বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির এক আনন্দময় ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব। নতুন বছরের সূচনাকে ঘিরে এই দিনে বাঙালিরা পুরোনো বছরের দুঃখ-গ্লানি ভুলে নতুনের আশায়, নতুন স্বপ্নে জীবনকে সাজাতে চায়। কৃষকেরা নতুন ফসল ঘরে তোলেন এবং পুরোনো লাভ-ক্ষতি কাটিয়ে নতুন করে কিছু করার স্বপ্ন দেখেন। ব্যবসায়ীরা হালখাতা খোলেন, গ্রাম ও শহরে বৈশাখী মেলা বসে, আর সবাই মেতে ওঠে নববর্ষের আমেজে। এই দিনটি বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও একতার প্রতীক হিসেবে উদযাপিত হয়।
Advertisement
বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবিকা সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষির উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। বর্তমান সময়ে কৃষি খাতে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা তাদের পরিশ্রম, উদ্ভাবন এবং আধুনিক চিন্তাভাবনার মাধ্যমে এ খাতকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। বাংলা নববর্ষকে ঘিরে কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের ভাবনা, প্রত্যাশা ও সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন ফিচার লেখক-মোহাম্মদ সোহেল রানা।
মিনহাজুল মিনার একজন কলেজশিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই তার কৃষির প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি শাকসবজি ও আলু চাষে যুক্ত হন। পড়াশোনা শেষ করে যেন চাকরির পেছনে ছুটতে না হয়-এই লক্ষ্য নিয়েই তিনি কৃষিকে নিজের ভবিষ্যৎ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
মিনহাজুল বলেন, ‘নতুন বছরে সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা-কাঁচাবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করা। বর্তমানে কৃষকের উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে, কিন্তু উৎপাদিত পণ্য অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বিশেষ করে আলু চাষে কৃষকরা গত দুই বছর ধরে লোকসানের মুখে পড়ছেন। এ অবস্থায় সরকারের উচিত আলু বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’
Advertisement
তিনি বলেন, ‘আমি একজন কলেজ ছাত্র হয়ে কৃষিতে যুক্ত হয়েছি এবং একজন উদ্যোক্তা হিসেবে দেশের কৃষিখাতে অবদান রাখতে চাই। তবে আধুনিক কৃষিতে বিভিন্ন প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ আমরা পাচ্ছি না। যদিও এ খাতে সরকারি বাজেট রয়েছে, অনেক সময় তা কৃষি অফিস পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। কৃষি কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা এসব সুবিধা পান, যারা সরাসরি কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। ফলে প্রকৃত কৃষক বা উদ্যোক্তারা এসব সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। তাই সরকারের কাছে আমার দাবি- অনুদান ও প্রশিক্ষণ যেন প্রকৃত ও যোগ্য কৃষক-উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।’
মো. রাশিদুল ইসলাম রাশেদ কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তিনি সফলতার সঙ্গে পেয়ারা ও বরই চাষ করছেন। এর পাশাপাশি মাছ চাষেও সম্পৃক্ত রয়েছেন।
রাশেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। তাই দেশের উন্নতি করতে হলে কৃষির উন্নয়ন অপরিহার্য। এজন্য সার ও কীটনাশকের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় হঠাৎ করে সার সংকট দেখা দেয়, আবার কখনো কেরোসিন তেলের অভাব হয়। ফলে চাষাবাদ করা কৃষকদের জন্য বড় ধরনের সমস্যায় পরিণত হচ্ছে।’
তাই নতুন সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা তেল, কীটনাশক ও সার যেন কৃষকের হাতের নাগালে থাকে, যাতে চাষাবাদের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। তাহলেই বাংলাদেশকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এছাড়া কৃষিঋণের সুদের হার কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।
Advertisement
এই কৃষি উদ্যোক্তা বলেন, ‘আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার কৃষকদের জন্য যে অনুদান দেয় যেমন সার, কীটনাশক ও বীজ-সেগুলোর সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে অসম বণ্টনের কারণে প্রকৃত কৃষকরা অনেক সময় এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।’
আরও পড়ুনকৃষিপ্রযুক্তিতে যুবশক্তি ধরে রাখতে করণীয়মুফতি ইউসুফ আলী একজন আলেম, তিনি দীর্ঘদিন ধরে কৃষিকাজের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত রয়েছেন। ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি ধান, পাট, কলা, আদা, শিম, বরবটি, বড় শসা, আলু ও পটলসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করেন। কৃষির প্রতি তার এই নিষ্ঠা ও পরিশ্রম শুধু তার ব্যক্তিগত জীবনে সাফল্য এনে দেয়নি, বরং আশপাশের মানুষদেরও কৃষিকাজে উৎসাহিত করছেন।
মুফতি ইউসুফ আলী জানান, বাংলা নববর্ষের শুরুতে কৃষকদের মনে যেমন নতুন আশার সঞ্চার হয়, তেমনি থাকে নানা দুশ্চিন্তা ও হিসাব-নিকাশের চাপ। নতুন বছর মানেই নতুন পরিকল্পনা, কিন্তু সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে লাভ-লোকসানের কঠিন বাস্তবতা। গত বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত হয়নি।
এই কৃষি উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমি বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ করে থাকি। এসব ফসল উৎপাদনে সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু বাজারে এসব পণ্যের দাম সেই অনুপাতে না বাড়ায় অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া যায় না। ভালো ফলন হওয়ার পরও বাজারদর কমে গেলে লোকসানের মুখে পড়তে হয়, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।’
নতুন বছরে আমার প্রত্যাশা-সরকার যেন কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করে, উৎপাদন খরচ কমাতে কার্যকর সহায়তা দেয় এবং বাজার ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করে। পাশাপাশি সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল ক্রয়ের উদ্যোগ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
‘আগামী পরিকল্পনা হিসেবে উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি গ্রহণ এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ফসল উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দিতে চাই। পাশাপাশি কৃষিকে আরও লাভজনক করতে নতুন প্রযুক্তি ও উন্নত ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর রাখব।’
সেলিম রেজা (এআইপি) দীর্ঘ সময় ধরে কৃষির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত আছেন। সফলতার সঙ্গে আম, লিচু, বরই, পেয়ারা সহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফলের চাষ করে আসছেন। কৃষিক্ষেত্রে তার এই অবদান ও সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক পুরস্কারও পেয়েছেন।
সেলিম রেজা (এআইপি) বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং দেশের সিংহভাগ মানুষ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই দেশে যেকোনো সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যোগ্য কৃষকদের অংশগ্রহণ ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষি-সম্পর্কিত দপ্তরগুলোতে শতভাগ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রকল্পগুলোর সফলতার হার বৃদ্ধি করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ পর্যন্ত যেসব প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই দুর্নীতির কারণে প্রত্যাশিত সফলতা অর্জন করতে পারেনি; বরং এতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব বিষয়ে যথাযথ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের অনিয়ম না ঘটে, সে জন্য কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নিয়মিত মনিটরিং অত্যন্ত প্রয়োজন।’
পুরস্কারপ্রাপ্ত এই কৃষক বলেন, ‘কৃষিকে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পেশা হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে নিয়োগ দিতে হবে এবং সততার সঙ্গে কাজের মাধ্যমে সফলতা নিশ্চিত করতে হবে। ভেজাল সার ও কীটনাশকসহ কৃষিতে বিদ্যমান সব অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
কেএসকে