কাজী সাঈদ
Advertisement
বঙ্গোপসাগর আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে। এ সাগরকে ঘিরে রয়েছে সুনীল অর্থনীতির অফুরন্ত সম্ভাবনা। বিশ্বব্যাপী ‘ব্লু-ইকোনমি’ এখন উন্নয়নের নতুন দিগন্ত। মৎস্যসম্পদ, নৌপথ, পর্যটন, খনিজ সব মিলে এ সাগরকে করেছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক বিশাল ভান্ডার। বাংলাদেশের লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এ সম্পদ আহরণের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে উপকূলের জেলেদের জীবন ও জীবিকা নির্ভর করে বঙ্গোপসাগরের মাছ ধরার ওপর।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এ সম্ভাবনার ভান্ডার আজ হুমকির মুখে। সমুদ্রে মাছ ধরার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে নানা ধরনের নিষিদ্ধ জাল। যার মধ্যে বেহুন্দিজাল, গড়াজাল, বেড়জাল, নেটজাল, মশারিজাল, ধরাজাল, কারেন্টজাল উল্লেখযোগ্য। বেহুন্দিজাল ব্যবহৃত হচ্ছে খালে, নদীতে, নদীর মোহনা থেকে গভীর সমুদ্র পর্যন্ত। ছোট ডিঙি নৌকা থেকে শুরু করে ট্রলিং ট্রলার এ জাল ব্যবহার করছে। গড়াজাল ও বেড়জাল উপকূলের নদ-নদীতে ও সমুদ্রের তীরবর্তী এলাকায় পেতে মাছ ধরা হচ্ছে। নেটজাল দ্বারা বেহুন্দি তৈরি করে বাগদা চিংড়ি রেনু ধরা হচ্ছে। ধরাজাল দিয়ে বড় চিংড়ি ধরছে জেলেরা। মশারি জাল দিয়ে বেহুন্দি তৈরি করে মাঝারি-ছোট চিংড়ি ও ভুলা চিংড়ি ধরছেন এক শ্রেণির জেলে। কারেন্ট জাল দিয়ে ফাইসা, টেংরা, পোয়াসহ নানা প্রজাতির মাছ শিকার করছেন উপকূলের মৎস্যজীবীরা।
অধিকাংশ ট্রলার ছোট ফাঁসের (দুই ইঞ্চি, সোয়া দুই ইঞ্চি, আড়াই ইঞ্চি, পৌনে তিন ইঞ্চি, তিন ইঞ্চি) জাল নিয়ে সমুদ্রে যাচ্ছে। অথচ সর্বনিম্ন সোয়া তিন ইঞ্চি জাল ব্যবহার করা উচিত। এ ছাড়া উপকূলের খালে-বিলে ব্যবহৃত হচ্ছে আটনজাল, বুচনাজাল ও চায়নাদুয়ারী জাল। বাহারি নামের এ জাল ব্যবহার পুরোপুরি বিধ্বংসী। এ ধরনের জালে ছোট-বড় সব মাছ আটকা পড়ে। ফলে ডিমওয়ালা মা মাছ কিংবা পোনা রক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য একেবারেই ভেঙে যাচ্ছে।
Advertisement
এসব জাল খুব ঘন হওয়ায় ছোট এবং ডিমওয়ালা মাছসহ সামুদ্রিক বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী জালে আটকে মারা যায়। ছোট মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পায় না এবং মা মাছ ধরার কারণে মাছের প্রজনন চক্র বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে মাছের উৎপাদন হ্রাস পায়। দীর্ঘমেয়াদে মাছের পরিমাণ কমে গেলে সাধারণ জেলে পরিবার অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু তাই নয়, পোনা ও বিভিন্ন স্তরের প্রাণী হ্রাস পাওয়ায় জলজ খাদ্য শৃঙ্খল নষ্ট হয়ে যায় এবং সামগ্রিকভাবে পরিবেশের ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে আইনের মাধ্যমে এ ধরনের জাল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কিন্তু বাস্তবে এর ব্যবহার থামানো যায়নি। মাছ ধরার মৌসুমে উপকূলজুড়ে হাজারো ট্রলার ও ডিঙ্গি নৌকা সমুদ্রে নামে। তাদের অনেকেই অল্প খরচে বেশি মাছ ধরার আশায় এ বাহারি নামের জাল ব্যবহার করছেন। এতে স্বল্পমেয়াদে হয়তো কিছু লাভ হচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির বোঝা বহন করতে হচ্ছে পুরো জাতিকে। কারণ এভাবে চলতে থাকলে আমাদের সমুদ্র শূন্য হয়ে পড়বে।
প্রতি বছর বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসছে ছোট পোনা ধরা থেকে। অথচ এ পোনা বড় হতে না হতেই নিষিদ্ধ জালে নিধন হচ্ছে। শুধু মাছ নয়; কাঁকড়া, ডলফিন, সামুদ্রিক কাছিম, সাপ, পোকামাকড়, শৈবাল, প্রবাল কিংবা অন্যান্য বিরল প্রাণীও আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের সাথে সাথে পরিবেশগত ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার ব্যাহত হচ্ছে; অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়ছে বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য।
আরও পড়ুনউন্নত দেশের কৃষি থেকে আমরা যা শিখতে পারিপ্রকৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
Advertisement
সরকারি আইন অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকেই বেহুন্দিজালসহ অতি সূক্ষ্ম ফাঁসযুক্ত জাল নিষিদ্ধ। তবুও উপকূলের দোকানে এ জাল প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি ক্রেতাদের জন্য ট্রাকে বা নৌকায় করে নিষিদ্ধ জাল পৌঁছে দেওয়া হয় বিভিন্ন পয়েন্টে। এ সমস্যার মূলে রয়েছে সচেতনতার ঘাটতি এবং আইন প্রয়োগে দুর্বলতা। অনেক জেলে জানেন না এ ধরনের জালের ক্ষতিকর দিক। আবার যারা জানেন, তারাও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বা তদারকির অভাবে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করেন। মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও তা ধারাবাহিক নয়। ফলে অবৈধভাবে তৈরি ও বাজারজাতকরণ সহজেই চলছে। প্রশাসন শেষ কবে নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে, তা দোকানিরা বলতে পারছেন না।
সোনাতলা নদীর তীরে নিজামপুর কোস্টগার্ড স্টেশন। ওই নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে শ’খানেক বেহুন্দিজাল পাতেন জেলেরা। কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সামনে ছোট ফাঁসের খুঁটা জাল পেতে মাছ ধরা হচ্ছে। শেষ কবে নৌ-পুলিশ নিষিদ্ধ জাল জব্দ করে আগুনে পুড়েছে তা আমার মনে নেই। আন্ধারমানিক মোহনা ও রামনাবাদ মোহনা রীতিমতো নিষিদ্ধ জালের রাজধানী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে।
অভিযোগ আছে, মাছ ধরার উপযুক্ত সময়ে অভিযানে যায় না প্রশাসন। প্রশাসনের যোগসাজশে জেলেরা বলে দেন, কবে অভিযানে নামতে হবে। তখন তাদের জাল থাকে নিরাপদ স্থানে। মাঝে মধ্যে কিছু জাল পোড়ানো হয়, তা জেলেদের বাতিল বা পুরোনো জাল। এগুলো জেলেরা ইচ্ছে করেই দেয় প্রশাসনকে।
সুনীল অর্থনীতি রক্ষার স্বার্থে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, স্থানীয় পর্যায়ে জেলেদের সচেতন করতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার আসলে নিজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার শামিল। দ্বিতীয়ত, বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে জেলেরা নিষিদ্ধ জালের ফাঁদে না পড়ে। তৃতীয়ত, প্রশাসনের নজরদারি ও আইন প্রয়োগে কঠোরতা আনতে হবে। অবৈধ জাল তৈরি ও বিক্রির সাথে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বঙ্গোপসাগর শুধু মৎস্যভান্ডারই নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীববৈচিত্র্যের আবাসভূমি। এ সাগরের প্রাণীগুলো একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এক প্রজাতি হারিয়ে গেলে পুরো শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। আর এর প্রভাব সরাসরি এসে পড়বে মানুষের জীবনে, দেশের অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশ এরই মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ও সুনীল অর্থনীতি নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো প্রতিশ্রুতিই কাজে আসবে না। সময় থাকতে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে আগামী প্রজন্ম একটি নিঃস্ব সমুদ্র পাবে, যেখানে থাকবে না মাছ, থাকবে না প্রাণ। সমুদ্র আমাদের নোনা জল দেবে, মনোমুগ্ধকর ঢেউ দেবে, মাছ দেবে না। জেলেরা হারাবে কর্ম, ভেঙে পড়বে উপকূলের অর্থনীতির শৃঙ্খলা।
সাগর আমাদের সম্পদ, আমাদের জীবন। এ সম্পদকে রক্ষা করা মানে আমাদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, অবৈধ জালে বৈধ ক্ষতি হচ্ছে। তাই সব নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি। তাহলেই আমরা সমুদ্রের সুনীল অর্থনীতিকে টেকসই করতে পারবো এবং উপকূলের মানুষের জীবনে সত্যিকারের সমৃদ্ধি আনতে পারবো।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
এসইউ/জেআইএম