নগর উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক সেবা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ অবদান রাখায় বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনকে নাগরিক পদক দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। রোববার (১১ ডিসেম্বর) দুপুরে ডিএনসিসির নগর ভবনে এ পদক দেওয়া হয়।
Advertisement
এর মধ্যে উদ্ভাবক বা স্টার্টআপ ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছেন পিউপিল স্কুল বাস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ সোহাগ। তিনি একজন উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা। নগরজীবনের দীর্ঘদিনের একটি জটিল সমস্যাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও বাস্তবসম্মত সমাধানের মাধ্যমে মোকাবিলা করার উপায় দেখিয়েছেন তিনি।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত মহানগরে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট গাড়িনির্ভর যাতায়াতের ফলে সৃষ্ট যানজট, পরিবেশ দূষণ ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি কমাতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দেশের প্রথম সমন্বিত, নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর স্কুল পরিবহন প্ল্যাটফর্ম পিউপিল স্কুল বাস লিমিটেড। জিপিএস ট্র্যাকিং, রিয়েল-টাইম লোকেশন শেয়ারিং, নিরাপত্তা যাচাইকৃত চালক ও সহকারী, শিশুবান্ধব আসন ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের জন্য মোবাইল অ্যাপ- এই সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্তমানে পিউপিল স্কুল বাস লিমিটেডের সেবায় ৪৫টির বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭ হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন যাতায়াত করছে। এর ফলে, একদিকে অভিভাবকদের উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অন্যদিকে, নগরীর রাস্তায় শত শত প্রাইভেট গাড়ির চাপ কমেছে।
একটি বাসে একাধিক শিক্ষার্থী পরিবহনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমাতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালিত এলাকাগুলোতে সকাল ও বিকেলের যানজটের সময়ের গড়ে ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে।
Advertisement
ব্যক্তি উদ্যোগ ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছেন শ্রুতি রানী দে। তিনি একজন দায়িত্বশীল ও সচেতন নাগরিক। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমাজ ও নগরের কল্যাণে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং মানবিক সহায়তায় তার অবদান একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। চলতি বছর তিনি নিজ উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন এবং প্রতি সপ্তাহে এলাকাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে নগরের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন। একইসঙ্গে তিনি প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতনতা সৃষ্টি ও এর যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নিয়মিত কাজ করছেন।
মানবিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে শীত মৌসুমে তিনি অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন। তার নেতৃত্বে গঠিত টিমের মাধ্যমে দুই ঈদে অসহায় মানুষের জন্য ঈদবস্ত্র ও ঈদ বাজার সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
শিশু অধিকার সুরক্ষায় তার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নিজ এলাকায় তিনি টিমকে নেতৃত্ব দিয়ে ১২টি বাল্যবিবাহ বন্ধে সফল হয়েছেন এবং বর্তমানে শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের পুনরায় স্কুলে ফেরানোর উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
স্যোশাল মিডিয়া কনটেন্ট নির্মাণ ক্যাটাগরিতে আপলিফট বাংলাদেশ গত পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে একটি ইতিবাচক, অগ্রসর ও সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে তুলে ধরতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আওতাধীন এলাকাগুলোর ক্রমাগত পরিবর্তন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এব যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রগতিকে নিয়মিত ও দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরা তাদের কনটেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দিক। গুলশান, বনানী, হাতিরঝিল, মিরপুর, উত্তরা ও বিমানবন্দর এলাকার পরিবর্তনশীল নগরচিত্র আপলিফট বাংলাদেশের কনটেন্টে ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে, যা নগর ব্যবস্থাপনা ও জনজীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
Advertisement
পরিবেশবান্ধব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছে ভাষানটেক স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে ভাষানটেক স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেবল শিক্ষাদানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পরিবেশ সচেতনতা বিকাশে ধারাবাহিকভাবে ভূমিকা রেখে চলেছে।
সামাজিক সংগঠন ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছে উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি। উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি জ্ঞানচর্চা, সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবিক সংস্কৃতি বিকাশে একটি ব্যতিক্রমী ও অনুকরণীয় সামাজিক সংগঠন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, সৃজনশীলতা উৎসাহিত করা এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের অবদানকে সম্মান জানানোর মাধ্যমে সংগঠনটি নগরের সাংস্কৃতিক ও মানবিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করছে। পাশাপাশি ‘রত্নগর্ভা মা সম্মাননা’, ‘গর্বিত বাবা সম্মাননা’, ‘স্বপ্নজয়ী নারী সম্মাননা’ এবং কোরআনের হাফেজদের সংবর্ধনার মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজে মূল্যবোধ, পারিবারিক বন্ধন ও মানবিক সম্মানবোধকে তুলে ধরছে।
প্রাণী সুরক্ষা ও প্রাণী অধিকার রক্ষা ক্যাটাগরিতে পদ পেয়েছে প ফাউন্ডেশন। শহরের প্রাণী সুরক্ষা ও প্রাণী অধিকার রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন, আহত ও বিপন্ন প্রাণী উদ্ধার করে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, প্রাণী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে একটি মানবিক ও সহনশীল নগর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে এ ফাউন্ডেশন।
অ্যাডভোকেসি ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছেন হাওয়া বেগম। তিনি একজন সংগ্রামী ও সাহসী নাগরিক নেত্রী, যিনি নগরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, জীবনমান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে সবকিছু হারিয়ে তিনি ঢাকায় এসে কড়াইল বস্তিতে বসবাস শুরু করেন। নিজ জীবনের অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে পরিণত করে তিনি বস্তিবাসীর নানা সমস্যা ও চাহিদা তুলে ধরতে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমে সক্রিয় হন।
সর্বোচ্চ করদাতা ক্যাটাগরিতে নগর উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় রাজস্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ গত অর্থবছরে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৬৭ হাজার টাকা কর পরিশোধের মাধ্যমে সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে অবদান রাখায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে সর্বোচ্চ করদাতা ক্যাটাগরিতে নাগরিক পদক দেওয়া হয়েছে।
নাগরিক পদক প্রদান অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এমএমএ/এএমএ/এমএস