খেলাধুলা

মিস্টার বুলবুল, জাগো নিউজ কখনই সীমা ছাড়িয়ে কারো বিরুদ্ধে লিখে না

‘বাবু ভাই আমাকে অনেক ড্যামেজ করেছেন। তার মিডিয়া হাউজে ইন্টারভিউ দেব না।’

Advertisement

আজ সকালবেলা সহকর্মী জুনিয়র রিপোর্টারের মুখে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের এ কথাটি শুনেই মনটা বিষাদে ভরে গেল। আর বারবার প্রশ্ন জাগল, আমি বা জাগোনিউজ আবার তাকে কখন ড্যামেজ করলো?

আমি তো জাগো নিউজে কাজ করি। আমি জানি, জাগো নিউজ কখনই কারও নগ্ন বিরোধিতা করে না। অনলাইন ও ইউটিউবের অনেক হাউজের পরিমিতবোধ কম থাকলেও জাগো নিউজ কখনই সীমা ছাড়িয়ে যায় না। ৯ বছর ধরে কাজ করছি এই নিউজ পোর্টালে, কখনো দেখিনি জাগো নিউজে কোনো রগরগে কিছু প্রকাশিত হতে। যে লেখাগুলো জাগো নিউজে প্রকাশ হয়, তার অথেনটিসিটি থাকে।

আষাঢ়ে গল্প, গাঁজাখুরি কাহিনী কখনই জাগো নিউজে প্রকাশিত হয় না। আমি যদি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে আক্রমণ করে কিছু লিখি, তা কখনোই প্রকাশিত হবে না।

Advertisement

সবচেয়ে বড় কথা, ব্যক্তি জীবনে বিশেষ করে কথাবার্তায় কখনো-সখনো রূঢ় হলেও ক্রীড়া সাংবাদিক, ক্রিকেট ও ক্রীড়া লেখক হিসেবে আমি কখনই রুক্ষ ন‌ই, যথেষ্ট সংযত, পরিণত, পরিমিত এবং শতভাগ পেশাদার।

ভাষার প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমরা বরাবরই অনেক বেশি সতর্ক থাকি। একটা লেখার ভাষা, গাঁথুনি কেমন হওয়া উচিত, কোনো লেখার অর্থ কী দাঁড়াবে? কারও ব্যক্তি জীবন, সামাজিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিনা- তা আমরা খুব খুঁটিয়ে দেখে তারপর লিখি। আমরা কখনোই যা খুশি তা লিখি না। আমাদের লেখার ভাষা সব সময় পরিশীলিত। কারও বিপক্ষে কিছু লেখার আগে তার গুণটার কথাও মাথায় রাখি।

এজন্য পাঠক দেখবেন, আমাদের লেখায় ঢালাও সমালোচনা থাকে না। একটি নির্দিষ্ট ইস্যুর বাইরে যাওয়া হয় না। কারও কথা, কাজকর্মের বিরোধিতা ও সমালোচনা করতে গেলেও তার আগে তার ভালো গুণ ও কাজের প্রশংসা করতে ভুলে না জাগোনিউজ।

ব্যক্তিগতভাবে এসব কারণে আমার লেখায় অনেক চুলচেরা বিশ্লেষণ থাকে। এমনকি টিভি আর ইউটিউব লাইভ বা টক শোতেও মেপে সংযত হয়ে কথা বলার চেষ্টা করি। আমার মুখের কথা ও লেখায় কারও ব্যক্তিজীবন, কর্মজীবন, সংসার ও সামাজিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হোক- ইউজুয়ালি আমি এবং জাগোনিউজ তা করে না।

