মরক্কোর সঙ্গে খুব বাজে ফুটবল উপহার দিয়ে ১-১ গোলে ড্র করেছিল ব্রাজিল। স্বাভাবিকভাবেই ভক্ত-সমর্থকদের মন ছিল খারাপ। তাদের প্রত্যাশা ছিল, ব্রাজিল পরের ম্যাচে ঠিকই ঘুরে দাঁড়াবে।
Advertisement
এরপর আজ হাইতির বিপক্ষে এলো ৩-০ গোলের স্বস্তিদায়ক জয়। স্কোরলাইন দেখলে মনে হবে ব্রাজিল দাপটের সঙ্গে ম্যাচ জিতেছে। কিন্তু খেলা যারা দেখেছেন, তারা জানেন বাস্তবতা ভিন্ন। জয় এসেছে, তিন পয়েন্টও মিলেছে; কিন্তু পারফরম্যান্সে ছিল না সেই ব্রাজিলিয়ান ‘জোগো বোনিতো’র ছন্দ, সৃজনশীলতা কিংবা প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতা। বরং ম্যাচের বড় একটা সময় জুড়ে কার্লো আনচেলত্তির দলকে দেখা গেছে ধীর, নিষ্প্রভ ও অনুপ্রাণনাহীন ফুটবল খেলতে।
ম্যাচের আগে ধারণা ছিল, শুধু জয় নয়- ব্রাজিলকে ভালো ফুটবলও খেলতে হবে। হাইতির মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এবং গোলের বন্যা বইয়ে নিজেদের শক্তির জানান দেওয়ার সুযোগ ছিল সেলেসাওদের সামনে।
বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ফিফা র্যাংকিংয়ে ৮৫ নম্বরে থাকা দল হাইতির বিপক্ষে নামার আগে প্রত্যাশা ছিল ব্রাজিল শুধু জিতবেই না, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বও প্রতিষ্ঠা করবে। প্রতিপক্ষকে চেপে ধরে খেলবে, বলের নিয়ন্ত্রণে রাখবে ম্যাচ এবং একের পর এক আক্রমণে গোলের বন্যা বইয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র।
Advertisement
ম্যাথিউস কুনহার জোড়া গোল ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গোলে প্রথমার্ধেই ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় সেলেসাওরা; কিন্তু এই তিন গোলও ঢাকতে পারেনি দলের সামগ্রিক দুর্বলতা। বলের দখল ছিল ব্রাজিলের, কিন্তু আক্রমণে গতি ও ধার ছিল না।
অন্যদিকে হাইতি খুব বেশি কিছু করতে না পারলেও নিজেদের গুছিয়ে রেখেছিল। প্রথম গোলটি এসেছে অনেকটা প্রতিপক্ষের ভুল থেকে, দ্বিতীয় গোলটি কাউন্টার অ্যাটাকে এবং তৃতীয় গোলটি লুকাস পাকেতার অসাধারণ পাসে। অর্থাৎ গোলগুলো ছিল ব্যক্তিগত দক্ষতার ফল, দলগত আধিপত্যের নয়। যদিও গোল শেষে নেচে-গেয়ে সাম্বা নৃত্যের চির-পরিচিত দৃশ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন কুনহা, ভিনিসিয়ুরা।
এই ম্যাচের আগে হাইতির বিপক্ষে ৩টি ম্যাচ খেলেছিল ব্রাজিল। এই তিন ম্যাচে ক্যারিবিয়ান দলটিকে ১৭ গোল দিয়েছে তারা। হজম করেছিল মাত্র একটি। সর্বশেষ ২০১৬ কোপা আমেরিকার শতবর্ষী টুর্নামেন্টে হাইতিকে ৭-১ গোলে হারিয়েছিল সেলেসাওরা। দু’দলের শক্তির পার্থক্য এমনই। অথচ, ম্যাচের প্রথম ২০ মিনিটে হাইতি নিজেদের রক্ষণভাগ গুছিয়ে রেখে ব্রাজিলকে বেশ ভুগিয়েছে। ব্রাজিল বলের দখল রেখেছে ঠিকই; কিন্তু সেই দখল ছিল অনেকটাই নিষ্ফলা। আক্রমণে গতি ছিল না, মাঝমাঠে ছিল না প্রয়োজনীয় সৃজনশীলতা। বল এক পাশ থেকে আরেক পাশে ঘুরেছে; কিন্তু প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভাঙার মতো ধারালো পরিকল্পনা খুব কমই দেখা গেছে। বিশেষ করে মাঝ মাঠের দুর্বলতা বেশ ফুটে উঠেছিল।
প্রথমার্ধে হাইতি একবারও ব্রাজিলের গোলমুখে শট নিতে পারেনি। তবুও ব্রাজিলের খেলায় আত্মবিশ্বাসী আগ্রাসন চোখে পড়েনি। মনে হচ্ছিল, তারা শুধু ম্যাচটি শেষ করতে চায়, জেতার জন্য নয়, বরং সময় পার করার জন্য খেলছে।
Advertisement
দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও ব্রাজিল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে রাখতে পারেনি। বরং হাইতি কয়েকবার আক্রমণে উঠে এসে ব্রাজিলের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছে। এক পর্যায়ে অ্যালিসন বেকারকে দুর্দান্ত এক সেভও করতে হয়। একটু এদিক-সেদিক হলেই বলটি জড়িয়ে পড়তে পারতো জালে। হাইতির মতো দলের বিপক্ষে ব্রাজিলের গোলরক্ষককে এমন গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ করতে হওয়াটাই প্রশ্ন তুলে দেয় দলের পারফরম্যান্স নিয়ে।
এই ম্যাচে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় ছিল আনচেলত্তির একাদশ নির্বাচন ও পরিবর্তনগুলো। ম্যাচের শুরুতে কুনহা, রাফিনহা ও ভিনিসিয়ুসকে নিয়ে আক্রমণ সাজানো হলেও গতি ও তীক্ষ্ণতার অভাব ছিল স্পষ্ট। রাফিনহার চোটে মাঠ ছাড়ার পর তরুণ রায়ানের প্রবেশ কিছুটা প্রাণ ফিরিয়ে আনে।
তবে সবচেয়ে বেশি সাড়া পড়ে এনদ্রিক মাঠে নামার পর। কুনহার পরিবর্তে তরুণ এই ফরোয়ার্ডকে নামানোর সময় গ্যালারিতে প্রথমবারের মতো প্রকৃত উচ্ছ্বাস দেখা যায়। এনদ্রিক ও গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির উপস্থিতিতে আক্রমণে গতি, ড্রিবলিং এবং প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করার মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেকেরই মনে হয়েছে, ম্যাচের শুরু থেকেই এনদ্রিক-রায়ান-ভিনিসিয়ুস ত্রয়ীকে খেলানো হলে ব্রাজিলের আক্রমণ আরও প্রাণবন্ত হতে পারত।
মাঝমাঠেও ছিল সমস্যা। অভিজ্ঞ ক্যাসেমিরোকে ম্যাচজুড়ে খুব একটা কার্যকর মনে হয়নি। খেলার গতি বাড়ানোর পরিবর্তে তিনি অনেক সময় বলের প্রবাহ ধীর করে দিয়েছেন। অথচ পরিবর্তন আনতে আনচেলত্তি বেশ বিলম্ব করেছেন। ফলে দ্বিতীয়ার্ধের বড় অংশজুড়ে ব্রাজিলের খেলা ছিল একঘেঁয়ে।
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, ম্যাচের শেষ দিকে হাইতি বরং বলের নিয়ন্ত্রণে বেশি সময় কাটিয়েছে। তারা গোলের খোঁজে এগিয়ে এসেছে, আর ব্রাজিল অনেকটা নিষ্ক্রিয়ভাবে ম্যাচ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করেছে। মনে হয়েছে, ব্রাজিলের ফুটবলাররা বেশ ক্লান্ত। হাইতির বিপক্ষে এমন চিত্র কোনোভাবেই ব্রাজিলের মতো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সঙ্গে মানানসই নয়।
৩-০ জয় নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এই জয়ে গ্রুপের শীর্ষে ওঠার পথও সহজ হয়েছে। কিন্তু স্কোরলাইনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা হলো- ব্রাজিল এখনও নিজেদের সেরা ছন্দ থেকে অনেক দূরে। সৃজনশীলতার ঘাটতি, আক্রমণে ধারহীনতা, অতিরিক্ত পার্শ্ব ও ব্যাকপাসের ওপর নির্ভরতা এবং ম্যাচজুড়ে আগ্রাসনের অভাব ভবিষ্যতের কঠিন প্রতিপক্ষদের বিপক্ষে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্বকাপে শুধু জয়ই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন প্রতিপক্ষকে ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো ফুটবল। হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিল তিন পয়েন্ট পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিজেদের সামর্থ্যের যে বার্তা বিশ্বকে দেওয়ার কথা ছিল, সেটা দিতে পারেনি। বরং এই ম্যাচ দেখিয়ে দিল, আনচেলত্তির দলের সামনে এখনও অনেক কাজ বাকি।
আইএইচএস/