সন্তানের নিরাপদ আশ্রয় ও জীবনের শ্রেষ্ঠ দিশারি হিসেবে বাবার অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে, বাবার ছায়ায় বেড়ে ওঠা কন্যাদের জীবনে তার ত্যাগ ও ভালোবাসার গভীরতা অপরিসীম। বার্ধক্য, প্রবাস কিংবা একাকী লড়াই প্রতিটি প্রতিকূলতায় বাবার পাশে থাকার প্রত্যয়ে কন্যাদের আবেগ, অনুভূতি ও সুচিন্তিত মতামতগুলো একত্রে তুলে ধরেছেন আমানুর রহমান।
Advertisement
জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাবা যখন বার্ধক্যে উপনীত হন, তখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় সন্তানের নিরাপদ সাহচর্য। যে বাবা একদিন পরম মায়ায় হাত ধরে আমাদের পুরো পৃথিবী চিনিয়েছিলেন, আজকের যান্ত্রিক ও ব্যস্ত নগরজীবনে তাকে অবহেলা করা চরম নিষ্ঠুরতা। বার্ধক্যে শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার এই সময়ে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; বাবার প্রয়োজন একটুখানি সময়, গভীর শ্রদ্ধা ও মানসিক সমর্থন। আমরা হয়তো মাথার ওপরের বিশাল আকাশ ছুঁতে পারি না, কিন্তু বাবাকে ছুঁতে পারি কারণ বাবাই তো আমাদের মাথার ওপরের সেই পরম আকাশ। এই গভীর অনুভূতি বুকে ধারণ করলে কোনো সন্তানই বাবাকে একা ফেলে যেতে পারে না। বাবার বার্ধক্য কোনো বোঝা নয়, বরং তার আজীবনের স্নেহ-ভালোবাসার ঋণ শোধের এক পবিত্র সুযোগ। শেষ বয়সে বাবার প্রতি সন্তানের সর্বোত্তম উপহার হলো তাকে কখনো একা অনুভব করতে না দেওয়া।
আরও পড়ুন বাবাকে নিয়ে যত উক্তি নীরব আত্মত্যাগের নাম বাবা মাহজাবীন তাসনীম রুহী, শিক্ষার্থী, এমসি কলেজ, সিলেটআজকের এই কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাবা হলেন সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। নিজের সব শখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে তিনি সবসময় সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে চান। সারা বছর হয়তো নিজের জন্য একটি নতুন জামাও কেনেন না, অথচ সন্তানের পড়াশোনা আর প্রয়োজনের দিনে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না। জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকুও তিনি বিলিয়ে দেন সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য। বাইরে থেকে বাবাকে কঠোর মনে হলেও ভেতরে তিনি ভীষণ নরম হৃদয়ের মানুষ। রিকশাভাড়া বাঁচিয়ে সন্তানের টিফিনের টাকা জোগানো কিংবা নিজের প্লেটের ভালো খাবারটি সন্তানের মুখে তুলে দেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার নিঃশর্ত ভালোবাসা। বাবার এই জীবনসংগ্রাম আমাদের সততা ও ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। সব ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে সন্তানদের আগলে রাখা এই নীরব ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। পৃথিবীর সব বাবা ভালো থাকুন।
জীবনের শ্রেষ্ঠ দিশারি বাবা সাদিয়া জা. হক, শিক্ষার্থী, ফেনী সরকারি কলেজবাবা প্রতিটি সন্তানের জীবনের এক বিশাল বটবৃক্ষ। প্রখর রোদে গাছ যেমন ছায়ায় পথিককে আগলে রাখে, বাবাও তেমনি জীবনের সব ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে সন্তানকে পরম মমতায় সুরক্ষিত রাখেন। মায়ের মতো বাবার সঙ্গে হয়তো সবসময় আড্ডা দেওয়া বা অনুভূতি প্রকাশ করা হয় না, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাদের কিছু বলতেও হয় না; সন্তানের না বলা কথা তারা নিমিষেই বুঝে নেন। নিজের শত শখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে, দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে তারা আমাদের প্রতিটি আবদার হাসিমুখে পূরণ করেন। নিজে না খেয়েও সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার যে নিরলস চেষ্টা, তা অভাবনীয়। শিক্ষা, ক্যারিয়ার কিংবা জীবনের যে কোনো কঠিন সিদ্ধান্তে বাবার নীরব সমর্থনই সন্তানের সবচেয়ে বড় শক্তি। নিজের সব চাওয়া-পাওয়া ভুলে শুধু সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আত্মত্যাগ করা একজন বাবাই হতে পারেন জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
