বাংলা নববর্ষ—পহেলা বৈশাখ—বাংলা সংস্কৃতির সবচেয়ে বর্ণিল ও সর্বজনীন উৎসব। কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে এর সূচনা হলেও সময়ের সাথে সাথে এটি পরিণত হয়েছে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য উদযাপনে। এই দিনটি কেবল একটি নতুন ক্যালেন্ডারের সূচনা নয়, বরং অতীতকে পেছনে ফেলে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার এক প্রতীকী আহ্বান। শহর থেকে গ্রাম, পাহাড় থেকে সমতল—সবখানেই নববর্ষের উৎসব মানুষের হৃদয়ে আনন্দের ঢেউ তোলে।
Advertisement
বাংলা নববর্ষের মূল চেতনা হলো নতুন শুরু। ব্যবসায়ীরা পুরনো হিসাব শেষ করে নতুন খাতা খোলেন—যাকে বলা হয় “হালখাতা”। এতে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। লাল শাড়ি, পাঞ্জাবি, পান্তা-ইলিশ—এসব উপাদান নববর্ষের সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তবে এই উৎসবের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক হলো “মঙ্গল শোভাযাত্রা”—যা এখন কেবল একটি শোভাযাত্রা নয়, বরং বাঙালির অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক চেতনার আন্তর্জাতিক প্রতীক।
মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা ঘটে ১৯৮৯ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে। তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই শোভাযাত্রা ছিল এক ধরনের প্রতিবাদ ও সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রতিফলন। এই শোভাযাত্রার মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজে বিদ্যমান অন্ধকার, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গড়ে তোলা। শোভাযাত্রায় বিশালাকার মুখোশ, রঙিন পাপেট, পাখি, হাতি, বাঘসহ বিভিন্ন প্রতীকী চিত্র ব্যবহার করা হয়, যা মানুষের অন্তর্নিহিত ভয়, আশা ও স্বপ্নকে প্রতিফলিত করে।
মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বদল নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। এটি শুধু একটি নামের প্রশ্ন নয়; বরং সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং পরিচয়ের এক জটিল আন্তঃসম্পর্কের প্রতিফলন। কখনো কখনো সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে এই উৎসবকে ঘিরে নাম, বয়ান বা ব্যাখ্যায় পরিবর্তনের আলোচনা সামনে আসে। কিন্তু প্রশ্নটি শুধু নামের নয়—প্রশ্ন হলো, আমরা এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কীভাবে দেখি এবং কীভাবে ধারণ করি।
Advertisement
মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী পরিচিত। ইউনেসকো ২০১৬ সালে এই শোভাযাত্রাকে বিশ্বের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই স্বীকৃতি আমাদের সংস্কৃতির জন্য একটি বড় অর্জন, যা প্রমাণ করে—বাংলা নববর্ষ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা কেবল উৎসব নয়, বরং বিশ্ব সংস্কৃতির অংশ।
মঙ্গল শোভাযাত্রার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অসাম্প্রদায়িকতা। এখানে কোনো ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত বিভাজন নেই। সকল ধর্মের, সকল শ্রেণির মানুষ একত্রে অংশগ্রহণ করে। এটি আমাদের সমাজে ঐক্য, সম্প্রীতি ও সহনশীলতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী মানুষ মুখে মুখে গান গায়, হাতে রঙিন প্ল্যাকার্ড বহন করে, আর হৃদয়ে ধারণ করে শান্তির প্রত্যাশা।
এই শোভাযাত্রার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন অসংগতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি নীরব প্রতিবাদও প্রকাশ পায়। অনেক সময় রাজনৈতিক বার্তা, সামাজিক সচেতনতা এবং মানবিক আবেদনও এই শোভাযাত্রার অংশ হয়ে ওঠে। তাই মঙ্গল শোভাযাত্রা কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলনের প্রতীকও বটে।
বাংলা নববর্ষ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নববর্ষ যেখানে নতুন সূচনা, মঙ্গল শোভাযাত্রা সেখানে সেই সূচনাকে ইতিবাচক ও মানবিক করে তোলে। নববর্ষের আনন্দকে অর্থবহ করে তুলতে মঙ্গল শোভাযাত্রার ভূমিকা অপরিসীম। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নতুন বছর মানেই কেবল আনন্দ নয়, বরং দায়িত্বশীলতা, সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ।
Advertisement
