ধর্ম

ইবনে খাল্লিকান ও তার অমর গ্রন্থ ওফায়াতুল-আ’য়ান

আহমাদ সাব্বির

Advertisement

ইতিহাসচর্চায় মুসলমানদের অবদান যে বিশ্বসভ্যতার অমূল্য সম্পদ—এ কথা আজ আর গবেষকসমাজের বিতর্কের বিষয় নয়। বিশেষত চরিতাভিধান বা জীবনীগ্রন্থ রচনায় মুসলিম মনীষীরা যে উচ্চমান ও বিস্তৃত পরিসরের কাজ করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ। এই ধারায় কাজ করে যারা নিজেদের উৎসর্গ করে গেছেন, তাদের মধ্যে শামসউদ্দীন ইবনে খাল্লিকান নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ আসনে অধিষ্ঠিত। তিনি শুধু একজন ইতিহাসবিদ নন, বরং মুসলিম সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক অনন্য সংরক্ষক।

শামসউদ্দীন ইবনে খাল্লিকানের জন্ম ১২১১ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মিসরের অন্তর্গত ইরবিল বা আরবেলা নগরে। তিনি নিজেকে আব্বাসীয় যুগের প্রখ্যাত উজির ইয়াহইয়া ইবনে খালিদ বারমাকীর বংশধর বলে দাবি করতেন। ঐতিহাসিকভাবে এটি ছিল এক গৌরবময় বংশ, যার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব খেলাফতের স্বর্ণযুগে সুদূরপ্রসারী ছিল। বারমাকী বংশের পতনের প্রায় চার শতাব্দী পর এই বংশে ইবনে খাল্লিকানের মতো এক মনীষীর জন্ম হয়।

শৈশবকালেই ইবনে খাল্লিকান স্থানীয় শিক্ষাকেন্দ্রে আরবি ভাষা ও সাহিত্যে বুৎপত্তি অর্জন করেন। পাশাপাশি কোরআন, হাদিস, ইতিহাস ও দর্শনে গভীর জ্ঞান লাভ করেন। তবে তার প্রকৃত অনুরাগ ছিল ইতিহাস, লোককথা ও মানবজীবনের বিচিত্র কাহিনির প্রতি। এই ঝোঁকই পরবর্তীকালে তাকে একটি মহাকীর্তির দিকে পরিচালিত করে। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি জন্মস্থান ত্যাগ করে আলেপ্পো যান এবং সেখানকার বিদ্যাপীঠে অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি দামেস্কে গমন করেন এবং প্রায় দশ বছরকাল সেখানে জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থাকেন।

Advertisement

দামেস্কে অবস্থানকালেই ইবনে খাল্লিকানের মন ইতিহাসশাস্ত্রের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়। এখানেই তিনি একটি ব্যাপক চরিতাভিধান রচনার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। দামেস্কের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারগুলোতে তিনি অক্লান্তভাবে গবেষণা চালিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। পরবর্তীকালে তিনি কায়রো গমন করেন এবং আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়কে তার গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করেন। সে সময় আল-আজহার ছিল মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানসাধনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, যার গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ছিল অগণিত দুর্লভ ও মূল্যবান পাণ্ডুলিপি।

প্রায় আঠারো বছর ধরে ইবনে খাল্লিকান আল-আজহার ও অন্যান্য গ্রন্থাগারে নিরলস শ্রম দিয়ে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ওফায়াতুল-আ’য়ান’-এর প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করেন। তার এই অধ্যবসায় ও পাণ্ডিত্য তৎকালীন মামলুক সুলতান আল-মালিক আল-জাহির বাইবার্সের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সুলতানের অনুরোধে ইবনে খাল্লিকান সিরিয়ার কাজিউল কুজাত (প্রধান বিচারপতি) নিযুক্ত হন। উচ্চ ও সম্মানজনক এই পদে অধিষ্ঠিত থেকেও তিনি গবেষণাকর্মে একাগ্র থাকেন। এক পর্যায়ে নিজের গ্রন্থ সম্পূর্ণ করার জন্য তিনি সাত বছর স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন—যা তাঁর জ্ঞানসাধনার প্রতি নিষ্ঠার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১২৮২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন। তবে তার অমর কীর্তি ‘ওফায়াতুল-আ’য়ান’ তাকে অমর করে রেখেছে। গ্রন্থটির পূর্ণ নাম ‘ওফায়াতুল-আ’য়ান ওয়া আনবা আবনায়িয্‌যামান’, যার অর্থ—মৃত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনকথা ও যুগসন্তানদের বিবরণ। আরবি ভাষায় রচিত এই গ্রন্থে মোট ৮৬৫ জন খ্যাতনামা ব্যক্তির জীবনী স্থান পেয়েছে। ইউরোপীয় পণ্ডিত ব্যারন ম্যাকগুকিন দ্য স্লেন এই গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ চার খণ্ডে প্রকাশ করেন, যা পাশ্চাত্য জগতে ইবনে খাল্লিকানের খ্যাতিকে সুদৃঢ় করে।