Advertisement

এক কথায়, আমার কথাবার্তা ও আচরণে কখনো কখনো বাড়তি আবেগ, উত্তেজনা ও রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ পেলেও, লেখায় সে অর্থে উত্তেজনা থাকেই না। অযথা তো নয়ই, কারও বড় ধরনের দোষত্রুটি পেলেও তার খুব বড় সমালোচনা করি না। যতটুকু না করলে নয়, তাই করি। তাও ভাষা ব্যবহারে আপ্রাণ চেষ্টা থাকে সংযত থাকার। অযথা খোঁচাখুঁচি থাকে না। কাউকে হেয়-প্রতিপন্ন করা, অযথা বা উটকো সমালোচনা করা এবং এক কথায় বা লেখায় কারও নেগেটিভ সমালোচনা করে তার ক্যারিয়ার, ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনের ক্ষতি করে দেওয়ার কাজটা আমাদের দ্বারা হয় না। আমি ওভাবে লিখি না।

অযথা কারও পেছনে লেগে থাকা কিংবা খুব বেশি সমালোচনা করি না বলেই হয়তো আমার লেখার প্রতিবাদ হয় না। আমার নিজের ৩৪ বছরের বেশি বছরের ক্রীড়া সাংবাদিক জীবনে হাতে গোনা দু-একটি ঘটনা হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু সেগুলো অনানুষ্ঠানিক। আমার লেখার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ আসেনি কখনো।

ক্যারিয়ারের প্রথম ২০ বছর কেটেছে জনকণ্ঠে। জনকণ্ঠে থাকা অবস্থায় ২০০৫ সালে ৬ মাসের জন্য সমকালে গিয়েছিলাম। আবার ফিরে এসে ২০১০-এর শেষ পর্যন্ত জনকণ্ঠেই কাজ করেছি। এরপর সকালের খবরে প্রায় ৫ বছর এবং জাগো নিউজে প্রায় ৯ বছর কাটিয়ে দিলাম। শত শত বাইলাইন স্টোরি আমার।

অথচ, এবার সেই তকমাটা গায়ে লেগে গেল। একজন নামী ও বরেণ্য ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব দিলেন আমাকে একটা নতুন তকমা।

আমি নাকি তার অনেক ক্ষতি করেছি। ভাবটা এমন যে, মিডিয়ার সবাই তার প্রশংসায় ছিল ধন্য, তার গুণকীর্তনে ব্যস্ত ছিল, আমি শুধুই তার সমালোচনা করেছি। এবং খুঁজে খুঁজে এমন রিপোর্ট করেছি, যা তার অনেক ক্ষতি করেছে। তার ভাষায়, বাবু ভাই আমার জন্য বিগ ড্যামেজড। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাবু ভাইয়ের সঙ্গে তো নয়ই, বাবু ভাইয়ের মিডিয়া হাউজের সঙ্গে কোনো রকম আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা বলবেন না।

আমার জুনিয়র কলিগ বুলবুলকে মুঠোফোন আলাপে যখন আমাদের মিডিয়া হাউজ জাগো নিউজের পক্ষ থেকে তার একটা ইন্টারভিউ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তখনই তিনি এমন মন্তব্য করেন।

তার দাবি, আমি তার অনেক ক্ষতি করেছি? কিন্তু অনেক ভেবে-চিন্তে দেখলাম, আমি তার কোনো ক্ষতি করেছি বলে মনে করতে পারলাম না।

বরং বার কয়েক তার ভাষ্য ছাপিয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছি। আর তিনি বিসিবি সভাপতি হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়া যাওয়া নিয়ে যত তীর্যক কথাবার্তা, সমালোচনা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ হয়েছে, বেশিরভাগ সময় আমিই জাগোনিউজে তাকে নিয়ে যেচে রিপোর্ট করে তার ইমেজ ক্ষুণ্ন হওয়া বন্ধ রাখতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছি। তাকে বিপাকে ফেলা, অযথা সমালোচনা করে তাকে ছোট করার কাজটি আমার দ্বারা হয়নি।

