অর্থনীতি

বড় প্রণোদনায় পুনরুজ্জীবিত হতে পারে কৃষিখাত

দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যার মধ্যে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য রাখা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা, যা পুরো প্যাকেজের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ।

Advertisement

এছাড়া উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে আলাদা তিন হাজার কোটি টাকা এবং হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানির জন্যও দুই হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে।

পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মাধ্যমে। তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে রপ্তানি বহুমুখীকরণ খাতেও। ওই দুই খাতের বরাদ্দও পরোক্ষভাবে কৃষির জন্য সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

দীর্ঘসময় পর কৃষিতে এমন প্রণোদনায় এ খাতকে দারুণভাবে পুনরুজ্জীবিত করবে বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, সুষ্ঠু ও অধিক উৎপাদনশীল উপখাতগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে এ ঋণ ও অর্থায়ন করা দরকার। এছাড়া এর মাধ্যমে দেশের প্রকৃত চাষি ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে হবে। ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতি যেমন ঘুরে দাঁড়াবে, বাড়বে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানও।

Advertisement

এ ধরনের প্রণোদনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগের সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে। নতুন ও পুরোনো উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়বে। পক্ষান্তরে যারা প্রকৃত চাষি তারা সহজে সহায়তা পাবেন।—জাহাঙ্গীর আলম খান

জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, করোনা পরবর্তীকালে কৃষিসহ দেশের পুরো অর্থনীতিতে বরাদ্দ ও বিনিয়োগ কমছে। এ অবস্থায় এ ধরনের প্রণোদনা পুঁজির সঞ্চার করবে, বিনিয়োগেও উৎসাহ বাড়াবে। নতুন উদ্যোক্তা যারা কৃষিতে এসেছেন, যারা বড় পরিসরে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করছেন সবাই উৎসাহিত হবেন।

আরও পড়ুন বাজেট ২০২৬-২৭ / ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নিতে চায় সরকার

‘এ ধরনের প্রণোদনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগের সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে। নতুন ও পুরোনো উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়বে। পক্ষান্তরে যারা প্রকৃত চাষি তারা সহজে সহায়তা পাবেন’—যোগ করেন তিনি।

৬০ হাজার কোটি টাকার ওই পুরো প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন হলে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে মনে করছে দেশের ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এরমধ্যে কৃষি ও গ্রামীণ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবে ৯ লাখ মানুষ। যারা সরাসরি কৃষির উৎপাদন, কৃষিশ্রম ও খাদ্য প্রকৃয়াকরণ কাজের মধ্যে সম্পৃক্ত হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

Advertisement

এছাড়া উত্তরবঙ্গে কৃষি হাব গঠনের যে উদ্যোগ তাতে ওই এলাকাগুলোতে উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও রপ্তানি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং পচনশীল কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। পাশাপাশি তিন হাজার কোটি টাকার এ প্রণোদনা তৈরি করবে নতুন এক লাখ কর্মসংস্থান।

কৃষি উদ্যোক্তা, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতেও বরাদ্দ রয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে দুই লাখ।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে ব্যাংক অর্থায়ন করবে, তারা মনমতো তাদের গ্রাহকদের গুরুত্ব দেয়। অনেক সময় প্রকৃত ব্যবসায়ী বঞ্চিত হন। আবার অনেক ব্যবসায়ী নানান ধরনের কৌশল ও অসাধু পন্থা অবলম্বন করে সুবিধা নেন। আমরা চাই- এমনটি যেন না হয়।—কাজী বেলায়েত হোসেন

এ বিষয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশনের (এসএমই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, যে কোন ধরনের সরকারি বরাদ্দ ইতিবাচক সুফল আনে। এ খাতে কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা উপকৃত হবেন। নতুন নতুন বহুমুখী পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়বে। এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট ছোট কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সম্প্রসারণেও সাহায্য করবে।

এছাড়া এ বরাদ্দে নতুন এবং উদ্ভাবনী আইডিয়া নিয়ে যারা কৃষিতে আসতে চান, তাদের জন্যও ৫০০ কোটি টাকার একটি স্টার্টআপ তহবিল রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ প্রক্রিয়াকরণ ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তাদের জন্য দুই হাজার কোটি টাকার বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে, যা এ খাতের রপ্তানি বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

আরও পড়ুন টেকসই সুফল পেতে কৃষি-প্রযুক্তি-নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রাধিকার দরকার

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সাবেক সভাপতি এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় হিমায়িত মৎস্য ও চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকারী এবং রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ছবি ফিশ প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী বেলায়েত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ধরনের প্রণোদনা ঘোষণায় এ খাতের ব্যবসায়ীরা উজ্জীবিত। তবে আমাদের দাবি- যেন প্রকৃত ব্যবসায়ীরা এ সহায়তা পান।

তিনি বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে ব্যাংক এ অর্থায়ন করবে, তারা মনমতো তাদের গ্রাহকদের গুরুত্ব দেয়। অনেক সময় প্রকৃত ব্যবসায়ী বঞ্চিত হন। আবার অনেক ব্যবসায়ী নানান ধরনের কৌশল ও অসাধু পন্থা অবলম্বন করে সুবিধা নেন। আমরা চাই- এমনটি যেন না হয়।  

‘সঠিকভাবে প্রণোদনা বাস্তবায়ন হলে চিংড়িসহ দেশের পুরো মৎস্য অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। করোনা পরবর্তীকাল থেকে এ খাত ধুঁকছে। অনেকে লোকসান করেছেন, এ প্রণোদনায় তারা নতুন করে উজ্জীবিত হবেন’—যোগ করেন বেলায়েত হোসেন।

এনএইচ/এমকেআর