যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে অবস্থিত ব্রিটিশ মিউজিয়াম বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন, বৃহৎ ও সমৃদ্ধ জাদুঘর হিসেবে সুপরিচিত। ১৭৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জ্ঞানভান্ডারের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে।
Advertisement
বর্তমানে মিউজিয়ামটিতে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের মূল দর্শন হলো-জ্ঞান ও ইতিহাসকে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা। সেই দর্শনের প্রতিফলন হিসেবে জাদুঘরটিতে প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। গবেষণা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে ব্রিটিশ মিউজিয়াম আজ বিশ্বব্যাপী বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে।
এই মিউজিয়ামের সবচেয়ে আলোচিত ও জনপ্রিয় সংগ্রহগুলোর মধ্যে রয়েছে রোসেটা পাথর, যা প্রাচীন মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক লিপি পাঠোদ্ধারে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে; গ্রিক সভ্যতার অনন্য নিদর্শন পারথেনন ভাস্কর্য বা এলগিন মার্বেল; ইউরোপের বৃহত্তম ছাদবদ্ধ প্রাঙ্গণ গ্রেট কোর্ট; এবং ইতিহাসখ্যাত ম্যাগনা কার্টার একটি বিরল কপি। এ ছাড়াও প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্য, গ্রিক, রোমান ও ইসলামি সভ্যতার অমূল্য নিদর্শনে সমৃদ্ধ এই জাদুঘর।
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বাংলাদেশের জন্য আলাদা কোনো গ্যালারি না থাকলেও দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারতীয় উপমহাদেশের গ্যালারিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্মারক স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী দৃষ্টির একটি আলোকচিত্র এবং ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের তিনটি স্মারক ডাকটিকিট। পাশাপাশি সংরক্ষিত রয়েছে মহীশূরের বীর শাসক টিপু সুলতানের তলোয়ার ও আংটি।
Advertisement
ভারতীয় উপমহাদেশের গ্যালারিটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত। এখানে প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা থেকে শুরু করে মধ্যযুগ ও ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই গ্যালারিতে সিন্ধু সভ্যতার (হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো) সিলমোহর, মৃৎপাত্র ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী উপমহাদেশে নগরায়ণ, বাণিজ্য এবং পরিকল্পিত সমাজব্যবস্থার প্রাচীন সাক্ষ্য বহন করে।
প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৬০ লাখেরও বেশি দর্শনার্থী ব্রিটিশ মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন। দুটি বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যতীত জাদুঘরটি কখনোই দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকেনি। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গবেষণার এক অনন্য মিলনস্থল হিসেবে ব্রিটিশ মিউজিয়াম আজও বিশ্ববাসীর আগ্রহ ও কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।
যদিও ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বাংলাদেশকে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে আলাদাভাবে উপস্থাপন করা হয়নি, তবুও প্রাচীন বাংলা, মধ্যযুগীয় বঙ্গ ও ঔপনিবেশিক বাংলার ইতিহাস-সম্পৃক্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে। মুদ্রা, পাণ্ডুলিপি, বৌদ্ধ শিল্পকর্ম ও মানচিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূখণ্ড, সভ্যতা ও সংস্কৃতি আজও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই জাদুঘরে প্রতিনিধিত্ব করে চলেছে।
এমআরএম/এমএস
Advertisement