সপ্তাহের প্রতিটি রোববার এলেই আলাদা রূপ নেয় টঙ্গী বাজার এলাকা। ভোর গড়াতেই আশপাশের গ্রাম, এমনকি দূরদূরান্ত থেকেও বিক্রেতা আর ক্রেতাদের ভিড়ে সরগরম হয়ে ওঠে এখানে বসা কবুতর, পাখি ও হাঁস-মুরগির সাপ্তাহিক হাট। রঙিন পালক, ডানা ঝাপটানোর শব্দ আর ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম সব মিলিয়ে এই হাট যেন প্রাণবন্ত এক গ্রামীণ অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি।
Advertisement
হাটের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি খাঁচা। কোথাও কবুতরের দল, কোথাও দেশি ও বিদেশি পাখি, আবার কোথাও ঝাঁকে ঝাঁকে হাঁস আর মুরগি। তবে শীত মৌসুম এলেই দৃশ্যটা খানিকটা বদলে যায়। অন্য সব পাখির পাশাপাশি তখন সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে হাঁস। শীতের হাসের চাহিদা বাড়ায়, এই সময় হাঁস বিক্রির ধুম পড়ে যায় পুরো হাটজুড়ে।
Advertisement
হাটে আসা বিক্রেতারা বলছেন, শীত মৌসুমে হাঁসের মাংসের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে। অনেকের বিশ্বাস, হাঁসের মাংস শরীর গরম রাখে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। আবার গ্রামবাংলার রান্নায় শীত মানেই হাঁসের ঝোল, হাঁসের ভুনা কিংবা বিশেষ উৎসবের খাবার। এসব কারণেই শীত এলেই হাঁসের বাজার চাঙা হয়ে ওঠে।
একজন বিক্রেতা জানালেন, অন্য সময় যেখানে সপ্তাহে ১০–১৫টি হাঁস বিক্রি হতো, শীতে সেখানে বিক্রি বেড়ে যায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি। আকার ও জাতভেদে হাঁসের দাম নির্ধারিত হলেও ভালো, বড় ও স্বাস্থ্যবান হাঁসের জন্য ক্রেতারা বাড়তি দাম দিতেও রাজি থাকেন। ফলে এই সময়টায় হাঁস বিক্রি করে কিছুটা ভালো লাভের মুখ দেখেন অনেক খামারি ও ছোট ব্যবসায়ী।
Advertisement
রোববারের হাট মানেই শুধু কেনাবেচা নয়, এখানে দরদামের এক আলাদা সংস্কৃতি আছে। ক্রেতা হাঁস হাতে নিয়ে ওজন মাপছেন, দাঁত দেখে বয়স আন্দাজ করছেন, আবার কেউ পালক উল্টে স্বাস্থ্য যাচাই করছেন। বিক্রেতা নিজের হাঁসের গুণাগুণ তুলে ধরছেন কতদিনের, কী খেয়েছে, কত ওজন হবে রান্নার পর। দরদাম চলে কয়েক মিনিট থেকে কখনো কখনো আধা ঘণ্টা পর্যন্ত।
এই দরকষাকষির মধ্যেই তৈরি হয় এক ধরনের সামাজিক যোগাযোগ। অনেক ক্রেতা প্রতি সপ্তাহে একই বিক্রেতার কাছেই আসেন। বিশ্বাস আর পরিচয়ের জায়গা থেকে দামেও কিছুটা ছাড় মেলে। আবার নতুন ক্রেতা এলে বিক্রেতারা চেষ্টা করেন ভালো ব্যবহার আর যুক্তি দিয়ে বিক্রি নিশ্চিত করতে।
যদিও শীতে হাঁসের আধিপত্য বেশি, তবু কবুতর আর নানা জাতের পাখির কদর কমে না। শখের কবুতর পালনকারীরা নিয়মিত এই হাটে আসেন নতুন জাত খুঁজতে। কেউ কেউ আবার কবুতর কেনেন মাংসের জন্য। রঙিন বাজরিগার, লাভবার্ড কিংবা দেশি পাখিও দেখা যায় কিছু খাঁচায়। শিশু-কিশোরদের ভিড় বেশি থাকে এসব পাখির সামনে।
এক বিক্রেতা বললেন, শখের পাখির বাজারটা তুলনামূলক স্থিতিশীল। মৌসুম বদলালেও যারা পাখি ভালোবাসেন, তারা নিয়মিতই কিনে থাকেন। তবে শীতের সময় হাঁস-মুরগির তুলনায় পাখির দিকে একটু কম নজর পড়ে। কারণ তখন বেশিরভাগ ক্রেতার লক্ষ্য থাকে খাবারের বাজার।
এই সাপ্তাহিক হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; অনেক মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ছোট খামারি, মধ্যস্বত্বভোগী, খাঁচা বানানো কারিগর, খাবার বিক্রেতা, সবারই কোনো না কোনোভাবে আয় হয় এই হাটকে ঘিরে। সপ্তাহে একদিন হলেও এই বাজার বহু পরিবারের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
শীত মৌসুমে হাঁসের ভালো দাম পাওয়ায় খামারিরা আগেভাগেই প্রস্তুতি নেন। কেউ বাড়িতে হাঁস পালন করেন, কেউ আবার অন্য এলাকা থেকে হাঁস কিনে এনে এখানে বিক্রি করেন। ফলে পুরো একটি ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয় এই রোববারের হাটকে কেন্দ্র করে।
টঙ্গীর এই সাপ্তাহিক হাট আসলে গ্রামীণ ঐতিহ্যেরই শহুরে রূপ। আধুনিক শহরের কোলাহলের মাঝেও এখানে এখনো টিকে আছে খোলা দরদাম, মুখোমুখি বেচাকেনা আর বিশ্বাসের সম্পর্ক।
শীতের সকালে হাঁসের ডাক, কবুতরের ডানা ঝাপটানো আর মানুষের কণ্ঠে দরকষাকষির শব্দ, সব মিলিয়ে এই হাট যেন এক জীবন্ত দৃশ্যকাব্য।
রোববার এলেই তাই টংগীর এই হাটে ভিড় জমে যায়। আর শীত নামলেই সেই ভিড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে হাঁস। বাজারের এই চেনা চিত্র শুধু কেনাবেচার গল্প নয়, বরং মানুষের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস আর মৌসুমি বাস্তবতার এক বাস্তব প্রতিফলন।
জেএস/