‘আমি ভাবি, যদি আবার ছুঁতে পারতাম তোমাকে—সত্যি হোক বা স্বপ্নই হোক।’ জনপ্রিয় হিন্দি গান ‘জারা জারা’র বাংলা অনুবাদের একটি লাইন এটি। বাংলাদেশের জার্সিকে বিদায় বলা রুবেল হোসেন কখনো গানটি শুনেছেন কি না বলা কঠিন। তবে আজ সোমবার তার মনের ভেতর যেন এমনই কোনো সুর বাজছিল। যে উইকেটে তার আন্তর্জাতিক পথচলার শুরু, বিদায়ের ক্ষণে সেই মাটিকেই ছুঁয়ে দেখলেন, চুমু খেলেন, তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। হয়তো মনে মনে বললেন, ‘বিদায় বন্ধু।’
Advertisement
সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান তখন শেষ। ছেলে পাশে নিয়ে রুবেল হোসেন হেঁটে গেলেন মাঠের ঠিক মাঝখানে। উইকেটটাকে আলতো করে ছুঁয়ে দেখলেন। তারপর এক মুহূর্তে আবেগের বাঁধ ভেঙে মাটিতে চুমু খেলেন, অনেকটা ফ্লাইং কিসের ভঙ্গিতে। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে গিয়ে আবারও তাকালেন উইকেটের দিকে। মনে হলো, আবেগে ভেসে যাচ্ছেন তিনি। এই মিরপুরেই তো ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল রুবেলের। সেই মাঠেই আজ অবসর উপলক্ষে তাকে সম্মাননা জানাল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
গত ১৫ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন রুবেল হোসেন। আজ বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ শুরুর আগে তাকে সম্মাননা জানিয়েছে বিসিবি। এ সময় রুবেলকে বিশেষ স্মারক ও তিন ফরম্যাটের জার্সি ফ্রেম তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিসিবির অ্যাডহক কমিটির সভাপতি তামিম ইকবাল খান, সদস্য ফাহিম সিনহা ও রফিকুল ইসলাম বাবু।
সম্মাননা অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্মৃতিচারণ করেন তাসকিন আহমেদ। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের কথা মনে করে তাসকিন বলেন, ‘আমার এখনও মনে আছে ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচটা কত কঠিন চাপের ছিল। দুই বলে দুই উইকেট নিয়ে আপনি আমাদের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে সাহায্য করেছিলেন। সেই মুহূর্তটা এখনও মনে পড়ে। আপনাকে ধন্যবাদ।’
Advertisement
এরপর নিজের বক্তব্যে রুবেল কৃতজ্ঞতা জানান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের প্রতি। তিনি বলেন,‘আমি যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার অবসরের সিদ্ধান্ত জানাই, তখন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল আমাকে ফোন করে বলেন, ‘রুবেল, তোকে আমরা সম্মানিত করতে চাই।’ বিষয়টা আমার জন্য খুবই গর্বের ও আনন্দের ছিল। আজ এত সুন্দর একটি আয়োজন করার জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং সভাপতি তামিম ইকবালকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।’
পেসার হান্ট থেকে উঠে আসা রুবেলের ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন কোচ সারোয়ার ইমরান। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রুবেল বলেন, ‘একজন মানুষের নাম না বললেই নয়। পেসার হান্ট থেকে আমাকে নিয়ে এসে যিনি ওপরে ওঠার সিঁড়ি ধরিয়ে দিয়েছেন, তিনি আমার প্রিয় কোচ শ্রদ্ধেয় সারোয়ার ইমরান স্যার। স্যারের প্রতি আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। স্যারের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।’
এরপর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পাশে থাকা সবাইকেই স্মরণ করেন তিনি, ‘স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে বিসিবির সব কোচ, গ্রাউন্ডসম্যান, ফিজিক্যাল ট্রেইনার সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। তারা আমাকে সমর্থন দিয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন এবং সবসময় পাশে ছিলেন।’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পেছনে বাবা-মায়ের অবদানও স্মরণ করেন রুবেল। তিনি বলেন,‘আমি আজ এখানে দাঁড়াতে পেরেছি দুজন মানুষের জন্য — আমার বাবা ও মা। তারা সবসময় আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন, পাশে থেকেছেন এবং ভালোবাসা দিয়েছেন। আজ তাদের খুব মিস করছি। বন্ধু-বান্ধব থেকে শুরু করে খারাপ সময়ে যারা পাশে ছিলেন, মিডিয়াকর্মীসহ সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
Advertisement
রুবেল সর্বশেষ প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলেছেন গত বছরের জানুয়ারিতে। ২০২৪ সালের এপ্রিলের পর আর ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগেও দেখা যায়নি তাকে। জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচ খেলেছেন ২০২১ সালের ১ এপ্রিল নিউজিল্যান্ড সফরে। পাঁচ বছরের বেশি সময় জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলেছেন তিনি।
মিরপুরে আজ নিউজিল্যান্ড খেলছে, নিজে মাঠে না নামলেও কিউইদের বিপক্ষে ম্যাচের দিনটিতেই যেন মাঠকে ছুঁয়ে বিদায় জানালেন রুবেল। ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১২ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বাংলাদেশের হয়ে ২৭টি টেস্ট, ১০৪টি ওয়ানডে ও ২৮টি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন রুবেল। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে তার শিকার ১৯৩ উইকেট। এর মধ্যে টেস্ট ও ওয়ানডেতে একবার করে ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্বও রয়েছে এই পেসারের।
এসকেডি/আইএন/এএসএম