দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে গণভোট ছিল না। তবে এবার জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হবে। ফলে বাড়ছে খরচ। আসন্ন নির্বাচনে সরকারের কোষাগার থেকে খরচ হবে মোট ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এ হিসাবে এবার ভোটে ব্যয় বাড়ছে ৮৭৪ কোটি টাকা।
Advertisement
চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের বাজেটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এর সঙ্গে সম্প্রতি বরাদ্দ দেওয়া অপ্রত্যাশিত খাতের বরাদ্দ মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচনে সরকারের কোষাগার থেকে খরচ বাড়ানো হলো। এবার সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের দৈনিক খোরাকি ভাতায়। এতে বরাদ্দ থাকছে ৭৩০ কোটি টাকা।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বাজেট শাখা থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। মূলত জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট হওয়ার কারণেই ব্যয় বাড়ছে। প্রচার-প্রচারণা, ব্যালট ছাপানোসহ নানান খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে গণভোট। নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি গণভোটের প্রচারে নির্বাচনি ব্যয় থেকে এবার ছয় মন্ত্রণালয় পাচ্ছে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা।
ইসির বাজেট শাখা থেকে জানা যায়, গণভোটের প্রচারের জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় পাচ্ছে ৪৬ কোটি টাকা। এছাড়া তথ্য মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা, ধর্ম মন্ত্রণালয় ৭ কোটি টাকা, এলজিইডি ৭২ কোটি টাকা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা পাচ্ছে। এই ছয় মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চার মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে বরাদ্দ পেয়েছে এবং সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর দেওয়া হবে। পাশাপশি নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখা গণভোট প্রচারে ৪ কোটি টাকা ব্যয় করছে বলে জানিয়েছে বাজেট শাখা।
Advertisement
বাজেট শাখা আরও জানায়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য মোট বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ব্যয় হবে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয় হবে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা।
নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, প্রথমে আমরা জাতীয় নির্বাচনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাই। পরবর্তী সময়ে আমাদেরকে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট করার জন্য নির্দেশনা দেয় সরকার। সে মোতাবেক আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত বাজেটের চাহিদা পাঠাই। যার পরিপ্রেক্ষিতে এক হাজার ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাই। সব মিলিয়ে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ অনুযায়ী কিস্তির টাকা সময়মতো পেয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা গণভোটের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যালট পেপার, কর্মী, যাতায়াত, খামসহ নির্বাচনি সামগ্রী বাবদ খরচ করছি। কিছু প্রচার-প্রচারণা ও কেনাকাটা কমিশন নিজেই করছে। এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের এনওসির পরিপ্রেক্ষিতে এলজিইডি (সিসি ক্যামেরা), সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ধর্ম, তথ্য, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় গণভোটের পক্ষে প্রচারের জন্য আমাদের বরাদ্দ থেকে অর্থ নিয়েছে। তবে তারা কীভাবে প্রচার করছে এবং কাকে দিয়ে প্রচার করছে সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।
আরও পড়ুনগণভোটের প্রচারে ছয় মন্ত্রণালয় পাচ্ছে ১৪০ কোটি টাকা ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে গাড়ি দিতে পারবেন না প্রার্থীরা: ইসি
Advertisement
অর্থ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে নির্বাচন-সংক্রান্ত এ বিপুল অঙ্কের অর্থব্যয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। এতে বলা হয়, ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘দ্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০২৬’ এবং ‘দ্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০২৫’ সহ যাবতীয় আর্থিক বিধিবিধান ও নিয়ম যথাযথ অনুসরণ করতে হবে। এরই মধ্যে বরাদ্দকৃত ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা এবং অতিরিক্ত বরাদ্দের এক হাজার ৭০ কোটি টাকার প্রথম কিস্তি ২৬৮ কোটি টাকার প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে অবশিষ্ট দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তি ছাড় করা হবে। এছাড়া নির্বাচন-সংক্রান্ত অন্যান্য যাবতীয় ব্যয় ইসি সচিবালয়ের জাতীয় বাজেট থেকে নির্বাহ করতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, যে খাতে ব্যয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হলো, সেই খাত ছাড়া অন্য কোনো খাতে এ অর্থ খরচ করা যাবে না। এ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যয়কারী কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে। আর বরাদ্দকৃত অর্থ সাশ্রয় হলে ৩০ জুনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
নির্বাচন পরিচালনার আর্থিক ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের দৈনিক খোরাকি ভাতায়। এতে বরাদ্দ থাকছে ৭৩০ কোটি টাকা। এছাড়া সরকারি গাড়ি ব্যবহারের জ্বালানি তেলে ব্যয় হবে ২৯৮ কোটি টাকা এবং চুক্তিভিত্তিক যানবাহন ব্যবহারে ব্যয় আরও ২০১ কোটি টাকা। মনিহারি পণ্য কেনাকাটায় ৫৮১ কোটি, নির্বাচন পরিচালনায় অংশগ্রহণকারীদের সম্মানি ব্যয় ৫১৫ কোটি, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয় ১৬২ কোটি, মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। যাতায়াত ভাতায় ১০৯ কোটি এবং বিজ্ঞাপন ও প্রচারে ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে।
ব্যয়ের তালিকায় সংশ্লিষ্টদের আপ্যায়ন খরচ বাবদ ১৮৪ কোটি টাকা, পরিবহন ব্যয় ৮০ কোটি, অনিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি ৩১ কোটি, স্ট্যাম্প ও সিল ১৭ কোটি, মেশিন ও সরঞ্জাম ভাড়া ১৫ কোটি, প্রশিক্ষণ পরিচালনা ব্যয় ৭ কোটি, ব্যালট বাক্স ৫ কোটি এবং অন্যান্য খাতে ৩ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
ইসি সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে বিশ্বের ১২৩ দেশ থেকে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করেছেন। প্রতিটি ভোটের জন্য সরকারকে গড়ে ৭০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এছাড়া সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা নিজ নিজ প্রতীক নিয়ে প্রচারণা চালান। কিন্তু গণভোটে কোনো প্রার্থী বা প্রতীক না থাকায় গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ভোটারের মধ্যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝাতে পৃথকভাবে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হচ্ছে, যা নির্বাচন কমিশনকেই করতে হচ্ছে। এ কারণেই নির্বাচনি কার্যক্রমের পরিধি সম্প্রসারিত হচ্ছে, খরচও বাড়ছে।
এছাড়া নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে ইসি। ১০ লাখের বেশি প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন গ্রুপে শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ভোটগ্রহণের ৪-৫ দিন আগে শেষ হবে। এ প্রশিক্ষণ খাতে প্রায় ৭ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। এরপর তাদের নির্বাচন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার পর সম্মানি দেওয়া হবে।
২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য বরাদ্দ ছিল ৭০০ কোটি টাকা। যদিও পরে তা কিছুটা বাড়ানো হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো অংশ নেয়। এর আগে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ কিছু রাজনৈতিক দল। ওই নির্বাচনে খরচ হয় প্রায় ২৬৫ কোটি টাকা। এছাড়া ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনের জন্য ব্যয় হয় প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা।
কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবস্থাপনা ও নির্বাচনি নানান উপকরণের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এ কারণেই ক্রমশ নির্বাচনের খরচ বাড়ছে।
এমওএস/কেএসআর