শীতের পোশাক পরা এক নারীকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে তার গায়ে বালতি ও মগ দিয়ে পানি ঢেলে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ হচ্ছে তাকে চুরি করতে দেখা গেছে গুলশানের মারকাযুত তা'লীম আল- ইসলামী মাদরাসার চারতলায় উঠে। নারীর প্রতি সহিংসতার এই ভিডিও ভাইরাল হয়েছে ফেসবুকে। তাতে দেখা যাচ্ছে হেসে হেসে কয়েকজন তার শরীরে পানি ঢালছে। পাশেই কয়েকজন জটলা করে দেখছে, একজন মুঠোফোনে ভিডিও করছে।
Advertisement
আটক ব্যক্তিরা বলেছেন ওই নারীকে পুলিশে সোপর্দ করতে চেয়েছিলেন তারা। কিন্তু এত সকালে ‘পুলিশ কোথায় পাবেন’ সেই চিন্তা করে নারীকে নিজেরাই ‘শাস্তি’ দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ব্যাপারটাই এখন রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশে খবর দেওয়ার আগে, অভিযুক্তের দোষ দেখার আগেই নিজেরাই যে যার মতো শাস্তি দেওয়া শুরু করে। আইন নিজেদের হাতে তুলে নিলে বিচার বিভাগের কী দরকার? কী কারণে মানুষই শাস্তি নির্ধারণ করে দিচ্ছে? দেশে আইন কোথায়?
‘বানিয়াচং থানা জ্বালিয়েছি, এসআই সন্তোষকে পুড়িয়েছি' বলে ওসিকে হুমকি দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাহদীর আটকের ১৪ ঘণ্টা পর জামিন হয়ে গেছে। ওসির কক্ষে ঢুকে মাহদী হাসানকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা জুলাই আন্দোলনকারীরা সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছি। আপনি প্রশাসনের লোক হয়ে আমাদের ছেলেকে গ্রেফতার করেছেন।’
তার বক্তব্যের এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর চারদিক থেকে হইচই শুরু হয়। ভিডিওতে ওই তরুণ মূলত সেই ঘটনারই সরাসরি দায় স্বীকার করেন। পরে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে মাহদী বলেন, থানা জ্বালিয়ে দেওয়ার বক্তব্যটি সঠিক ছিল না। উত্তেজনার বশে ‘মুখ ফসকে’ তিনি এমন মন্তব্য করে ফেলেছিলেন।
Advertisement
অনেকেই বিস্মিত হয়ে মন্তব্য করেছেন যে একজন ছাত্র কীভাবে পুলিশের সামনে বসে এই দম্ভোক্তি করার সাহস পায়? পুলিশ কর্মকর্তারাও চুপ করে তার ওই কথাগুলো শুনেছেন। যাক সে যখন জামিন পেয়েছে, হয়তো আবার সে দাপিয়ে বেড়াতে পারবে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যদি এভাবে কোণঠাসা করে ফেলা হয় ও হুমকি-ধামকির মধ্যে রাখা হয়, তাহলে আইনের শাসন বিপর্যস্ত হতে বাধ্য।
পরপর বেশ কয়েকটি দুর্বৃত্তপরায়ণতার এমন ঘটনা ঘটে গেলো যে আমরা দুঃখপ্রকাশের ভাষাও হারিয়ে ফেলছি। বাড়ির উঠানে সমাহিত করা হলো খোকন দাসকে। সারাদিন দোকানে কাজ করে যখন রাতে বাড়ি ফিরছিলেন খোকন, তার ওপর হামলা করে সন্ত্রাসীরা। তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। মৃত্যুর চারদিন পর বাড়ি ফিরেছে খোকনের প্রাণহীন দেহ। পরিবারের একটাই শান্তি যে খোকন বাড়ির উঠানে শুয়ে আছে।
কিন্তু খোকন দাসের পুরো পরিবার এখন বিপর্যস্ত। মামলা করেও ভয় পাচ্ছেন। অভিযুক্তরা ধরা পড়েছে কিন্তু ফিরে এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেয় কি না, সেটাও একটা ভয়। সংসার চালাবার জন্য একমাত্র জায়গা ছিল ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি, এখন সেটিও বন্ধ। ব্যবসা চালানোর মতো লোকও পরিবারে এই মুহূর্তে নেই। শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার খোকন কেউরভাঙ্গা বাজারে ওষুধ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবসা করতেন।