হ্যাঁ, তার অস্ট্রেলিয়া যাওয়া নিয়ে যতবার কথা উঠেছে, নানা গুঞ্জনে আশপাশ ছেয়ে গেছে, প্রতিবার আমিই সে উদ্ভূত পরিস্থিতির ইতিবাচক মোকাবিলায় তাকে সহায়তা করার চেষ্টা করেছি। বলতে পারি, তাকে বড় ধরনের বিতর্কে জড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করেছি।

এর মধ্যে তিনি আমার সঙ্গে গত ২ মাসের বেশি সময় ধরে কথা বলেন না। এ দীর্ঘ সময়ে আমার দেওয়া অন্তত ১৫-১৭টি হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ ‘সিন’ করেও তিনি জবাব দেননি। ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছি তিন-চারটি। একটারও জবাব আসেনি। অথচ প্রতিবার তিনি তা দেখেছেন। রিপ্লাই দেননি। আমি তার ওই আচরণে মোটেই অবাক হইনি। এর আগে তিনি আমাকে প্রায় ২ বছর ব্লক করে রেখেছিলেন। একটা মিথ্যা অজুহাত দিয়ে।

তবে তার অস্ট্রেলিয়া যাওয়া আর আসা নিয়ে যত নাটকীয় ঘটনার উদ্ভব ঘটেছে, তখন যতটা সম্ভব পজিটিভ নিউজ করেছি। হ্যাঁ, এটা সত্য, রোজার ছুটির আগে তার অস্ট্রেলিয়া যাওয়া নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। তখন আমিও কিছু নিউজ করেছি। তিনি যে বিসিবির কাউকে বলে যান না, শেষবারও যাননি। সিইও, এমনকি সহ-সভাপতি—কার কী কাজ, তাও ঠিক করে দেননি। এসব নিয়ে সমালোচনাধর্মী নিউজ করেছি। কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া নিয়ে আমিই শেষবার বিসিবি সিইওর সঙ্গে কথা বলে অথেনটিক নিউজ করেছি।

তারপর এক সময় যখন কথা উঠল, তিনি আর আসবেন না দেশে—তখনও আমি সবার আগে বিসিবি সিইওর সঙ্গে কথা বলে লিখেছি যে, তিনি ঈদের ছুটির পর আসবেন ২৬ মার্চ। এর পরও তার দেশে ফেরা নিয়ে সংশয় দেখা দিল, তখন ঈদের পরপরই বিসিবির একাধিক কর্তার বক্তব্য দিয়ে নিউজ করি—বিসিবি সভাপতি আসবেন ২৮ মার্চ। সেটিই সত্য হয়েছে। বিসিবি সভাপতি হিসেবে বুলবুলের সেটিই ছিল শেষবারের মতো দেশে ফেরা। শেষ খবর, গতকাল রাতে আবার অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছেন বুলবুল।

এসব প্রতিবেদনের বাইরে আর একটি নিউজ আমি করেছি যে, এই বোর্ড থাকবে না। আমিনুল ইসলাম বুলবুলও হয়তো আর বোর্ড সভাপতি থাকবেন না। তার বদলে সম্ভবত তামিম ইকবালই হবেন বোর্ড প্রধান। শেষ পর্যন্ত হয়েছেও তাই।

এর মধ্যে ড্যামেজড করার কী হলো? বুঝলাম না। অথচ আমি কোনো রেফারেন্স দিয়ে বলব না- অনেক নেগেটিভ নিউজ করার পরও তিনি একাধিক মিডিয়া হাউজকে ইন্টারভিউ দিয়েছেন। আমাকে দেননি।

তিনি বোর্ড সভাপতি হিসেবে দেশে আসার পর বার চারেক তাকে জাগো নিউজের লাইভ টক শোতে যেতে অনুরোধ করেছি। আমন্ত্রণ জানিয়েছি। আমি হলফ করে বলতে পারি, আমার মুখের সামনে তিনি সেটা অস্বীকার করতে পারবেন না। প্রতিবার বলেছেন যাবেন, দিন-তারিখ দিয়েও যাননি। আপনি জাগো লাইভে অ্যাটেন্ড না করায় অফিস ম্যানেজমেন্টের কাছে আমি ছোট হচ্ছি—এমন বলার পরও আমার সে অনুরোধ রক্ষা করেননি তিনি।

