আইন-আদালত

২৫ বছরেও শেষ হয়নি পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলার বিচার

বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ উদযাপন শুরু করেছে বাংলা ভাষাভাষির মানুষ। পহেলা বৈশাখের এই উৎসবে মেতে উঠেছে সবাই। প্রতিবছর ধুমধাম করে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হলেও রমনার বটমূলে বোমা হামলার ঘটনার কথা ভুলতে পারেন না কেউই। ২০০১ সালের সেই হামলায় ১০ জন নিহত হওয়ার মামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি ২৫ বছরেও।

Advertisement

পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণ

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ ১৪০৮ বঙ্গাব্দ) খুব সকাল থেকেই রমনা পার্কের বটমূলে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানস্থলে দুটি বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল সেদিন। পরে রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে সেগুলোর বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বর্ষবরণের অনুষ্ঠান চলাকালে সকাল ৮টা ৫ মিনিটে একটি ও ১০টা ১৫ মিনিটের পর অন্য বোমাটি বিস্ফোরিত হয়। বিকট শব্দে দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করতে থাকে সাধারণ মানুষ। এ ঘটনায় সেদিন নিহত হন ৯ জন। আহত অনেককে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আরও একজন মারা যান। এই হামলার ঘটনা বাংলা সংস্কৃতির জন্য বড় আঘাত বলে মনে করেন অনেকে। সেই ঘটনার পর সব সরকারই পহেলা বৈশাখ উদযাপনে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে আসছে।

নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নৃশংস ওই বোমা হামলা চালায় বলে পরে জানা যায়। এ ঘটনায় হুজি নেতা মুফতি হান্নানসহ ১৪ জনকে আসামি করে ওইদিনই রমনা থানার পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি মামলা করে।

পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান ঘিরে রমনা বটমূলে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ছবি: জাগো নিউজ

Advertisement

মামলা এখনো বিচারাধীন

২৫ বছর আগে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার এ ঘটনায় হত্যা মামলায় রায়ের ১০ বছর পর দ্বিতীয় ধাপে মামলাটির রায় হাইকোর্টে ঘোষণা হয়। যদিও হাইকোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এখনো প্রকাশ পায়নি। এরমধ্যে মামলার কয়েকজন আসামি জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, একই ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা অপর মামলাটিতে অধস্তন আদালতে বিচার ২৫ বছরেও শেষ হয়নি। সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে নিম্ন আদালতে। আসামিপক্ষের আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতার হয়ে দুজন আসামি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।  

বোমা হামলার ঘটনায় হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ১৪ জনকে আসামি করে রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা করে পুলিশ।

আরও পড়ুনবর্ষবরণে প্রস্তুত ঢাবি, বৈশাখী শোভাযাত্রা হবে অনন্যপহেলা বৈশাখ ঘিরে কর্মব্যস্ত কুমারপাড়ানিরাপদে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে সিএমপি

Advertisement

আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রমনা বটমূলে বোমা হামলার ঘটনায় করা হত্যা মামলার ১৩ বছরের মাথায় মুফতি হান্নানসহ আটজনের মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে ২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা রুহুল আমিন রায় ঘোষণা করেন। বিচারিক আদালতের রায়ে মুফতি হান্নান ছাড়া মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অপর ব্যক্তিরা হলেন আকবর হোসেন, আরিফ হাসান ওরফে সুমন, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মো. তাজউদ্দিন, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বদর, আবু বকর ওরফে সেলিম হাওলাদার, আবদুল হাই ও শফিকুর রহমান।

২০০৪ সালে সিলেটে গ্রেনেড হামলা মামলায় মুফতি হান্নানের মৃত্যুদণ্ড ২০১৭ সালে কার্যকর হয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে তাজউদ্দিন, জাহাঙ্গীর ও আবদুল হাই পলাতক। বিচারিক আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত ছয় ব্যক্তি হলেন শাহাদাত উল্লা ওরফে জুয়েল, সাব্বির, শেখ ফরিদ, আবদুর রউফ, ইয়াহিয়া ও আবু তাহের।

