ফিচার

কম খরচে বিয়ে: যেখানে ভালোবাসাই একমাত্র আয়োজন

বিয়ে মানেই বিশাল আয়োজন-হল বুকিং, দামি পোশাক, শত শত অতিথি, জমকালো খাবার আর মোটা অঙ্কের খরচ। পৃথিবীর অনেক দেশে বিয়ে এখন যেন সামাজিক প্রতিযোগিতা। কে কত বড় আয়োজন করল, কে কত খরচ করল সেই হিসাবেই যেন বিয়ের সাফল্য মাপা হয়। কিন্তু এই প্রচলিত ধারণার বাইরেও এক ভিন্ন বাস্তবতা আছে।

Advertisement

তবে বিশ্বের নানা প্রান্তে এমন সব বিয়ের রীতি ও দর্শন রয়েছে, যেখানে বিয়েতে খরচ বলতে প্রায় কিছুই নেই। ভালোবাসা, সম্মতি আর সামাজিক স্বীকৃতিই সেখানে প্রধান, অর্থ নয়। চলুন এমন কয়েকটি দেশের বিয়ে সম্পর্কে আজ জেনে আসি-

জাপান: কাগজে-কলমে সম্পর্ক, আয়োজন ছাড়াই বিয়েবিশ্বের সবচেয়ে কম খরচের বিয়ের উদাহরণগুলোর একটি পাওয়া যায় জাপানে। সেখানে অনেক দম্পতি কোনো আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান ছাড়াই বিয়ে সেরে ফেলেন। স্থানীয় প্রশাসনের দপ্তরে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেই আইনিভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া যায়। নেই আলাদা পোশাক, নেই অতিথি আপ্যায়ন, নেই হল ভাড়া। জাপানে একে বলা হয় ‘পেপার ম্যারেজ’। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে অনেক তরুণ এই পদ্ধতিই বেছে নিচ্ছেন। এতে বিয়ের খরচ নেমে আসে প্রায় শূন্যে। অনেক ক্ষেত্রে কেবল নথিভুক্তির সামান্য ফি দিতে হয়।

ভারত: আর্য সমাজের সহজ বিয়েভারতে খরচবিহীন বিয়ের একটি জনপ্রিয় উদাহরণ হলো আর্য সমাজের বিয়ে। এখানে কোনো জাঁকজমক নেই, নেই দামি পোশাক বা বিশাল আয়োজন। নির্দিষ্ট মন্ত্র পাঠ, অগ্নিকে সাক্ষী রেখে বর-কনের সম্মতিতেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। এই ধরনের বিয়েতে সাধারণত খরচ পড়ে না বললেই চলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামান্য অনুদান বা রেজিস্ট্রেশনের ফি দিতে হয়। বহু মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষই এই পদ্ধতিকে বেছে নেন, যাতে সামাজিক চাপ ছাড়াই সংসার শুরু করা যায়।

Advertisement

ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া: কমিউনিটি-নির্ভর বিয়েফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিয়ে এখনো পুরোপুরি কমিউনিটি-কেন্দ্রিক। এখানে বিয়েতে কোনো পেশাদার আয়োজনকারী নেই। প্রতিবেশীরাই রান্না করেন, ঘর সাজান, অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। বর-কনের জন্য আলাদা করে খরচ করার প্রয়োজন পড়ে না। অতিথিরাও উপহার নয়, সহযোগিতা নিয়ে আসেন। এই ব্যবস্থায় বিয়ে হয়ে ওঠে সামাজিক বন্ধনের উৎসব, আর খরচ নেমে আসে প্রায় শূন্যে।

আফ্রিকার কিছু আদিবাসী সমাজ: বিনিময়ের বিয়েআফ্রিকার বিভিন্ন আদিবাসী সমাজে বিয়ে এখনো আধুনিক অর্থনীতির বাইরে। এখানে বিয়েতে অর্থের বদলে প্রতীকী বিনিময় হয় কখনো গবাদিপশু, কখনো শস্য বা হাতে তৈরি কোনো জিনিস। অনেক ক্ষেত্রেই সেটিও আনুষ্ঠানিক নয়, বরং পারিবারিক সম্মতির মাধ্যমে সম্পর্ক স্থায়ী হয়। এই বিয়েগুলোতে নেই কোনো নগদ লেনদেন, নেই আনুষ্ঠানিক আয়োজন। তাই এগুলোকে বিশ্বের সবচেয়ে খরচবিহীন বিয়ের তালিকায় রাখা হয়।

ইউরোপে মিনিমাল ম্যারেজ ট্রেন্ডইউরোপের অনেক দেশে সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘মিনিমাল ম্যারেজ’। এখানে দম্পতিরা ইচ্ছাকৃতভাবে সব ধরনের আয়োজন এড়িয়ে যান। ছোট পরিসরে, কখনো শুধু দুজন সাক্ষী নিয়ে সিটি হলে গিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়। কোনো রিসেপশন নয়, কোনো দামি পোশাক নয়। অনেক দম্পতি বিয়ের খরচ বাঁচিয়ে সেই অর্থ ভ্রমণ, বাসস্থান বা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগে ব্যবহার করেন। ফলে বিয়েটি হয়ে ওঠে আর্থিক চাপমুক্ত।

বিশ্বের সবচেয়ে খরচবিহীন বিয়েগুলোর মূল দর্শন একটাই বিয়ে মানে প্রদর্শনী নয়, এটি একটি পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি। এই বিয়েগুলোতে সমাজের চাপ, লোক দেখানো আয়োজন বা আর্থিক প্রতিযোগিতা নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, খরচবিহীন বিয়েতে দম্পতিরা সম্পর্কের মূল বিষয়ের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। সংসার শুরুর আগেই ঋণ বা আর্থিক দুশ্চিন্তা তাদের পিছু নেয় না।

Advertisement

বিশ্বজুড়ে যখন বিয়ের খরচ আকাশছোঁয়া, তখন খরচবিহীন বিয়ের ধারণা নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। অনেক তরুণ-তরুণী এখন প্রশ্ন তুলছেন একদিনের অনুষ্ঠানের জন্য এত খরচ কি সত্যিই প্রয়োজন? এই প্রশ্ন থেকেই ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে বিয়ের সংজ্ঞা। খরচ কমিয়ে, আয়োজন সরল করে সম্পর্কের গভীরতাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

আরও পড়ুনবিয়ে এত সহজ নয়, কাঠ কেটে বর-কনেকে দিতে হয় পরীক্ষামৃত ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে: সংস্কৃতি থেকে আধুনিক আইন

সূত্র: বিবিসি ট্রাভেল, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, দ্য নিউইয়ার্ক টাইম

কেএসকে