জানি না খোকনের অপরাধ কী, কেন তাকে হত্যা করা হলো? আমরা এখন আর হত্যার খবরে বিচলিত হইনা। বিচলিত বোধ করি হত্যা করার নৃশংসতা দেখে। একজনকে কোপানোর পর কেন আবার তাকে পুড়িয়ে মারতে হলো? এর পেছনে কারণটা কী? কেন এতো জিঘাংসা মনের ভেতরে? খোকনের স্ত্রী স্বামীর পোড়া ও কোপানো শরীরে কষ্টের কথা ভুলতে পারছেন না। কিছুদিন আগে আদালত ভবনের সামনে রাস্তার পাশে ড্রামে ফেলে রাখা হয়েছিল ২০ টুকরা করে মানুষের দেহ। খোদ রাজধানীর খুব সংরক্ষিত এলাকা বলে পরিচিত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ভেতরে ‘মব’ তৈরি করে পিটিয়ে মারা হলো তরুণ আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে। তিনি পাবনা জেলা জজ আদালতের আইনজীবী ছিলেন।
Advertisement
ঢাকায় কাজে এসে অ্যাডভোকেট নাঈমকে কেন পিটুনিতে প্রাণ দিতে হলো? পুলিশ বলেছে, বসুন্ধরায় ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে হত্যাকারী শনাক্তে কাজ করছেন তারা। ডিডিও ফুটেজে দেখা গেল নাঈমকে মারার সময় আশেপাশে অনেক মানুষ হাঁটাচলা করছেন। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি ঠেকাতে। হাইকোর্ট থেকে একটি মামলায় জামিন নিতে ১০ দিন আগে ঢাকায় এসেছিলেন নাঈম। এখানেও প্রশ্ন উঠেছে বসুন্ধরার মতো জায়গায় কীভাবে প্রকাশ্যে এরকম মব সন্ত্রাস হলো? অপরাধীরা পালিয়ে গেল। একজনকে আটক করা হয়েছে এবং সে স্বীকার করেছে দুই দফায়, দুই জায়গায় নিয়ে নাঈমকে মারা হয়েছে।
এইসব নেতিবাচক ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। সবখানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে এগুলো। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমরা নিজেরা এক ভয়ের পরিবেশে বাস করছি। মানুষে মানুষে বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। আর একজন মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু তার পুরো পরিবারকে বিপর্যস্ত করে। পাশাপাশি ভয়, অন্ধকার ও ভবিষ্যৎ আস্থাহীনতার দিকে নিয়ে যায়।
এরও আগে ময়মনসিংহ জেলার ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস নামে একজন পোশাক শ্রমিককে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় 'ধর্ম অবমাননার' কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে র্যাব। তাহলে কেন নারকীয়ভাবে হত্যা করা হলো? দীপু গাছে ঝুলছে, তার শরীর দাউ দাউ করে পুড়ছে। আর আশেপাশে সবাই দাঁড়িয়ে ওই মর্মান্তিক ঘটনার ভিডিও করছেন।
অন্য একটি ঘটনায় বছরের প্রথম দিনই নারায়ণগঞ্জে যুবককে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। রাজশাহীর বাগমারায় ভয়াবহ নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ভ্যানচালক ওমর ফারুককে। অজ্ঞাতনামা লাশ, হেফাজতে মৃত্যু আর মব ভায়োলেন্স, মানবাধিকারের এই তিন সংকটের মধ্যে আমরা দিন পার করছি। প্রতিদিন একের অধিক অস্বাভাবিক মৃত্যু, কুপিয়ে, পিটিয়ে মারা, আগুন দেওয়ার ও লাশ পোড়ানোর মতো নৃশংসতা দেখা গেছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বাড়ছে।
বাংলাদেশে পিটিয়ে হত্যা করে পুড়িয়ে মারার ঘটনা বাড়ছে কেন? সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনি (মব লিঞ্চিং) এবং পিটিয়ে হত্যার পর লাশ পোড়ানোর ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং অন্যান্য সূত্র অনুসারে, ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ১৯৭ টি। কিছু প্রতিবেদনে অাগস্ট ২০২৪ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৬৩৭টির মতো ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর আস্থা না রেখে মানুষ নিজেরাই 'বিচার' করছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ও মানুষের মুখে মুখে দ্রুত গুজব ও ভুল তথ্য ছড়ানোর কারণে অনেক ঘটনা ঘটছে। যেমন, চুরি/ছিনতাই/ডাকাতি সন্দেহে বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে (যার প্রমাণ প্রায়শই পাওয়া যায় না) মানুষকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত শত্রুতার জের ধরে উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে।