বিচারিক আদালতের এই রায়ের পর আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য রায়সহ নথিপত্র নিয়ম অনুযায়ী হাইকোর্টে আসে, যা ডেথ রেফারেন্স মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়।এরপর হাইকোর্টে মামলা শুনানির পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত) তৈরি করা হয়। অন্যদিকে, কারাগারে থাকা আসামিরা পৃথক জেল আপিল আবেদন করেন।

পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান ঘিরে রমনা পার্কে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ছবি: জাগো নিউজ

ওই আপিলের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামির সাজা কমে। এই সাত আসামির মধ্যে একজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি ছয়জনকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরিন আক্তারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় দেন। আসামিদের ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেন।

সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী হত্যা মামলার রায় অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল রাতে মুফতি হান্নানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ফলে রমনা বটমূলের বিস্ফোরক আইনের মামলা থেকে তার নাম বাদ যায়। এ মামলার বাকি আসামিরা হলেন মাওলানা তাজউদ্দিন, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান, মাওলানা আবু বকর, হাফেজ সেলিম হাওলাদার, আরিফ হাসান সুমন, মাওলানা আকবর হোসাইন, মাওলানা শাহাদাৎ উল্লাহ জুয়েল, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা সাব্বির ও মাওলানা শওকত ওসমান। তাদের মধ্যে তাজউদ্দিন, আবদুল হাই ও জাহাঙ্গীর পলাতক।

আরও পড়ুনকেটে গেছে দুই যুগ, রায় যে কোনো সময়বিগত সরকারের আমলে ৪৩০ বার কজলিস্টে এসেও হয়নি আপিল শুনানিরমনায় বোমা হামলা : একজনের ফাঁসি কার্যকর, ৩ জন জেলে বাকিরা পলাতক

বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মো. তাজউদ্দিনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বিচারিক আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন দণ্ডিত ছয় আসামির মধ্যে শাহাদাতউল্লাহ জুয়েলের দণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। যাবজ্জীবন দণ্ডিত অপর তিন আসামির সাজা কমিয়ে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর দুই আসামি মারা যাওয়ায় তাদের আপিল পরিসমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।

দীর্ঘ ২৫ বছরের রমনা বটমূলে ভয়াবহ হত্যা মামলা পুরোপুরি নিষ্পত্তি না হওয়ার বিষয়ে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট আব্দুল জব্বার ভূঁইয়া জাগো নিউজকে বলেন, রমনা বটমূলে বোমা হামলার মর্মান্তিক এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছিল। এর একটি হত্যা মামলা হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের করা জেল আপিলের রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এখনো রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ পায়নি। তবে, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পেলে আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আসামিদের শাস্তি বাড়ানো আর্জিতে আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে। সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দিকে যাবে।  

আরও পড়ুনবর্ষবরণে দুবছর পর রমনা বটমূলে সাধারণ মানুষমুফতি হান্নান ও বিপুলের ফাঁসি কার্যকরজঙ্গিবাদের এক কালো অধ্যায়ের অবসান

তিনি বলেন, আর বিস্ফোরক আইনে করা অপর মামলাটি নিম্ন আদালতে (অধস্তন) সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে নিয়ম অনুযায়ী আর্গুমেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। এর পরেই বিচারিক আদালতে রায় ঘোষণা করা হতে পারে। আশা করবো খুব দ্রুতই মামলাগুলো শেষ হয়ে যাবে।

বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলাটি এখনো ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জাগো নিউজকে বলেন, মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। এখন পর্যন্ত ৪৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপ্ত হয়েছে। বাকিদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মামলায় যুক্তি-তর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন শুরু হবে। পরবর্তী ধাপ হলো রায়।

তিনি আরও বলেন, রমনা বটমূলে ভয়াবহ বোমা হামলায় নিহত ও আহতদের বিচারের জন্য মামলাটি চলমান থাকলেও স্বৈরাচারি শাসক আমলে দীর্ঘদিন যাবত মামলাটির কোনো শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। তাই এত দেরি লেগেছে। আমরা আশা করছি, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বাদ বাকি সাক্ষীদের দ্রুত আদালতে হাজির করা হবে। এই মামলা নিষ্পত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষ উদ্যোগ নেবে বলেও জানিয়েছেন এই পাবলিক প্রসিকিউটর।

এফএইচ/এসএনআর/এমএমএআর