খেলাধুলা

যে রাত নেইমারকে ভেঙে দিয়েছিল

বিশ্বকাপ জেতা হয়নি। ব্যালন ডি’অরও নয়। পরিসংখ্যান বলবে, নেইমার ছিলেন ব্রাজিলের সর্বকালের অন্যতম সেরা; কিন্তু যারা তাকে খেলতে দেখেছে, তারা জানে- সংখ্যা দিয়ে নেইমারকে মাপা যায় না।

Advertisement

ফুটবলের ইতিহাসে কিছু খেলোয়াড় আছেন, যাদের ক্যারিয়ার ট্রফির চেয়ে বেশি মনে থাকে তাদের অসমাপ্ত সম্ভাবনার জন্য। নেইমার সেই তালিকার একেবারে ওপরের দিকে।

একটা সময় মনে হতো, রোনালদো-মেসির যুগ শেষ হলে ফুটবলের সিংহাসনে বসবেন তিনিই। বার্সেলোনার জার্সিতে ডিফেন্ডারদের নাচিয়ে, ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে পুরো একটা দেশের স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে ছুটে চলা ছেলেটাই হবে আগামী দশকের মুখ।

কিন্তু ফুটবল সব সময় সবচেয়ে সুন্দর গল্পটা লেখে না। রিয়াল মাদ্রিদ তাকে বেশি অর্থের প্রস্তাব দিয়েছিল। ব্রাজিলিয়ান তারকাদের স্বপ্নের গন্তব্যও ছিল সেটি; কিন্তু নেইমার অন্য পথ বেছে নিয়েছিলেন। কারণ একটাই- ‘আমি মেসির সঙ্গে খেলতে চাই।’ সেই সিদ্ধান্ত থেকেই জন্ম নিয়েছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগগুলোর একটি- এমএসএন। মেসি, সুয়ারেজ, নেইমার।

Advertisement

২০১৪ থেকে ২০১৬- মাত্র দুই-তিন বছরে তারা জিতেছিল নয়টি শিরোপা। দুটি লা লিগা, তিনটি কোপা দেল রে, একটি চ্যাম্পিয়নস লিগসহ অসংখ্য ট্রফি। প্রতিপক্ষ জানত, এই তিনজনের কাউকে থামানো গেলেও বাকিরা ম্যাচ বের করে আনবে।

নেইমারের যখন গোলখরা চলছিল। মেসি নিজের পেনাল্টি ছেড়ে দিয়েছেন তাকে। ফ্রি-কিক নিতে দিয়েছেন। সুযোগ পেলেই অ্যাসিস্ট করেছেন। এমনকি একবার নিজের নিশ্চিত গোলের সুযোগ ছেড়ে পেনাল্টি থেকে বল বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সুয়ারেজকে, যেন সতীর্থ গোল পান।

পরে যখন নেইমারের মনে হলো, মেসির ছায়ায় থাকলে ব্যালন ডি'অর জেতা যাবে না, তখনও মেসি তাকে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। নেইমার শেষ পর্যন্ত চলে যান পিএসজিতে।

হয়তো সেদিনই বদলে গিয়েছিল ফুটবল ইতিহাসের একটি সম্ভাব্য অধ্যায়। তবু সবচেয়ে বড় মোড়টা আসেনি তখন। এসেছিল ২০১৪ সালের ৪ জুলাই। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। ব্রাজিল বনাম কলম্বিয়া। পুরো দেশের স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে খেলছিলেন ২২ বছরের নেইমার। তখন পর্যন্ত চার গোল করে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় তিনি। ম্যাচের ৮৮তম মিনিট।

Advertisement

কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার হুয়ান কামিলো জুনিগা পেছন দিক থেকে হাঁটু তুলে আঘাত করেন নেইমারের কোমরের নিচে। ধাক্কায় মাটিতে পড়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন তিনি।

পরীক্ষায় ধরা পড়ে- মেরুদণ্ডের তৃতীয় লাম্বার ভার্টিব্রা ভেঙে গেছে। মাত্র দুই সেন্টিমিটার এদিক-ওদিক হলে ক্যারিয়ার তো দূরের কথা, হয়তো সারাজীবনের জন্য পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যেতে পারতেন। বিশ্বকাপ শেষ। স্বপ্ন শেষ। নেইমার হাসপাতালের বিছানায়, আর ব্রাজিল কয়েক দিন পর জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত।

অনেকে বলেন, নেইমার পরে তো খেলেছেন। চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলেছেন, অলিম্পিক জিতেছেন, গোলও করেছেন। হ্যাঁ, খেলেছেন; কিন্তু সেই আগের নেইমার আর কখনো ফিরে আসেননি। কলম্বিয়ার সেই আঘাতের পর থেকেই তার শরীর যেন ভঙ্গুর হয়ে গেল। বারবার গোড়ালির লিগামেন্ট ছিঁড়েছে। মেটাটারসাল ভেঙেছে। হ্যামস্ট্রিং ছিঁড়েছে। অ্যাডাক্টর ইনজুরি। লিগামেন্ট সমস্যা। এরপর ২০২৩ সালে হাঁটুর এসিএল ছিঁড়ে প্রায় এক বছর মাঠের বাইরে।

প্রতিবারই মনে হয়েছে, এবার ফিরবেন আগের মতো। প্রতিবারই কিছুদিন পর আবার নতুন চোট। শরীর যেন আর কখনো তাকে পুরোপুরি বিশ্বাসঘাতকতা করা বন্ধ করেনি।

ফুটবলারদের জীবনে একটি বড় আঘাত অনেক সময় কেবল একটি ইনজুরি থাকে না; সেটি বদলে দেয় শরীরের ভারসাম্য, চলার ধরন, আত্মবিশ্বাস, এমনকি প্রতিপক্ষের আচরণও। নেইমারের ক্ষেত্রেও কলম্বিয়ার সেই রাত ছিল ঠিক তেমনই এক মোড়।

২০২১ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালের পর একটা ছবি ভাইরাল হয়েছিল। আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন। মেসি কাঁদছেন। নেইমারও কাঁদছেন। কিন্তু পরাজিত আর বিজয়ী- এই দুই পরিচয়ের বাইরে তারা ছিল শুধু দুই বন্ধু। ড্রেসিংরুমের সিঁড়িতে বসে হাসছিলেন দুজন। নেইমার একবার মাথা রেখেছিলেন মেসির কাঁধে। সেই ছবিতে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার শত বছরের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও যেন হার মেনেছিল বন্ধুত্বের কাছে।

আজ নেইমার আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলেছেন। ব্রাজিলের জার্সিতে বিশ্বকাপ অধরাই রয়ে গেল। ব্যালন ডি'অরও এল না। কিন্তু তার রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো কোনো ট্রফির চেয়ে ছোট নয়। রোনালদিনহোর পর যে ব্রাজিলিয়ানকে দেখে কোটি কোটি মানুষ আবার জোগো বনিতার প্রেমে পড়েছিল, তিনি নেইমার।

যে ছেলেটা অসম্ভব ড্রিবলকে স্বাভাবিক বানিয়ে ফেলেছিল, সে নেইমার। যে নিজের আনন্দ দিয়ে পুরো স্টেডিয়ামকে সংক্রামিত করত, সে নেইমার। হয়তো ইতিহাস তাকে বিচার করবে ট্রফি দিয়ে। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীরা মনে রাখবে অন্য কারণে। কারণ তারা জানে, প্রতিভা আর অর্জন সব সময় সমানুপাতিক হয় না। কখনো কখনো একটি আঘাত শুধু একটি হাড় ভাঙে না- ভেঙে দেয় একটি যুগের সম্ভাবনাকেও।

কলম্বিয়ার বিপক্ষে সেই রাতটা শুধু একটি বিশ্বকাপ থেকে নেইমারকে ছিটকে দেয়নি। হয়তো সেদিনই হারিয়ে গিয়েছিল সেই নেইমার, যাকে ফুটবল একদিন মেসি-রোনালদোর উত্তরসূরি হিসেবে দেখেছিল। আর তাই নেইমারের গল্পটা ট্রফির নয়। এটা অসমাপ্ত স্বপ্নের গল্প। এটা প্রতিভার গল্প। এটা এমন এক রূপকথার গল্প, যার শেষটা সুখের হয়নি কিন্তু তার সৌন্দর্য কখনো ম্লান হবে না।

টিটিটি/আইএইচএস