আন্তর্জাতিক

‘রবিন হুডকে আশ্রয় দেওয়া’ সেই হাজার বছরের পুরোনো গাছ আর নেই

লোকগাথার রবিন হুডের স্মৃতিবিজড়িত ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত গাছ ‘দ্য মেজর ওক’ মারা গেছে। ইংল্যান্ডের নটিংহামশায়ারের শেরউড ফরেস্টে অন্তত এক হাজার বছর ধরে টিকে থাকা এই বিশাল গাছটি এ বছর কোনো নতুন পাতা গজাতে পারেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তীব্র তাপদাহ ও খরাজনিত চরম আবহাওয়ার কারণে গাছটি অবশেষে প্রাণ হারিয়েছে।

Advertisement

শেরউড ফরেস্টের এই ওক গাছটিকে দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার দর্শনার্থী ভিড় করতেন। প্রায় ১১ মিটার চওড়া কাণ্ড এবং ২৮ মিটার বিস্তৃত উপরিভাগের এই বিশাল গাছটিকে ঘিরে ডালপালা মেলেছে অসংখ্য লোককাহিনী।

আরও পড়ুন জঙ্গল থেকে উদ্ধার সেই ‘মোগলি কন্যা’ আর নেই!

জনশ্রুতি রয়েছে, নটিংহামের অত্যাচারী শেরিফের হাত থেকে বাঁচতে রবিন হুড এবং তার দলবল এই গাছের খোঁড়লেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২০১০ সালের শীতকালে গাছটির ওপর বরফ জমে কাণ্ডে এক অলৌকিক অবয়ব তৈরি হয়েছিল, যা দেখতে অবিকল রবিন হুডের সহযোগী ‘ফ্রিয়ার টাক’-এর মতো লেগেছিল।

তবে গাছটির এই দীর্ঘ জীবনের স্বাভাবিক সমাপ্তি এগিয়ে এনেছে সাম্প্রতিক সময়ের তীব্র তাপদাহ এবং মানুষের অতি-আগ্রহ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট তাপদাহ ও খরায় গাছটি দীর্ঘদিন ধরে সংকটে ছিল, বিশেষ করে ২০২২ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাজ্যের রেকর্ড ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ধকল গাছটি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

Advertisement

গাছটির মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর শেরউড ফরেস্টে রবিন হুডের পোশাকে এক ব্যক্তি এসে গাছটির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা দর্শনার্থীরাও গাছটির পাশে দাঁড়িয়ে শোক প্রকাশ করছেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৯০ সালে স্থানীয় ইতিহাসবিদ মেজর হেইম্যান রুকের নামানুসারে এই গাছটির নামকরণ করা হয় ‘মেজর ওক’। তখন থেকেই এটি পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ গাছটি দেখতে যেতেন। ১৯৭০-এর দশকে গাছের চারপাশে সুরক্ষাবেষ্টনী দেওয়া হলেও এর আগেই দর্শনার্থীদের অতিরিক্ত আনাগোনায় মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়া এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শেরউড ফরেস্ট সামরিক ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় গাছটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

গাছটিকে বাঁচানোর জন্য মানুষের নেওয়া কিছু অতীত পদক্ষেপও এর দীর্ঘায়ুর জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে। ১৯০৪ সালে এর ডালপালাকে ধরে রাখতে শিকল ও ধাতব খুঁটি ব্যবহার করা হয়। ১৯৬০-এর দশকে গাছের ফাঁপা অংশগুলো কংক্রিট দিয়ে ভরাট করা হয় এবং ডালে ফাইবার গ্লাস ও ফায়ার-রিটার্ডেন্ট পেইন্ট ব্যবহার করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা এখন মনে করছেন, এসব কৃত্রিম খুঁটি ডালপালাকে ধরে রাখলেও গাছের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছিল। প্রকৃতিগতভাবে প্রাচীন ওক গাছ ডালপালা ঝরিয়ে কাণ্ডের দিকে গুটিয়ে আসে, যাতে বেঁচে থাকার জন্য কম পানি ও পুষ্টির প্রয়োজন হয়। কিন্তু মানুষের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপে গাছটি সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হারায়।

Advertisement

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ানকেএএ/