মতামত

কাজের ছুটি, জীবনের নয়: অবসরে শুরু হোক নতুন পথ চলা

চাকরিজীবীদের অধিকাংশই অবসরগ্রহণের পর হতাশা, বিষাদ, একাকিত্বতা ও পুঞ্জিভূত ক্ষোভ বুকে ধারণ করে দিনাতিপাত করেন। বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে অবসরকে এখনো অনেকেই জীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে দেখে থাকেন। ফলে অবসরজীবনের সূচনালগ্নেই বহু মানুষের জীবন কষ্ট, অনিশ্চয়তা ও হতাশার এক অদৃশ্য আবরণে ঢাকা পড়ে যায়। এই হতাশা মূলত বাসা বাঁধে মানুষের মনোজগতে।

Advertisement

শারীরিক সক্ষমতা কিছুটা কমে যাওয়া যতটা না মানুষকে দুর্বল করে, তার চেয়ে বেশি দুর্বল করে তোলে মানসিক অস্থিরতা, অতীতের হিসাব নিকাশ এবং অপূর্ণতার বোধ। অথচ অবসর জীবনের কোনো ব্যতিক্রমী বা অস্বাভাবিক অধ্যায় নয়। এটি জীবনচক্রের একটি স্বাভাবিক ও অবধারিত ধাপ, যা সময়ের নিয়মেই আসে। জীবনের অন্য সব পর্যায়ের মতো এটিকেও নেতিবাচক দৃষ্টিতে না দেখে বরং নতুন বাস্তবতায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

অবসরগ্রহণের পর অনেকেই নিজের সঙ্গে নিজের ভেতর দীর্ঘ এক সংলাপে লিপ্ত হয়ে পড়েন। মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে। ভাবতে থাকেন, জীবনে আসলে কী পেলাম। কত কষ্ট করলাম, কোনো কাজে ফাঁকি দিইনি, মিথ্যার আশ্রয় নিইনি। একটি টাকাও ঘুষ খাইনি। সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমকে পুঁজি করে সারাজীবন দায়িত্ব পালন করেছি। অথচ অমুক তো সারা জীবন ফাঁকি দিয়ে, ঘুষ খেয়ে, অসৎ পথ অবলম্বন করে গাড়ি বাড়ি আর কত কী করে ফেলেছে। আমিও তো পারতাম, না করে ভুলই করেছি। এ ধরনের ভাবনা অনেকের মনেই আসে এবং আসাটাই স্বাভাবিক।

হ্যাঁ, আপনিও হয়তো অনেক কিছু করতে পারতেন। কিন্তু একবার শান্তভাবে নিজেকে প্রশ্ন করুন, অবৈধ ও ফাঁকিবাজ সেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করার যোগ্য করে কি আপনি নিজেকে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। পারেননি, কারণ আপনার বিবেক আপনাকে বারবার বাধা দিয়েছে। সেই বিবেকই আপনাকে সারাজীবন সঠিক পথে রেখেছে এবং একজন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। যা আপনার নেই, অথবা করতে পারলেও যা আপনি করেননি, ভাবুন সেগুলো আপনার জন্য বরাদ্দ ছিল না। যা আছে, তাতেই কৃতজ্ঞ থাকার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। প্রাপ্তির পরিসর ছোট হোক বা বড়, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে শেখাই হলো মানসিক শান্তির প্রথম শর্ত। বাড়তি অর্থ, ক্ষমতা বা ভোগবিলাসের পেছনে অকারণে ছুটে নিজের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না।

Advertisement

অনেকে আবার সহকর্মী বা বন্ধুবান্ধবের সাফল্য দেখে গভীর হতাশায় ভোগেন। প্রায়ই শোনা যায়, অমুক তো আমার চেয়ে খারাপ ছাত্র ছিল। কোনোরকমে পাশ করে মামার জোরে চাকরি পেয়েছে। আমার ডিগ্রি ও ফলাফল ছিল অনেক ভালো, অথচ আমি পদোন্নতি পেলাম না। আমার ভাগ্যটাই খারাপ। বাস্তবে দেখা যায়, কোনো কোনো সহকর্মী মেধা তালিকায় নিচে থেকেও পদোন্নতি পেয়ে গেছেন। এর পেছনে নানা কারণ কাজ করতে পারে।

সারা জীবন চাকরির ব্যস্ততায় হয়তো নিজেকেই সময় দেওয়া হয়নি। প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে উৎসবগুলোও ঠিকভাবে উপভোগ করা হয়নি। আপনার স্ত্রী হয়তো চাকরি করতেন কিংবা ছিলেন গৃহিণী। তার প্রতি প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া হয়নি, এমনকি মন দিয়ে তাকানোও হয়নি হয়তো। কত শত অভিযোগ আর অভিমান জমে আছে মনে। সেই জমে থাকা অভিযোগগুলো মিটিয়ে দেওয়ার সুযোগই তো এই অবসর। তাই ঘরে বসে অবান্তর চিন্তায় ডুবে না থেকে কারুকার্য করা হলুদ ফতুয়াটা পরে প্রিয় মানুষটিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন।

কেউ হয়তো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় ভালোভাবে করতে পেরেছেন, কেউবা কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের ধরনে ছিলেন বেশি কৌশলী ও সময়োপযোগী। মনে রাখতে হবে, ভালো ছাত্র হওয়া আর কর্মজীবনে ভালো করা এক বিষয় নয়। চাকরিজীবনে দক্ষতা, যোগাযোগ, মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, বাস্তবতা বোঝার শক্তি এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও বড় ভূমিকা রাখে। তাই অবসরে অন্যের সাফল্য দেখে আফসোস করা বা নিজেকে ব্যথিত করা একেবারেই অর্থহীন। মনে রাখা উচিত, অন্যের সাফল্য কখনোই নিজের ব্যর্থতার সমার্থক নয়। অন্যদের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে নিজেকে হারিয়ে ফেলা মানসিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে পড়ার শামিল।

