কড়াইল বস্তি চেনে না, ঢাকা শহরে এমন মানুষ পাওয়া ভার। ঢাকার বনানী থানার আওতাধীন এ এলাকা গুলশান, ক্যান্টনমেন্ট, ভাসানটেক নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ আসন। এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭। এর মধ্যে প্রায় ১০০ একর আয়তনের কড়াইল বস্তিতে ভোটার প্রায় ৪৫ হাজার। এখানকার ভোটারদের দাবি, ‘কড়াইল বস্তির ভোট যার, সংসদ সদস্য পদ তার’।
Advertisement
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কড়াইল বস্তির ভোটারদের কদর বেড়েছে। চায়ের দোকানগুলোতে জমে উঠেছে নির্বাচনি আড্ডা। ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাচ্ছেন প্রার্থীরা। তারা বস্তিবাসীদের ফ্ল্যাট নির্মাণ করে দেওয়া, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
তবে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি গ্রহণে বেশ হিসাব-নিকাশ করছেন ভোটাররা। তারা জানান, বিগত সময়ে বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নয়নের নামে বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সংসদ সদস্য বা সিটি করপোরেশনের মেয়র-কাউন্সিলর প্রার্থীরা। কিন্তু তারা কেউ নিজ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করেনি। নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে তাদের আর দেখা মিলতো না। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীসময়ে মানুষের চিন্তার পরিবর্তন হয়েছে। তারা জনবান্ধব সংসদ সদস্য চান। যে তাদের সুখে-দুঃখে সব সময় পাশে থাকবেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, এবার ঢাকা-১৭ আসনে মোট ১২ জন প্রার্থী সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এর মধ্যে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, দাঁড়িপাল্লায় জামায়াতে ইসলামীর স ম খালিদুজ্জামান, হাতপাখায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ উল্যাহ, লাঙ্গলে জাতীয় পার্টির আতিক আহমেদ, বাইসাইকেলে জাতীয় পার্টি (জেপি) তপু রায়হান, কাঁঠালে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির কামরুল হাসান নাসিম, ময়ূরে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আনিসুজ্জামান খোকন, মোরগে স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী এনায়েত উল্লাহ, ডাবে বাংলাদেশ কংগ্রেসের শামীম আহমেদ, আনারসে বাংলাদেশ লেবার পার্টির মোহাম্মদ রাশেদুল হক, টেলিভিশনে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) এস এম আবুল কালাম আজাদ ও আপেলে ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মঞ্জুর হুমায়ুন। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে কড়াইল বস্তিতে নিয়মিত যাতায়াত করছেন প্রার্থীরা।
Advertisement
গত ২৫ নভেম্বর কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে বস্তির প্রায় ১০ হাজার ঘর পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হন লাখো নিম্ন আয়ের মানুষ। এমন অবস্থায় বস্তিবাসী খাবার সংকট, তীব্র শীতে গরম কাপড় সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়েন। ওই সময় জামায়াতের সংসদ সদস্য প্রার্থী ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়ে বেশ আলোচনায় আসেন।
কড়াইল বস্তির আদর্শ নগরের বাসিন্দা জাকির হোসেন। তিনি ১৯ জানুয়ারি টিঅ্যান্ডটি মাঠের উত্তর পাশে ফুটপাতের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর নির্বাচনি ক্যাম্পে বসে ছিলেন। আলাপকালে জাকির জাগো নিউজকে বলেন, ‘খালিদুজ্জামানের ব্যবহারে বস্তিবাসী খুবই সন্তুষ্ট। এখন কড়াইল বস্তির বিভিন্ন পয়েন্টে তার নির্বাচনি ক্যাম্প করা হয়েছে। সকাল-বিকেল তার পক্ষে বস্তিতে মিছিল হয়। আশা করি, বস্তির অধিকাংশ ভোট জামায়াত পাবে।’
গত ২০ জানুয়ারি কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে সদ্যপ্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ওই মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি তার বক্তৃতায় কড়াইলের বস্তিতে কাঁচাঘরে যারা থাকেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তাদের বহুতল ভবন নির্মাণ করে ছোট ছোট ফ্ল্যাট বানিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন।
কড়াইল বস্তির বেলতলার বাসিন্দা মাসুদ রানা। তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে পরিবার নিয়ে ওই বস্তিতে বাস করেন। তিনি জানান, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ আসনে প্রার্থী হওয়ায় কড়াইল বস্তির ভোটার এখন মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। তাদের এক ভাগ ভোট ধানের শীষ, আরেক ভাগ দাঁড়িপাল্লায়।
Advertisement
কড়াইল বস্তি রোডের বাসিন্দা সেলিম রেজা। এ রোডেই তার একটি চায়ের দোকান। দোকানের সামনে ধানের শীষ প্রতীক সম্বলিত একটি ব্যানার ঝুলছে। সেলিম রেজা জাগো নিউজকে বলেন, ‘কড়াইল বস্তিতে তারেক রহমানের সমাবেশে বিএনপির সমর্থক শতগুণ বেড়েছে। তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি জনগণ গ্রহণ করেছে। বস্তিবাসীর বিশ্বাস সামনের নির্বাচনে বিএনপি বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন। এ বস্তির জীবনমান উন্নয়নে কাউকে আর কিছু বলা লাগবে না।’
বস্তির টিঅ্যান্ডটি মাঠ সংলগ্ন একটি ঘরে পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন দেলোয়ার। তিনি পেশায় রিকশাচালক। দেলোয়ার বলেন, ‘তারেক রহমান এ এলাকায় এমপি প্রার্থী হওয়ায় ভোটের আমেজ বেড়েছে। আগে জামায়াতের প্রার্থী বেশি ভোটে জেতার সম্ভাবনা থাকলেও এখন অনেক হিসাব মিলিয়ে দেখার আছে। এখানকার ভোটাররা অধিকাংশ বলেন, কড়াইল বস্তির ভোট যার, সংসদ সদস্য পদ তার।’
কড়াইল বস্তির তিন দিকে (গুলশান-বনানী) দেশের সবচেয়ে ধনী মানুষের বাস। আর দক্ষিণে মহাখালী। এ তিনটি এলাকার যে কোনো একটি এলাকার বহুতল ভবনের ওপর দাঁড়ালে কড়াইল বস্তি চোখে পড়ে। তখন এক পলকে দেখা যায়, চারপাশে অট্টালিকায় ঘেরা টিনের হাজারো ঘর। কিন্তু বস্তি থেকে বের হওয়ার মাত্র দুটি বড় রাস্তা রয়েছে। বাকিগুলো শুধু গলিপথ। হেঁটে চলতে হয়। রিকশা বা অন্য কোনো যান চলে না। প্রতিটি গলি আবার খানাখন্দে ভরা। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা খুবই নাজুক। গুলশান লেকের ময়লা পানিতে জন্মানো মশায় সন্ধ্যার পর বস্তিতে থাকা দায়।
এমএমএ/এসএনআর/এএসএ