একুশে বইমেলা

শেষ: মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগময় উপন্যাস

উম্মে চৈত্রিকা

Advertisement

জুনায়েদ ইভানের ‘শেষ’ একটি মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগময় উপন্যাস। যেখানে জীবনের প্রতি টান, প্রণয়, অতীতের ক্ষত, বন্ধুত্ব, সম্পর্কের ভাঙন এবং পরিণতি সূক্ষ্মভাবে ফুটে উঠেছে। লেখক ও গায়ক জুনায়েদ ইভান যথেষ্ট সুন্দরভাবে চরিত্র ও কাহিনিকে উপস্থাপন করেছেন। উপন্যাসটি পড়ার সময় চরিত্রগুলোকে একদম জীবন্ত মনে হয়েছে। আমার ধারণা, তার লেখার সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের লেখার সামঞ্জস্য বিদ্যমান। লেখার ধরনও তেমনই। সমাপ্তিও প্রায় একই ধরনের। গল্প শুরু হয় হাসান ও তার বন্ধু শিহাবের কথোপকথনে মধ্য দিয়ে। আত্মহত্যার চিঠি লিখেও কেন হাসান আত্মহত্যা করবে না, তার রহস্যই এগিয়ে নিয়ে যায় প্রথমদিকের কাহিনি। সম্পূর্ণ গল্প‌ জানতে ফিরে যেতে হবে অতীতে, কয়েক বছর আগে বৃষ্টিভেজা স্টেশনে হাসান ও নিতুর প্রথম দেখা থেকে শুরু করে নিতুর অতীত, রুদ্রের মানসিক ভাঙন, চিঠি, প্রণয়, আত্মহত্যা ও‌ বিচ্ছেদ জুড়েই আছে ভীষণ বেদনা ও অনুশোচনাবোধ।

রুদ্রের শেষ চিঠি এবং তা লুকিয়ে রাখার ফলে সৃষ্ট অনুশোচনা গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নিতু ও হাসান বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, পরবর্তীতে তারা দুজন কি এক হতে পেরেছিল? জানতে হলে বইটি অবশ্য পাঠ্য। সুতরাং বইটি পড়ুন। কেননা লেখক কাহিনির ভেতরে ছড়িয়ে দিয়েছেন বেশ কিছু চমৎকার উক্তি:

আরও পড়ুন বই আলোচনা / প্র_সৃষ্টি ও সুন্দর : সিঙ্কহোল: শব্দ মানেই ভাষা সকল মানসিক দুর্বলতার মধ্যে জীবনের প্রতি ভালোবাসা সবচেয়ে শক্তিশালী। পৃথিবীতে সবাই মরার জন্য আত্মহত্যা করে না। কেউ কেউ বাঁচার জন্য করে। একজনের শূন্যস্থান কখনাে অন্যজন পূরণ করতে পারে না। শূন্যস্থানের নিচে যেমন দাগ থাকে; তেমনি অন্তরেও থাকে। একজন মৃত বাদশার চেয়ে জীবিত ভিখারির মূল্য অনেক বেশি। মিথ্যার চেয়েও ভয়ংকর হলাে অর্ধেক সত্য। কারণ সেটাকে সত্য থেকে আলাদা করা যায় না। ডুবন্ত মানুষ ডুবে যাওয়ার সময় ঘর-কুঠুরি যা পায়, তাই আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে। একা মানুষের কোনাে পিছুটান থাকে না, কথাটা আসলে সঠিক না। জীবনের প্রতি ভালােবাসা হলাে সব চাইতে বড়াে পিছুটান। যারা মিথ্যা বলতে পারে আর যারা চোখের দিকে তাকিয়ে সত্য বলতে পারে, এই দুই দল মানুষের কোনো সমস্যা হয় না। পৃথিবীতে যেখানে সুখ আছে, ঠিক সেখানেই নিষেধ আছে। একটা সুখ মানেই একটা নিষেধ অমান্য করার ফল। যত সহজে একটা দুঃখ শেষ হয়ে গেলে অন্য একটা দুঃখের জন্ম হয়। তত সহজে একটা সুখ শেষ হবার পর অন্য একটা সুখ ফিরে আসে না।

সম্পূর্ণ বইজুড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সক্রেটিস, সফোক্লিস প্রমুখের ভাবনা ও উদ্ধৃতি গল্পকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছে। নিতু নামের এক নির্লিপ্ত, কঠোর অথচ ব্যক্তিত্ববান নারী চরিত্র ‘শেষ’ বইয়ের বিশেষত্ব। ‘শেষ’ কেবল একটি লেখা কিংবা গল্প নয় বরং হারানো সম্পর্ক, অনুশোচনা, ভুলভ্রান্তি ও জীবনের অর্থ খোঁজারও এক বিশেষ যাত্রা।

Advertisement

আরও পড়ুন বই আলোচনা / লা নুই বেঙ্গলী: ব্যর্থ প্রেমের অমর শোকগাথা

লেখক গল্পের ভাঁজে কিছু চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক জীবনমুখী টুকরাে টুকরাে লেখা সংযােজন করছেন। গল্পের চরিত্রগুলাে এবং লেখকের গল্প বলার বাচনভঙ্গি বেশ সুদৃঢ় ছিল। ‘শেষ’ রহস্যময় একটা বই, রহস্য উন্মােচন করতে অবশ্যই গল্পের সামনে এগােতে হবে এবং গল্পের চরিত্রগুলােকে উপলব্ধি করতে হবে। বইজুড়ে ছিল দীর্ঘশ্বাস, বেদনা, ঘাের এবং শেষমেশ একরাশ আফসােস।

লেখক অত্যন্ত সাবলীল, সুচারুভাবে গল্প এবং গল্পের চরিত্রগুলােকে সাজিয়েছেন। সর্বোপরি, আমার কাছে বইটি ভালাে লেগেছে। যারা মননশীল ও কঠিন ব্যক্তিত্বের অধিকারী নারী চরিত্র পছন্দ করেন; তাদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য। আমি বইটির বহুল পাঠ ও প্রচার কামনা করছি।

বই: শেষলেখক: জুনায়েদ ইভানপ্রকাশক: কিংবদন্তী পাবলিকেশন প্রচ্ছদ: সঞ্চিতা দাশ সৃষ্টিমূল্য: ৩৫০ টাকা।

এসইউ

Advertisement