Advertisement
সংসারে সচ্ছলতা আনতে প্রবাসী বাবারা নীরবে নিজেদের সুখ, স্বপ্ন ও পারিবারিক সান্নিধ্য বিসর্জন দেন। প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনে একজন দূরবর্তী বাবার পিতৃত্ব বন্দি থাকে কেবল মুঠোফোনের পর্দায় কিংবা ক্লান্ত রাতের ফোনালাপে। সন্তানের প্রথম হাঁটা, স্কুলে যাওয়া বা সাফল্যের উচ্ছ্বাস সবকিছুই তাকে দেখতে হয় দূর থেকে, যা বুকের গভীরে জন্ম দেয় এক চাপা দীর্ঘশ্বাসের। অন্যদিকে, বাবার সরাসরি স্নেহ ও শাসন ছাড়া বেড়ে ওঠা সন্তানের মনেও তৈরি হয় এক অদৃশ্য শূন্যতা। ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ এই সম্পর্ক সন্তান ও বাবা উভয়ের জন্যই নিদারুণ বেদনার। তবু সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এই বাবারা নিজেদের চোখের পানি লুকিয়ে নিরন্তর লড়াই করে যান। প্রবাসী বাবাদের এই নিঃসঙ্গ রাত, অব্যক্ত কষ্ট আর ত্যাগের গল্পগুলোই দূরবর্তী পিতৃত্বের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি। এই নীরব যোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
একাকী বাবার অন্তহীন লড়াই অন্তি বড়ুয়া, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ‘সিঙ্গেল ফাদার’ বা একা হাতে সন্তান বড় করা বাবাদের নিয়ে সমাজের নানা সংশয় থাকলেও, তারা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গেই সন্তানের দায়িত্ব পালন করেন। একজন সিঙ্গেল ফাদার শুধু সন্তানের যত্ন বা সুশিক্ষাই নিশ্চিত করেন না, বরং সংসার ও কর্মজীবনও দক্ষ হাতে সামলান। এই কঠিন পথচলায় তাদের প্রায়ই সমাজের নানা কটূক্তি ও নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হতে হয়। সবকিছু সামলাতে গিয়ে তারা ক্লান্ত হলেও কখনো হাল ছাড়েন না। সব বাধা পেরিয়ে সন্তানকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য। সিঙ্গেল মাদারের সংগ্রামের মতোই একজন সিঙ্গেল ফাদারের লড়াইও অত্যন্ত কঠিন। তাই আমাদের উচিত তাদের প্রতি সংকীর্ণ মানসিকতা পরিহার করে সম্মান দেখানো। সমালোচনা না করে, বরং এই অদম্য বাবাদের পথচলাকে মসৃণ করতে আমাদের সবার তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।
আরও পড়ুন সন্তানের কাছে বাবা ও বাবা দিবসের গুরুত্ব নিঃসঙ্গ বাবার সঙ্গী হোন রেশমী আকতার, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজকেবল বয়সের ভারে নয়, কর্মজীবন ও দায়িত্বের অবসরেই বাবাদের জীবনের গোধূলিলগ্নের সূচনা হয়। একসময়ের প্রাণবন্ত মানুষটি যখন কর্মহীন হয়ে পড়েন, তখন তার জীবনে নেমে আসে একাকিত্ব। পরিবারের অন্য সদস্যদের দৈনন্দিন ব্যস্ততায় তারা নিজেদের অনেক সময় ঘরের বোঝা মনে করতে শুরু করেন। আমাদের উচিত এই ব্যস্ততার মাঝেই তাদের জন্য কিছুটা সময় বের করা। শৈশবে তারা যেমন আমাদের সময় দিয়েছেন, আজ আমাদেরও তাদের পাশে থাকতে হবে। প্রতিদিন সম্ভব না হলেও অন্তত সকালে একসঙ্গে নাশতা করা, ওষুধের খোঁজখবর নেওয়া বা ছুটির দিনে পরিবার মিলে আড্ডা দেওয়া যেতে পারে। তাদের নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া কিংবা একসঙ্গে খেলা দেখা এই নিঃসঙ্গতা দূর করতে দারুণ ভূমিকা রাখে। বাবারা কখনোই বোঝা নন, তারা আমাদের ঘরের মানিক। ঠুনকো ব্যস্ততার অজুহাতে তাদের দূরে না ঠেলে আসুন ভালোবাসার সঙ্গ দিই। পৃথিবীর সব বটবৃক্ষের শিকড়গুলো ভালো থাকুক।
কেএসকে
Advertisement