এই গ্রন্থ কখনোই চূড়ান্ত বা সম্পূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে না—কারণ ইতিহাসের ধারা অবিরাম প্রবাহমান। সেই কারণে পরবর্তীকালে আল-কুতুবী ইবনে শাকির ‘ফাওয়াতুল-ওফায়াত’ নামে এর একটি পরিশিষ্ট রচনা করেন। ‘ওফায়াতুল-আ’য়ান’-এ নবী মুহাম্মাদের (সা.) সাহাবি, তাবেঈ, খলিফা, সুলতান, উজির, কবি, দার্শনিক, ঐতিহাসিক, বিজ্ঞানী ও বিভিন্ন অঞ্চলের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের জীবনী সংকলিত হয়েছে।

Advertisement

গ্রন্থের ভূমিকায় ইবনে খাল্লিকান তার উদ্দেশ্য ও রচনানীতির কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির লোকদের—যেমন শুধু ওলামা, খলিফা বা কবিদের—জীবনী লেখেননি। বরং তিনি তাদেরই নির্বাচন করেছেন, যারা সমাজে ব্যাপকভাবে পরিচিত এবং যাদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কৌতূহল রয়েছে। তিনি সংক্ষিপ্ত অথচ নির্ভুল তথ্য প্রদানে সচেষ্ট ছিলেন, যাতে গ্রন্থটি অযথা ভারী ও একঘেয়ে না হয়। জন্ম-মৃত্যুর তারিখ, বংশপরিচয় ও নামের শুদ্ধতা নিয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। পাশাপাশি তিনি জীবনীতে মনোরম কাহিনি, নৈতিক গুণাবলি ও কাব্যিক উদ্ধৃতি সংযোজন করে পাঠযোগ্যতা বাড়িয়েছেন।

প্রায় ছত্রিশ বছরের শ্রম ও সাধনার ফসল হিসেবে ১২৭৪ খ্রিস্টাব্দের ৪ জানুয়ারি তিনি এই গ্রন্থের রচনা সম্পন্ন করেন। এটি শুধু তথ্যভিত্তিক গ্রন্থ নয়, বরং মুসলিম সমাজজীবনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

প্রখ্যাত প্রাচ্যতত্ত্ববিদ ড. আর. এ. নিকলসন ইবনে খাল্লিকান সম্পর্কে যে মূল্যায়ন করেছেন, তা তার গুরুত্ব অনুধাবনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নিকলসনের মতে, ইবনে খাল্লিকানই প্রথম মুসলিম লেখক যার মনে জাতীয় চরিতাভিধান রচনার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা জন্ম নিয়েছিল। তার গ্রন্থ ভাষাগতভাবে প্রাঞ্জল, তথ্যগতভাবে নির্ভুল এবং ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক উপাদানে সমৃদ্ধ। নিকলসন এমনকি স্যার উইলিয়াম জোন্সের সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, সাধারণ চরিতাভিধানগুলোর মধ্যে ‘ওফায়াতুল-আ’য়ান’ সর্বোত্তম এবং সময় ও পরিবেশ বিবেচনায় বসওয়েলের বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থের সঙ্গে তুলনীয়।

ইবনে খাল্লিকান কেবল একজন ইতিহাসবিদ নন—তিনি মুসলিম সভ্যতার স্মৃতিধারক, সমাজমনস্ক চিন্তাবিদ ও এক অনন্য সাহিত্যশিল্পী। তার ‘ওফায়াতুল-আ’য়ান’ ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে মানবসভ্যতার এক বিস্ময়কর দলিল হিসেবে আজও অম্লান।

ওএফএফ