তবে বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মানুষই অবসরগ্রহণের পর প্রথম দিকে খুব বেশি গভীর চিন্তাভাবনায় যান না। অবসরের শুরুটা অনেকের কাছে যেন উৎসবের মতোই আসে। সময় কেটে যায় আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ, আড্ডা, ভ্রমণ আর নানা আনন্দ ফুর্তিতে। কিন্তু বয়স যত বাড়তে থাকে, শারীরিক সক্ষমতা কমার পাশাপাশি মানসিক একাকিত্বও ধীরে ধীরে মানুষের জীবনে প্রবেশ করে। তখন হতাশা, নিঃসঙ্গতা, বিষাদ এবং অন্যের প্রতি অভিযোগ অনুযোগ বাড়তে থাকে। এই সময়েই মানুষ জীবনের অর্থ ও উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনের লাভ ক্ষতির হিসাব কষেন।

Advertisement

কেউ কেউ মনে করেন, তখন তো চাকরির এত সংকট ছিল না। এই চাকরিটা না করে অন্য চাকরিটা নিলে হয়তো ভালো হতো। আবার অনেকের ধারণা, চাকরির বদলে ব্যবসা বাণিজ্যে গেলে জীবন আরও সচ্ছল হতো, থাকত টাকা পয়সা, বাড়ি গাড়ি আর সামাজিক প্রতিপত্তি। এভাবে অতীতের ভুল বা সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলার বদলে বরং এটাই ভাবা উচিত যে, যা আপনার জন্য উপযুক্ত ছিল এবং যা আপনার ভাগ্যে বরাদ্দ ছিল, সেটাই আপনি পেয়েছেন। তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করুন। অতীতকে সামনে টেনে এনে নিজেকে বারবার কষ্ট দেওয়ার কোনো মানে নেই। অতীতকে তার জায়গায় রেখে নতুন সময়কে বরণ করুন এবং বর্তমানের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখুন। দেখবেন, মন ধীরে ধীরে হালকা হচ্ছে, চিন্তার ভার কমছে।

ইতিবাচকভাবে ভাবতে শেখার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের ভেতরে এক ধরনের নতুন মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের জন্ম নেয়, যা অবসরজীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হয়ে ওঠে। তখন অবসর আর দায় বা বোঝা বলে মনে হয় না; বরং এটি নিজের জন্য সময় দেওয়ার, নিজেকে নতুন করে বোঝার এবং দীর্ঘদিনের অবহেলিত অনুভূতিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার এক মূল্যবান সুযোগে পরিণত হয়। এই সময়টিকে অর্থবহ করে তুলতে সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

সামর্থ্য অনুযায়ী ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে দান ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে শুধু সমাজই উপকৃত হয় না, ব্যক্তিগত জীবনেও এক ধরনের আত্মতৃপ্তি, মানসিক প্রশান্তি ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা অবসরজীবনকে করে তোলে সম্মানজনক ও অর্থপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, অবসর কখনোই হতাশা, বিষাদ, নিঃসঙ্গতা, মৃত্যু কিংবা জীবনের সমাপ্তির প্রতীক নয়। বরং অবসর হলো দীর্ঘ ও কর্মব্যস্ত চাকরিজীবনের একটি স্বাভাবিক পরিণতি, যেখানে মানুষ পেছনে ফেলে আসা জীবনের পথচলার দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ পায়। সেই দীর্ঘ পথে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, অর্জন ও সুখস্মৃতিগুলোকে ধীরে ধীরে নতুন করে অনুভব করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে অবসরজীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য। সচেতন মানসিকতায় অবসরকে গ্রহণ করতে পারলে এই সময় জীবনকে নতুন অর্থ, গভীরতা ও প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিতে পারে।

সারা জীবন চাকরির ব্যস্ততায় হয়তো নিজেকেই সময় দেওয়া হয়নি। প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে উৎসবগুলোও ঠিকভাবে উপভোগ করা হয়নি। আপনার স্ত্রী হয়তো চাকরি করতেন কিংবা ছিলেন গৃহিণী। তার প্রতি প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া হয়নি, এমনকি মন দিয়ে তাকানোও হয়নি হয়তো। কত শত অভিযোগ আর অভিমান জমে আছে মনে। সেই জমে থাকা অভিযোগগুলো মিটিয়ে দেওয়ার সুযোগই তো এই অবসর। তাই ঘরে বসে অবান্তর চিন্তায় ডুবে না থেকে কারুকার্য করা হলুদ ফতুয়াটা পরে প্রিয় মানুষটিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। ঘুরে আসুন রমনা পার্ক, বলধা গার্ডেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, বনানী লেক কিংবা হাতিরঝিলে। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকলে মন আপনাতেই শান্ত হয়ে আসে। ক্লান্ত হয়ে চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় বসে সুরের মূর্ছনায় ফিরে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের তারুণ্যে। নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে এভাবে অবসরের সময়কে বর্ণিল করে তোলা একেবারেই সম্ভব।

তাই পেছন ফিরে নয়, সবসময় সামনের দিকে তাকান। দেখবেন, আপনার জীবনকে রাঙিয়ে দিতে সামনে অপেক্ষা করছে প্রচুর ঝলমলে আলো। অবসরজীবন শেষ নয়, বরং সচেতন মানসিকতায় গ্রহণ করতে পারলে এ জীবনও হতে পারে নতুন রঙে রাঙানো এক সুন্দর অধ্যায়।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন। rssarker69@gmail.com

এইচআর/এমএস