ই-সিগারেটকে অনেকেই ‘কম ক্ষতিকর’ বা ‘ধূমপান ছাড়ার সহজ উপায়’ হিসেবে প্রচার করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর অবস্থান বলছে—এটি নিরাপদ নয়, এবং ধূমপান ছাড়ার কার্যকর উপায় হিসেবেও এর সাফল্য সীমিত ও বিতর্কিত। বরং নতুন করে নিকোটিন-আসক্তি তৈরি, তরুণদের আকৃষ্ট করা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
Advertisement
ই-সিগারেট বা ভ্যাপিং ডিভাইস এমন একটি যন্ত্র, যা তরল পদার্থ গরম করে বাষ্প তৈরি করে। ব্যবহারকারী সেই বাষ্প শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে টেনে নেয়। এতে সাধারণ সিগারেটের মতো তামাক পোড়ানো হয় না, কিন্তু নিকোটিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করে।
ই-সিগারেটে কী কী উপাদান থাকে?সাধারণত ই-সিগারেটের ভ্যাপিং ডিভাইসের তরলে থাকে—নিকোটিন, প্রোপাইলিন গ্লাইকোল, ভেজিটেবল গ্লিসারিন, ফ্লেভারিং কেমিক্যাল, ভারী ধাতু ও বিষাক্ত কণা এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক যৌগ।
আসক্তির প্রধান উপাদান নিকোটিনএটি মস্তিষ্কে দ্রুত প্রভাব ফেলে এবং নির্ভরশীলতা তৈরি করে। কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
Advertisement
বাষ্প তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়। গরম হওয়ার পর কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি হতে পারে।
ফ্লেভারিং রাসায়নিকফল, চকোলেট, মিন্ট ইত্যাদি স্বাদের জন্য ফ্লেভারিং রাসায়নিক মেশানো হয়। কিছু ফ্লেভারিং উপাদান ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
ভারী ধাতু ও বিষাক্ত কণাকিছু গবেষণায় নিকেল, টিন, সিসা ইত্যাদির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এগুলো দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সিসার উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়া উদ্বেগের বিষয় এবং এটি সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ক্ষতিকর রাসায়নিক যৌগফরমালডিহাইডসহ কিছু রাসায়নিক তৈরি হতে পারে, যা ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
Advertisement
ই-সিগারেটকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর। এতে নিকোটিনসহ নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে, যা নতুন প্রজন্মকে আসক্ত করছে। অথবা আরও স্পষ্টভাবে বলা যায়— ‘ধূমপান ছাড়ার বৈজ্ঞানিক উপায় হলো কাউন্সেলিং, নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান—ই-সিগারেট নয়।’
কতটুকু ক্ষতিকর?এখানে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, ই-সিগারেট হয়তো প্রচলিত সিগারেটের মতো একই মাত্রায় ক্ষতিকর নয়, কিন্তু সেটি নিরাপদ—এ কথা বিজ্ঞানের পক্ষে এখনো বলা সম্ভব হয়নি।
সম্ভাব্য ক্ষতির মধ্যে রয়েছে—
• নিকোটিন-আসক্তি বৃদ্ধি • ফুসফুসের প্রদাহ ও ক্ষতি • কাশি, গলা জ্বালা ও শ্বাসকষ্ট • হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি • তরুণদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা তৈরি
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ক্যানসারঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ভ্যাপিং-সংশ্লিষ্ট ফুসফুসের গুরুতর রোগ (EVALI) নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC)—উভয় প্রতিষ্ঠানই এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
‘ধূমপান ছাড়ার উপায়’ হিসেবে ই-সিগারেট কি কার্যকর?এখানে বিতর্ক আছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মানুষ সাময়িকভাবে সিগারেট কমাতে পারে। কিন্তু বড় সমস্যা হলো, অনেকে সিগারেট ছাড়তে না পেরে দুটিই চালিয়ে যায় (dual use)।
• ই-সিগারেটেও নিকোটিন-আসক্তি থেকে যায়। • অনেক তরুণ প্রথমে ভ্যাপিং শুরু করে, পরে সিগারেটে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
তাই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ মনে করেন—‘একটি আসক্তির বদলে আরেকটি আসক্তি তৈরি করা সমাধান হতে পারে না।’
ধূমপান ছাড়ার বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর উপায় কী?ধূমপান ছাড়ার নিরাপদ ও প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি রয়েছে।
কাউন্সেলিং ও আচরণগত সহায়তাএটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবার, চিকিৎসক এবং সাপোর্ট গ্রুপের সহায়তা খুব কার্যকর।
Nicotine Replacement Therapy (NRT)
চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহার করা হয়।নিকোটিন গাম, নিকোটিন প্যাচ, লজেন্স—এসব নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় নিকোটিন সরবরাহ করে, ক্ষতিকর ধোঁয়া ছাড়াই।
চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধযেমন—• Varenicline • Bupropion
এসব ওষুধ ধূমপানের আকাঙ্ক্ষা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ধাপে ধাপে পরিকল্পনা• নির্দিষ্ট Quit Date ঠিক করা • ট্রিগার এড়িয়ে চলা • স্ট্রেস ব্যবস্থাপনা • নিয়মিত ব্যায়াম • পর্যাপ্ত ঘুম
জাতীয় জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ• সতর্কীকরণ প্রচার • বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণl; তরুণদের কাছে বিক্রি বন্ধ • জনসচেতনতা বৃদ্ধি
বলা যায়, ই-সিগারেটকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর। এতে নিকোটিনসহ নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে, যা নতুন প্রজন্মকে আসক্ত করছে।
অথবা আরও স্পষ্টভাবে বলা যায় ধূমপান ছাড়ার বৈজ্ঞানিক উপায় হলো কাউন্সেলিং, নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান—ই-সিগারেট নয়।
আরও বলা যায়—‘জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিতে ই-সিগারেট একটি নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে।’
লেখক: মনোশিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক; সাবেক পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট।
এইচআর/এমএস