তবে সময়ের সাথে সাথে বাংলা নববর্ষের উদযাপনেও পরিবর্তন এসেছে। একদিকে যেমন শহরে নববর্ষের উদযাপন আধুনিক ও বাণিজ্যিক রূপ নিচ্ছে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে এর গভীর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত কনসার্ট, বাণিজ্যিক আয়োজন এবং আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান কখনো কখনো মূল চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন, নববর্ষের প্রকৃত চেতনা—সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানবিকতা—রক্ষা করা।
গ্রামবাংলায় এখনো নববর্ষের উৎসব তার ঐতিহ্য বজায় রেখে উদযাপিত হয়। সেখানে প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক আরও গভীরভাবে প্রকাশ পায়। কৃষকের জীবনে নববর্ষ মানে নতুন ফসলের আশাবাদ, নতুন স্বপ্নের সূচনা। শহর ও গ্রামের এই ভিন্নতা আমাদের সংস্কৃতিকে আরও বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ করে।
বাংলা নববর্ষ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের শেখায়—সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের বিষয় নয়, এটি আমাদের পরিচয়ের অংশ। একটি জাতির সংস্কৃতি তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে ধারণ করে রাখে। তাই এই উৎসবগুলো সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব।
আজকের প্রজন্মের উচিত এই ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং তা সংরক্ষণে ভূমিকা রাখা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলা নববর্ষ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস ও তাৎপর্য শেখানো জরুরি। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজেও এই চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের শিকড় সম্পর্কে জানতে পারে এবং গর্ব অনুভব করে।
বাংলা নববর্ষ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায়। এটি আমাদের অতীতের সাথে যুক্ত করে, বর্তমানকে সমৃদ্ধ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি সুন্দর, সহনশীল ও মানবিক সমাজ গড়ার পথ দেখায়। এই উৎসব শুধু আনন্দের নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রতীক, আমাদের ঐক্যের শক্তি এবং আমাদের স্বপ্নের দিশা।
নতুন বছরের সূর্য যখন ওঠে, তখন আমরা শুধু সময়ের পরিবর্তন দেখি না—দেখি নতুন আশা, নতুন সম্ভাবনা এবং একটি সুন্দর আগামী গড়ার প্রতিশ্রুতি। বাংলা নববর্ষ তাই শুধু একটি দিন নয়, এটি একটি অনুভূতি, একটি চেতনা এবং একটি অবিরাম যাত্রা।
দুই.বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'র নামকরণ নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত এসেছে। মূলত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ধর্মীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর দাবির প্রেক্ষিতে এই নামকরণের বিতর্কটি সামনে আসে।
নামকরণ পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য পর্যায়গুলো হলো:• আনন্দ শোভাযাত্রা: ২০২৫ সালে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চারুকলার শোভাযাত্রার নাম থেকে 'মঙ্গল' শব্দটি বাদ দিয়ে সাময়িকভাবে 'বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা' নামকরণ করা হয়েছিল। তবে এই নামকরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয় এবং অনেকে এটি অপ্রয়োজনীয় মনে করেন।• বৈশাখী শোভাযাত্রা: ৫ এপ্রিল ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ঘোষণা করেছেন যে, এবারের শোভাযাত্রার নাম হবে 'বৈশাখী শোভাযাত্রা'। তিনি জানান, সমাজে বিভাজন এড়াতে এবং 'বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য' বজায় রাখতে এই নাম বেছে নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বদল নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। এটি শুধু একটি নামের প্রশ্ন নয়; বরং সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং পরিচয়ের এক জটিল আন্তঃসম্পর্কের প্রতিফলন। কখনো কখনো সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে এই উৎসবকে ঘিরে নাম, বয়ান বা ব্যাখ্যায় পরিবর্তনের আলোচনা সামনে আসে। কিন্তু প্রশ্নটি শুধু নামের নয়—প্রশ্ন হলো, আমরা এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কীভাবে দেখি এবং কীভাবে ধারণ করি।
মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ এবং সমাজে শুভ, সুন্দর ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। সময়ের সাথে সাথে এই শোভাযাত্রা হয়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক শক্তিশালী প্রতীক, যা ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সকলকে এক কাতারে নিয়ে আসে। এই ঐতিহ্য ইউনেস্কোর স্বীকৃতিও পেয়েছে, যা এর বিশ্বজনীন গুরুত্বকে আরও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তবে বাস্তবতা হলো, যেকোনো সাংস্কৃতিক প্রতীক যখন রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে, তখন সেখানে নানা ধরনের ব্যাখ্যা, বিতর্ক এবং কখনো কখনো পুনর্নির্মাণের প্রবণতা দেখা দেয়। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে নাম বদলানোর এই প্রবণতা মূলত সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণের অংশ। কেউ কেউ মনে করেন, এই শোভাযাত্রাকে “বাঙালি সংস্কৃতির” পরিবর্তে অন্য কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হলে তার নাম বা কাঠামোও পরিবর্তন হতে পারে।
এ ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব বা আলোচনা আসলে একটি গভীর প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে—সংস্কৃতি কি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত, নাকি এটি জনগণের সম্মিলিত চেতনার প্রতিফলন? মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল শক্তি তার স্বতঃস্ফূর্ততা, জনসম্পৃক্ততা এবং অসাম্প্রদায়িক বার্তায়। এর নাম বদলানোর যেকোনো উদ্যোগ সেই স্বতঃস্ফূর্ততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
অন্যদিকে, কিছু মহল মনে করেন, সংস্কৃতি সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয় এবং নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াতে পারে। তাই নাম বা কাঠামোর পরিবর্তনকে তারা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই পরিবর্তনটি জনমতের পরিবর্তে কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তখনই সংস্কৃতি হয়ে ওঠে বিতর্কিত এবং বিভাজনের কারণ।
মঙ্গল শোভাযাত্রার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। এখানে সব ধর্মের, সব মতের মানুষ একসাথে অংশ নেয়। এই শোভাযাত্রা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ বা দলের প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যা মানুষের মানবিকতা ও ঐক্যের কথা বলে। তাই এর নাম বা পরিচয়কে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে ফেলা অনেক সময় এর মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
তবে একই সাথে এটাও সত্য যে, সংস্কৃতির ওপর রাষ্ট্রের কিছু ভূমিকা থাকে—বিশেষ করে যখন তা জাতীয় পর্যায়ে উদযাপিত হয়। এই ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তার প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বদলানোর আলোচনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—আমরা কি এই উৎসবকে একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক চর্চা হিসেবে দেখতে চাই, নাকি এটিকে রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশে পরিণত করতে চাই? যদি আমরা এর মূল চেতনা—অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা ও ঐক্য—রক্ষা করতে পারি, তবে নাম যাই হোক, এই শোভাযাত্রা তার প্রকৃত অর্থে বেঁচে থাকবে।
সংস্কৃতির শক্তি নামের মধ্যে নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে। মঙ্গল শোভাযাত্রা যতদিন মানুষের হৃদয়ে “মঙ্গল” ও “শোভা”র প্রতীক হয়ে থাকবে, ততদিন এটি তার আসল পরিচয় বজায় রাখবে—রাজনীতি বা নামের পরিবর্তন তার মূল সত্তাকে মুছে ফেলতে পারবে না।
তিন. বাংলা নববর্ষ ও মঙ্গল শোভাযাত্রাকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার নিদর্শন হিসেবে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হলে কেবল আয়োজন বাড়ালেই হবে না; বরং এর অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ—সম্প্রীতি, মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক ঐক্য—সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উদ্যোগ, যেখানে রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।
