ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি ঠেকাতে একগুচ্ছ কঠোর সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে- আদালতের অনুমতি ছাড়া ঋণখেলাপিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবি প্রকাশের অনুমোদন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ।
Advertisement
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে বৈঠকের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে এই বিস্তারিত প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছে এবিবি। সংগঠনটির মতে, এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য খেলাপি ঋণ কমানো এবং নগদ অর্থ আদায় জোরদার করা।
এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের সই করা চিঠিতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে পাঁচ ধাপে প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
খেলাপি ঋণ কমাতে প্রস্তাব১. আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে খেলাপি ঋণের আংশিক অবলোপনের সুবিধা প্রদান।২. লিয়েন করা শেয়ার নগদায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা।৩. মৃত্যু, মরণব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহঋণ, ক্রেডিট কার্ড এবং একক মালিকানাধীন কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে হেড অব আইসিসির মতামত গ্রহণের শর্ত শিথিল করা।
Advertisement
নগদ অর্থ আদায়ে প্রস্তাব১. ব্যাংক বা আদালতের অনুমতি ছাড়া খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ।২. ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশের অনুমোদন দেওয়া।৩. খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের যে কোনো ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা।
আরও পড়ুনআগে এক লাখ টাকা ঘুস দিতে হতো, এখন লাগে ১০ লাখ: আজম জে চৌধুরী ‘নীরবে’ বাড়ানো হলো সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর
বন্ধকী সম্পদ বিক্রিতে প্রস্তাব১. ব্যাংকের নিলামে বিক্রিত বা ক্রয়কৃত সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সব ধরনের আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার।২. নিলাম ক্রেতাদের জন্য আয়কর রেয়াত বা অন্যান্য প্রণোদনা প্রদান।৩. স্থানভেদে নিলাম সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা বাতিল।৪. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরে সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত করা।৫. বন্ধকদাতার অনুপস্থিতিতে ব্যাংক কর্তৃক জমির খাজনা ও জরিপ সম্পন্নের সুযোগ প্রদান।৬. অর্থঋণ আদালত আইনের ৩৩(৭) ধারা অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে ব্যাংকের নামে হস্তান্তরিত জমির নামজারি ও বায়নানামা বিনা খরচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করা।
মামলার রায় কার্যকরে প্রস্তাব১. খেলাপি ঋণগ্রহীতা ও জামানতদাতাদের আমানত, সঞ্চয়পত্র, সম্পদ, আয়কর রিটার্ন, জন্ম-মৃত্যু সনদ ও পাসপোর্ট সংক্রান্ত তথ্য আদালতের অনুমতি ছাড়াই দ্রুত পাওয়ার ব্যবস্থা।২. ব্যাংক বা আদালতের যে কোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মামলা করতে নির্দিষ্ট অঙ্কের ডাউন পেমেন্ট বাধ্যতামূলক করা।৩. সিআইবি প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের স্টে-অর্ডার প্রদানের সুযোগ আইনগতভাবে বাতিল।৪. স্টে-অর্ডারের ক্ষেত্রে কিস্তিভিত্তিক উল্লেখযোগ্য অর্থ পরিশোধের শর্ত আরোপ এবং শর্ত ভঙ্গ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্টে বাতিল।৫. স্টে-অর্ডার দেওয়ার আগে উভয় পক্ষের শুনানি নিশ্চিত করা।৬. খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেশি এমন জেলাগুলোতে পৃথক অর্থঋণ আদালত স্থাপন।৭. থানায় জারিকৃত আটকাদেশ দ্রুত বাস্তবায়ন ও সাত দিনের মধ্যে আদালত থেকে থানায় পাঠানোর বাধ্যবাধকতা।৮. অর্থঋণ মামলায় ব্যক্তিগত হাজিরা ছাড়া মামলা পরিচালনার সুযোগ বাতিল।৯. দেওয়ানি আটকাদেশের মেয়াদ ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী ছয় মাস থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ সাত বছর করা।১০. দ্রুত সময়ের মধ্যে অর্থঋণ আইনের প্রস্তাবিত সংশোধন চূড়ান্ত করা।
Advertisement
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ঠেকাতে প্রস্তাব১. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারীদের তালিকা প্রকাশ।২. নিবন্ধক বা তহবিল অফিসে বন্ধকী সম্পদের তথ্য সহজে যাচাইয়ের ব্যবস্থা।৩. সিআইবি ডেটাবেজের আদলে ব্যক্তিগত সম্পদের কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরি ও যাচাই সুবিধা চালু।
খেলাপি ঋণের বর্তমান চিত্রব্যাংক খাত সূত্র জানায়, দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখন খেলাপি। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট ঋণ বিতরণ ছিল ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা খেলাপি।
ব্যাংকারদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর প্রবণতা থাকলেও বর্তমানে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। সামনে খেলাপি ঋণের হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইএআর/কেএসআর