আমাদের দেশে পরিবারগুলোতে ম্যান-চাইল্ড সিনড্রোম এখন একটি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে। এটি কোনো ক্লিনিক্যাল রোগ নয়, বরং একটি আচরণগত ও মানসিক প্রবণতা, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরা বয়সে বড় হলেও দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে শিশুসুলভ আচরণ করেন। বিষয়টি অনেক সময় হাস্যরসের মতো শোনালেও বাস্তবে এটি পরিবার ও সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
Advertisement
বাংলাদেশের অনেক পরিবারে ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই কমফোর্ট জোনে বড় করা হয়। তাদের মূল দায়িত্ব হিসেবে ধরা হয় শুধু পড়াশোনা, খাওয়া এবং ভবিষ্যতে ভালো চাকরি করা। অন্যদিকে, পরিবারের মেয়েদের ছোট থেকেই শেখানো হয় রান্না, অতিথি আপ্যায়ন, ঘর সামলানো, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া।
এই পার্থক্য ধীরে ধীরে একটি মানসিক কাঠামো তৈরি করে, যেখানে ছেলে সন্তান বড় হলেও ব্যবহারিক জীবনের মৌলিক দক্ষতা অর্জন করে না। ফলে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও তারা অনেক দৈনন্দিন কাজ অন্যের ওপর নির্ভর করে করে থাকে।
ম্যান-চাইল্ড আসলে কারাম্যান-চাইল্ড বলতে সেই সব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের বোঝানো হয়, যারা আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বল, দায়িত্ব নিতে অনীহা প্রকাশ করে, আর্থিক পরিকল্পনায় অগোছালো এবং বাস্তব জীবনের সমস্যার মুখোমুখি হলে সহজেই ভেঙে পড়ে। তারা হয়তো কর্মক্ষেত্রে বড় বড় প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে পারে, ব্যাংকিং অ্যাপ দিয়ে দ্রুত লেনদেন করতে পারে, এমনকি জটিল বিষয় বিশ্লেষণ করতে পারে। কিন্তু একই মানুষ নিজের ঘরে পেঁয়াজ কোথায় আছে বা খাবার কীভাবে রান্না করতে হয়, সেটি নিয়ে সম্পূর্ণ অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
Advertisement
বিয়ের পর এই প্রবণতা অনেক সময় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দৈনন্দিন ছোট ছোট দায়িত্ব যেমন খাবার পরিকল্পনা, ঘরের কাজ, নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা, এমনকি সামাজিক দায়িত্বসহ সব কিছুই অনেক সময় সঙ্গীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ফলে অনেক নারীকে অবৈতনিক জীবন ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতে হয়। তিনি একই সঙ্গে সংসার সামলানো, সিদ্ধান্ত নেন এবং সঙ্গীর দৈনন্দিন জীবনও পরিচালনা করেন।
আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাববর্তমান ডিজিটাল জীবনও এই প্রবণতাকে কিছুটা বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্মার্টফোন, গেমিং, সোশ্যাল মিডিয়া এবং অনলাইন বিনোদন অনেক সময় বাস্তব জীবনের দায়িত্ব থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়। ফলে মানসিক পরিপক্বতা বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া দ্রুত সেবা ব্যবস্থা যেমন ফুড ডেলিভারি, অনলাইন শপিং ইত্যাদি কিছু মৌলিক দক্ষতা শেখার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরশীলতা বাড়ায়।
সম্পর্ক ও মানসিক চাপম্যান-চাইল্ড আচরণ দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। একজন সঙ্গী যখন সব দায়িত্ব সামলায়, তখন সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে বিরক্তি, মানসিক চাপ এবং দূরত্ব তৈরি হতে পারে। অনেক সময় ছোট বিষয়েও সিদ্ধান্তহীনতা, রাগ, বা দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা সম্পর্ককে জটিল করে তোলে।
Advertisement
এই ধরনের আচরণ বোঝার জন্য কিছু লক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন: দায়িত্ব নিতে অনীহা, সমালোচনা সহ্য করতে না পারা, আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, ব্যক্তিগত কাজ অন্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া, এবং বাস্তব সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া। এছাড়া অগোছালো জীবনযাপন, সময় ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা এবং অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এই প্রবণতার অংশ হতে পারে।
সমাধানের পথএই সমস্যা পরিবর্তনযোগ্য। ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের দায়িত্ব শেখানো, ছোট ছোট কাজ নিজে করতে দেওয়া এবং ব্যর্থতা মোকাবেলার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মসচেতনতা। নিজের দুর্বলতা বুঝে ধীরে ধীরে দায়িত্ব নেওয়া, যোগাযোগ বাড়ানো এবং প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলিং গ্রহণ করা কার্যকর হতে পারে।
ম্যান-চাইল্ড সিনড্রোম কোনো ব্যক্তিকে ছোট করে দেখার বিষয় নয়, বরং এটি একটি সামাজিক লালন-পালন কাঠামোর ফল। পরিবারে সমান দায়িত্ব ভাগাভাগি, বাস্তব জীবনের দক্ষতা শেখানো এবং মানসিক পরিপক্বতা গড়ে তোলার মাধ্যমে এই প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সূত্র: হাফপোস্ট, মিডিয়াম ও অন্যান্য
আরও পড়ুন অনলাইনে কি সত্যিকারের বন্ধুত্ব হয় ভালোবাসার আড়ালে মানসিক চাপ, বাড়ছে ট্রমা বন্ডিংএসএকেওয়াই