প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় নববর্ষের ইতিহাস ও মঙ্গল শোভাযাত্রার তাৎপর্য অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রমে এই উৎসবের পেছনের ইতিহাস, ইউনেস্কোর স্বীকৃতি এবং এর অসাম্প্রদায়িক বার্তা যুক্ত করলে নতুন প্রজন্ম ছোটবেলা থেকেই এর গুরুত্ব বুঝতে পারবে। স্কুল ও কলেজে নিয়মিতভাবে নববর্ষ উদযাপন, শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই চেতনা গড়ে উঠবে।
দ্বিতীয়ত, সারাদেশে একই ধরনের উৎসব আয়োজনকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। বর্তমানে মঙ্গল শোভাযাত্রা মূলত ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও, জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও এটি ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। স্থানীয় শিল্পী, শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করে ছোট পরিসরে হলেও শোভাযাত্রা আয়োজন করলে এটি ধীরে ধীরে সর্বজনীন রূপ পাবে।
তৃতীয়ত, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নববর্ষ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। ডকুমেন্টারি, সাক্ষাৎকার, বিশেষ প্রতিবেদন এবং সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালানো গেলে মানুষের মধ্যে আগ্রহ ও অংশগ্রহণ বাড়বে।
চতুর্থত, ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা আরও জোরালোভাবে প্রচার করতে হবে। মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল শক্তি হলো এর অসাম্প্রদায়িকতা—এখানে সব ধর্মের মানুষ একসাথে অংশ নেয়। ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, সামাজিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা যদি এই উৎসবের পক্ষে কথা বলেন, তাহলে মানুষের মধ্যে আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
পঞ্চমত, স্থানীয় সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যকে যুক্ত করা দরকার। মঙ্গল শোভাযাত্রাকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হলে প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব সাংস্কৃতিক উপাদান এতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। যেমন—লোকজ শিল্প, নৃত্য, গান, মুখোশ বা প্রতীকী উপস্থাপনা—এসব যুক্ত হলে উৎসবটি আরও সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় হবে। এতে মানুষ উৎসবের সঙ্গে নিজেদের সংস্কৃতির সংযোগ খুঁজে পাবে।
ষষ্ঠত, শিল্প ও সংস্কৃতি সংগঠনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চারুকলা, নাট্যদল, সংগীত ও নৃত্য সংগঠনগুলোকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উৎসাহিত করতে হলে প্রশিক্ষণ ও প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে তারা এই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিতে পারে।
সপ্তমত, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয় প্রশাসনকে বাজেট, নিরাপত্তা এবং লজিস্টিক সহায়তা দিতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে, যাতে সারা দেশে একই দিনে উৎসবটি সুশৃঙ্খলভাবে উদযাপন করা যায়।
অষ্টমত, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। অনেকেই এখনো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে কেবল একটি শোভাযাত্রা বা বিনোদন হিসেবে দেখে, এর গভীর অর্থ বোঝে না। প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে এর অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও প্রতিবাদী দিকগুলো তুলে ধরতে হবে, যাতে মানুষ এটিকে নিজের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে।
বাংলা নববর্ষ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা কেবল একটি উৎসব নয়; এটি একটি জাতির চিন্তা, চেতনা ও মূল্যবোধের প্রতিফলন। এটিকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হলে আমাদের দরকার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা এবং সাংস্কৃতিক সচেতনতা। যখন দেশের প্রতিটি প্রান্তে মানুষ এই উৎসবে অংশ নেবে, তখনই এটি সত্যিকার অর্থে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতীক হয়ে উঠবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com
এইচআর/এএসএম