আমি কারও সঙ্গে তুলনায় যেতে চাই না। অন্য মিডিয়া হাউজকে খাটো করে বলছি না। জাগো লাইভের তুলনায় অনেক কমজোরি ও অখ্যাত টিভি চ্যানেল আর ইউটিউবেও একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। কিন্তু জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেননি। উল্টো শেষ মুহূর্তে বিসিবি সভাপতির চেয়ার থেকে সরে গিয়ে বলে বসলেন- আমি নাকি তার অনেক ক্ষতি করেছি। তাই আমার হাউজের সঙ্গে তিনি আর কথা বলবেন না।

এটা কেমন ভদ্রতা? কেমন শিষ্টাচার? আমি বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাই।

আমিতো আর এই প্রজন্মের সাংবাদিক নই যে ইতিহাস পড়ে আর পরিসংখ্যান ঘেঁটে মূল্যায়ন করব। আমার চোখের সামনে তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটের বড় তারকা হয়েছেন। তার সম্পর্কে কোনো তথ্য-উপাত্ত না নিয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলতে পারব অবলীলায়। তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম কারেক্ট ব্যাটসম্যান। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার আগে তিন পাণ্ডবের একজন।

ঢাকা লিগ ও জাতীয় দলের সফল ব্যাটারদের অন্যতম। প্লেয়ার হিসেবে তাকে আমি অনেক উঁচুতে রাখি।আমার চোখে তিনি শুধুই বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান আর প্রথম বিশ্বকাপ ক্যাপ্টেন নন, দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সব সময়ের এক বড় তারা।

তাকে ছোট করার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই। আর আমি তা করবই বা কেন? আমার তো সে এখতিয়ার নেই। আমি যে কথাগুলো লিখলাম, সেটাও হয়তো কোনোদিন লিখতাম না। এর আগে তিনি যে অনেকের সঙ্গে আমাকেও ২ বছর ব্লক করে রেখেছিলেন, তখন তো একটি লাইনও লিখিনি। বরং তিনি বোর্ড সভাপতি হওয়ার পর সোনারগাঁও প্যান প্যাসিফিকে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বন্ধুর দাবি নিয়ে বলেছিলাম—কারও কোনো রিপোর্ট পছন্দ না হলে তাকে আনফ্রেন্ড করেন, ব্লক করেন না দয়া করে। তিনি সেদিন কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু হায়! আমার সঙ্গেই তিনি শেষ ২ মাস কথা বলেননি।

কারণ, জানলাম আমি তার অনেক ক্ষতি করেছি। বলতে দ্বিধা নেই, তামিম ইকবালের নেতৃত্বে বিএনপি পন্থীদের একটি বড় অংশ নির্বাচন বয়কট করার আমি যতটা সম্ভব নির্মোহ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছিসময়ও। যার কোনো কোনো লেখা বা লেখার অংশ কিংবা টক শোর কোনো কোনো ব্যাখ্যা তামিমদের বিপক্ষে গেছে, তার পক্ষে গেছে। কিন্তু তখন তিনি কোনো প্রশংসা করেননি। এখন যেই লেখা তার বিপক্ষে গেছে—তিনি কাউকে না বলে দায়িত্ব বণ্টন না করে অস্ট্রেলিয়া চলে যান—এসব লিখেছি, তখন আমি হয়ে গেলাম প্রতিপক্ষ। তখন আমার লেখা ক্ষতির কারণ হয়েছে।

এটা কোনো কথা হলো? কারও লেখা আপনার বিপক্ষে গেলেই তার বিরোধিতা করবেন? তাকে দোষী সাব্যস্ত করবেন? এটা কেমন ভদ্রতা? এটা কি শিষ্টাচার?

এআরবি/এমএমআর