প্রবাস

বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে এআই ড্রোন ব্যবহার করুন

বাংলাদেশের সামনে আর সময় নেই। নির্বাচন যত এগোচ্ছে, তত স্পষ্ট হচ্ছে যে প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিয়ে ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সরকার এরই মধ্যে সিসি ক্যামেরা ও দেহে ধারণযোগ্য ক্যামেরা ব্যবহারে প্রস্তুত রয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, স্থির ক্যামেরা বা ব্যক্তিনির্ভর বডি ক্যামেরা দিয়ে ব্যালট বাক্সের সার্বিক নিরাপত্তা, ভোটকেন্দ্র ঘিরে শক্তি প্রদর্শন, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কিংবা সংগঠিত জালিয়াতি ঠেকানো যায় না। বাংলাদেশের মতো দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে আক্রান্ত একটি দেশে, এআই ড্রোনের কোনো বাস্তব বিকল্প নেই।

Advertisement

প্রশ্ন উঠবে, এত অল্প সময়ে কীভাবে এআই ড্রোন সংগ্রহ ও ব্যবহার সম্ভব। উত্তর হলো, এটি কোনো অসম্ভব বা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প নয়। বিশ্বের বহু দেশ এরই মধ্যে নির্বাচন, জননিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বেসামরিক এআই ড্রোন ব্যবহার করছে। রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্র সহযোগিতার মাধ্যমে সীমিত পরিসরে ড্রোন ও সফটওয়্যার লিজ বা অস্থায়ী ব্যবহারের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এখানে লক্ষ্য পূর্ণাঙ্গ সামরিক সক্ষমতা নয়, বরং নির্বাচনকালীন পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা।

অর্থনৈতিক ব্যয়ের প্রশ্নটি ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরঞ্জিত করা হয়। বাস্তবে, নির্বাচনকালীন পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় এআই ড্রোন ব্যবস্থার খরচ একটি জাতীয় নির্বাচনের মোট ব্যয়ের তুলনায় নগণ্য। সীমিত সংখ্যক উচ্চমানের নজরদারি ড্রোন, নিয়ন্ত্রণ সফটওয়্যার, ডেটা সংরক্ষণ এবং প্রশিক্ষণসহ প্রাথমিক ব্যয় আনুমানিক কয়েকশ কোটি টাকার মধ্যেই রাখা সম্ভব। একটি নির্বাচন বিতর্কিত হলে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তার তুলনায় এই ব্যয় অত্যন্ত সামান্য।

দক্ষ টেকনিশিয়ান পাওয়ার প্রশ্নটিও অজুহাত হতে পারে না। বাংলাদেশে এরই মধ্যে ড্রোন প্রযুক্তি, জিআইএস, ভিডিও অ্যানালিটিক্স ও আইটি সিকিউরিটিতে প্রশিক্ষিত একটি বড় জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের সঙ্গে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও তত্ত্বাবধান যুক্ত করলেই নির্বাচনকালীন ব্যবস্থাপনা চালানো সম্ভব। এখানে মূল শর্ত হলো, প্রযুক্তিবিদরা যেন কোনো মন্ত্রণালয় বা রাজনৈতিক শক্তির সরাসরি নিয়ন্ত্রণে না থাকেন। তাদের কাজ হবে পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রদান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ নয়।

Advertisement

সরকারের বর্তমান ক্যামেরা ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর অবস্থান ও নিয়ন্ত্রণ। সিসি ক্যামেরা স্থির, সীমাবদ্ধ পরিসরের এবং অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসনের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। বডি ক্যামেরা আবার ব্যক্তিনির্ভর। কে কখন ক্যামেরা চালু রাখবে, কোন অংশ দেখাবে, কোন অংশ দেখাবে না, তার ওপর কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এআই ড্রোন এই সমস্যার সমাধান করে, কারণ এটি পুরো এলাকার চিত্র তুলে ধরে এবং কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের হাতে নিয়ন্ত্রণ সীমাবদ্ধ থাকে না।

ব্যালট বাক্স সুরক্ষা এবং ভোট গণনা বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। ব্যালট বাক্স কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার পর কী ঘটে, কোথায় যায়, কে ঘিরে থাকে, এসব প্রশ্নের উত্তর আজও অস্বচ্ছ। এআই ড্রোন চলমান নজরদারির মাধ্যমে এই পুরো প্রক্রিয়াকে দৃশ্যমান করতে পারে। কোথাও অস্বাভাবিক থামা, জনসমাগম বা দিক পরিবর্তন হলে তাৎক্ষণিকভাবে নথিবদ্ধ হয়। এতে জালিয়াতির সুযোগ নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এআই ড্রোন ক্ষমতাসীনদের জন্যও অস্বস্তিকর। কারণ এটি শুধু বিরোধী দল নয়, প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীকেও নজরদারির আওতায় আনে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটিই প্রযুক্তিটির সবচেয়ে বড় শক্তি। এখানে কেউ আর বলতে পারবে না, আমরা জানতাম না, আমরা দেখিনি।

এই ব্যবস্থার একটি কঠোর শর্ত থাকতে হবে। নির্বাচনকালীন নির্দিষ্ট সময় ছাড়া এআই ড্রোন ব্যবহার করা যাবে না। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা যাবে না। মুখ শনাক্তকরণ বা ব্যক্তিগত পরিচয় বিশ্লেষণ নিষিদ্ধ থাকতে হবে। সব ডেটা নির্বাচন কমিশনের অধীনে এবং স্বাধীন তদারকি কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে। নচেৎ এই প্রযুক্তি গণতন্ত্র রক্ষার বদলে ভয়ের যন্ত্রে পরিণত হবে।

Advertisement

বাংলাদেশের সমস্যা প্রযুক্তির অভাব নয়, সমস্যা বিশ্বাসের অভাব। এআই ড্রোন সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার একটি বাস্তব সুযোগ। এটি নিখুঁত সমাধান নয়, কিন্তু এটি ক্ষমতাকে জনগণের চোখের সামনে আনার একটি কার্যকর হাতিয়ার।

আজ প্রশ্ন একটাই। আমরা কি আবার এমন একটি নির্বাচন দেখতে চাই, যার ফল নিয়ে দেশ বিভক্ত থাকবে। নাকি আমরা অন্তত একটি নির্বাচনে বলতে চাই, রাষ্ট্র নিজেই বলেছে, আমাদের লোকানোর কিছু নেই।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com

এমআরএম