সরকার এসব ঘটনার নিন্দা করেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে অভিযুক্তকে কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। অভিযুক্ত আসামি যখন আটকের ২৮ ঘন্টার মধ্যে জামিন পেয়ে যায়, তখন অপরাধীরা ডেসপারেট হয়ে ওঠে। এইসব ঘটনার বৃদ্ধি সমাজে অসহিষ্ণুতা এবং প্রতিহিংসার প্রতিফলন।
গণপিটুনির ঘটনা বৃদ্ধি নিয়ে মনোবিজ্ঞানী এবং সামাজিক মনোবিজ্ঞানের গবেষকরা কয়েকটি মূলতত্ত্ব ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অস্থিরতা, গুজব এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি এগুলোকে আরও তীব্র করেছে।
ভিড়ের মধ্যে মানুষ নিজের ব্যক্তিগত পরিচয় এবং দায়বোধ হারিয়ে ফেলে। এতে স্বাভাবিক নৈতিকতা কমে যায় এবং দলের সাথে মিশে অনেক বেশি সহিংস আচরণ করে।
চার্লস-মারি গুস্তাভ ল্য বোঁন ছিলেন একজন প্রখ্যাত ফরাসি বহুমুখী পণ্ডিত (পলিম্যাথ)। তিনি মূলত তাঁর ১৮৯৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘The Crowd: A Study of the Popular Mind’– এর জন্য খুব পরিচিত, যেখানে ভিড়ের মধ্যে মানুষের মন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, ভিড়ে "গ্রুপ মাইন্ড" তৈরি হয়, যেখানে ব্যক্তি নিজের চিন্তা বাদ দিয়ে গ্রুপের বা দলের আবেগে ভেসে যায়। দল যা করে, ব্যক্তিও তাই করে। মার্কিন মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ফিলিপ জিম্বার্ডো এর মতে, অ্যানোনিমিটি (নামহীনতা) এবং গ্রুপ প্রেশার মানুষকে নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলে।
বাংলাদেশে দেখা যায় গুজবের (যেমন ছেলেধরা বা ধর্ম অবমাননা) কথা ছড়িয়ে দেওয়ার পর, ভিড় হয় এবং সবাই তখন একসাথে আক্রমণ করে। কগনিটিভ সাইকোলজির দৃষ্টিকোণ থেকে, ভিড়ে ব্যক্তির যুক্তিবোধ গ্রুপের আবেগের কাছে হার মানে। ফলে অযৌক্তিক অভিযোগে (যেমন মানসিক রোগী বা নিরীহ ব্যক্তিকে চোর সন্দেহে পেটানো) সহিংসতা ঘটে।
্রএ ধরনের ঘটনার বৃদ্ধিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্রেকডাউন বলছেন কেউ কেউ। সমাজে বিদ্যমান গভীর বিভাজন, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সামাজিক শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার ভেঙে পড়া, যেখানে জাতি, ধর্ম, অর্থ-সামাজিক অবস্থা, লিঙ্গ বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে বিভাজন বাড়ে এবং সামাজিক সম্পর্ক ও প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকারিতা হারায়, যা সভ্যতার পতন বা বড় ধরনের সামাজিক পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এটি কোনো সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক আচরণ নয়। বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতি (ভিড়, গুজব,অস্থিরতা) এতে ভূমিকা রাখে। প্রতিরোধে দরকার আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, গুজব নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। এ ধরনের সহিংসতা সমাজে দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা সৃষ্টি করে এবং অসহিষ্ণুতা বাড়ায়।
এইসব নেতিবাচক ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। সবখানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে এগুলো। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমরা নিজেরা এক ভয়ের পরিবেশে বাস করছি। মানুষে মানুষে বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। আর একজন মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু তার পুরো পরিবারকে বিপর্যস্ত করে। পাশাপাশি ভয়, অন্ধকার ও ভবিষ্যৎ আস্থাহীনতার দিকে নিয়ে যায়। ৬ জানুয়ারি, ২০২৬
লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।
এইচআর/এমএস