnglish) January 24, 2026তদন্তকারী সংস্থা বেলিংক্যাট জানায়, ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, প্রথম গুলির আগে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে একটি অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। তাদের দাবি, অন্তত দুইজন এজেন্ট গুলি চালান এবং মোট ১০টির বেশি গুলির শব্দ শোনা যায়। বেশিরভাগ গুলিই প্রেট্টি মাটিতে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকার সময় ছোড়া হয়।
পুলিশ প্রধান ব্রায়ান ও’হারা বলেন, নিহত ব্যক্তি বৈধভাবে অস্ত্র বহনের অনুমতিপ্রাপ্ত ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মিনেসোটায় অনুমতি থাকলে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র বহন করা আইনসম্মত।
তীব্র হয়েছে বিক্ষোভেঘটনার পর মিনিয়াপোলিসের ওই এলাকায় কয়েকশ মানুষ বিক্ষোভে জড়ো হন। বিক্ষোভকারীরা ফেডারেল এজেন্টদের লক্ষ্য করে স্লোগান দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এজেন্টরা কাঁদানে গ্যাস ও ফ্ল্যাশব্যাং গ্রেনেড ব্যবহার করেন।
মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে বলেন, ছয়জনের বেশি মুখোশধারী এজেন্ট একজন বাসিন্দাকে মারধর করে গুলি করে হত্যা করেছেন—এমন ভিডিও তিনি নিজেই দেখেছেন। তার প্রশ্ন, আর কতজন মার্কিন নাগরিকের প্রাণ গেলে এই অভিযান বন্ধ হবে?
ডেমোক্র্যাট সিনেটর অ্যামি ক্লোবুচার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ট্রাম্প প্রশাসনকে এখনই মিনেসোটা থেকে আইসিই প্রত্যাহার করতে হবে। কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর এই হত্যাকাণ্ডকে ‘একটি প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড’ বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, ট্রাম্প মিনিয়াপোলিসকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছেন।
ঘটনার পর গভর্নর টিম ওয়ালজ জানান, তিনি হোয়াইট হাউজের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন এবং পরিস্থিতি শান্ত রাখতে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। মিনিয়াপোলিস সিটি কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের শান্ত থাকার এবং ঘটনাস্থল এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরাকেএএ/