মওলবি আশরাফ
Advertisement
আতিয়া মসজিদ টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ারে অবস্থিত চারশ বছরের ঐতিহ্যবাহী আতিয়া মসজিদ। আতিয়া শব্দটি এসেছে আরবি ‘আতা’ থেকে, যার অর্থ দানকৃত। এর পেছনে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ যখন আলি শাহান শাহ বাবা আদম কাশ্মিরিকে টাঙ্গাইল অঞ্চলের জায়গিরদার হিসেবে নিয়োগ দেন, তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য এখানে বসবাস শুরু করেন। সে সময় তার প্রচার-কাজের খরচ নির্বাহের জন্য আফগান নিবাসী কাররানি বংশের শাসক সোলাইমান কররানি সংলগ্ন এলাকা ওয়াকফ হিসেবে দান করেন—এ কারণেই অঞ্চলটির নাম হয় ‘আতিয়া’, অর্থাৎ দানকৃত ভূমি।
পরবর্তীতে বাবা আদম কাশ্মিরির পরামর্শে তার নিবেদিত মুরিদ সাঈদ খান পন্নী ১৬০৮ সালে (১০১৮ হিজরি) বাবা আদম কাশ্মিরির কবরের সন্নিকটে আতিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদের নকশা ও নির্মাণকার্যে যুক্ত ছিলেন সেই সময়ের খ্যাতনামা স্থপতি মুহাম্মদ খাঁ। এ মসজিদটি পরে বিভিন্ন সময়ে দুই দফা সংস্কার করা হয়—প্রথমে রওশন খাতুন চৌধুরাণী ১৮৩৭ সালে, এরপর আবুল আহমেদ খান গজনবি ১৯০৯ সালে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে অধিগ্রহণ করে।
আতিয়া মসজিদ ছবি: মওলবি আশরাফ
Advertisement
আতিয়া মসজিদ খুব বড় নয়। দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ ফুট, চওড়া প্রায় ৪০ ফুট। দেয়ালগুলো অত্যন্ত পুরু—প্রায় সাড়ে ৭ ফুট। দেয়াল দেখে বোঝা যায় মসজিদটি অনেক টেকসই করে বানানো হয়েছিল।
মসজিদের মূল অংশটা একটি বড় গম্বুজ দিয়ে ঢেকে আছে। তার সামনে যুক্ত আছে একটি আয়তাকার বারান্দা, যেখানে তিনটি ছোট গম্বুজ দেখা যায়। আর বারান্দা দিয়ে ভেতরে ঢোকার জন্য তিনটি দরজা—মাঝের দরজাটি অন্য দুটির তুলনায় একটু উঁচু।
বারান্দা থেকে নামাজকক্ষে যাওয়ার তিনটি খিলানপথ আছে। আবার উত্তর ও দক্ষিণ দিকেও দুটি করে দরজা রাখা হয়েছে, যাতে মানুষের চলাচল সহজ হয়।
কেবলার দিকে দেয়ালে তিনটি মেহরাব—মাঝেরটি সবচেয়ে সুন্দরভাবে সাজানো, এবং তার পেছনের দেয়াল সামান্য বাইরে বের হয়ে আছে, যেন আলাদা করে গুরুত্ব বোঝানো যায়।
Advertisement
মসজিদের চার কোণে চারটি অষ্টভুজাকৃতির মিনার (বুরুজ) আছে। প্রতিটি মিনার ধাপে ধাপে নকশা করা, এবং একেবারে ওপরে ছোট গম্বুজ ও কলস আকৃতির অলংকার দেওয়া।
প্রধান গম্বুজটি ভেতরে খিলানভিত্তিক কাঠামোর উপর দাঁড়ানো। সামনে থাকা তিনটি ছোট গম্বুজ একটি ভিন্ন পদ্ধতিতে বানানো—কারিগরি ভাষা দরকার নেই; সহজ করে বললে, এগুলো বানানোর পদ্ধতি মূল গম্বুজ থেকে আলাদা। এক সময় তিনটি গম্বুজের গায়ে বিশেষ নকশা ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে প্লাস্টার করার কারণে তা আর দেখা যায় না। আর বড় গম্বুজটি একসময় ভেঙে পড়েছিল—পরে পুনর্নির্মাণ করা হয়।
আতিয়া মসজিদের অভ্যন্তর ছবি: মওলবি আশরাফ
মসজিদের আসল সৌন্দর্যের জায়গাটা হলো তার বাহিরের দেয়াল। পুরো পূর্ব আর উত্তর দিকজুড়ে টেরাকোটা ও ইটখোদাই—ফুল, লতা, জ্যামিতিক নকশা, রোজেট—অসংখ্য ছোট ছোট কারুকাজ। বাংলার গ্রাম্য কারিগরের নিখুঁত হাতের কাজ এখানে পুরোপুরি ফুটে ওঠে।
এই মসজিদের অন্যতম বিশেষত্ব হলো ধনুকের মতো বাঁকানো কার্নিশ—যেন বাংলার কুঁড়েঘরের ছনের চাল ইটের স্থাপত্যে জায়গা করে নিয়েছে।
পশ্চিম দেয়ালের ওপরে আছে দাঁতাকাটা প্রাকার—দেখতে ঠিক দুর্গপ্রাচীরের মতো।
সব মিলিয়ে বলা যায়—আতিয়া মসজিদের নজরকাড়া সৌন্দর্য তিনটি—
১. ছোট গম্বুজ ও বড় গম্বুজের সমন্বয়
২. দেয়ালজুড়ে টেরাকোটা ও ইটখোদাই নকশা
৩. কুঁড়েঘরের মতো বাঁকানো কার্নিশ
এই মসজিদ বাংলার স্থাপত্যশিল্প, ইতিহাস আর আঞ্চলিক নকশার এক অসাধারণ নিদর্শন। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ টাকা নোটে এই মসজিদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল।
যেভাবে আতিয়া মসজিদে যাবেনঢাকা বা যে কোনো অঞ্চল থেকে প্রথমে টাঙ্গাইল যেতে হবে। টাঙ্গাইল পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থেকে অটোরিকশায় যেতে হবে পাথরাইল বটতলা, তারপর সেখান থেকে রিকশায় বা পায়ে হেঁটে আতিয়া মসজিদে যেতে পারবেন।
ওএফএফ/এমএস