নানা অভিযোগ তুলে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) তিন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। গত ১৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সোমবার (১২ জানুয়ারি) সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতি কার্যকর করে চিঠি ইস্যু করা হয়।
Advertisement
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা হলেন- রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিয়াজোঁ ও প্রটোকল অফিসার ইসমাঈল হোসেন, সেকশন অফিসার ও চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাক্তন সহকারী রেজিস্ট্রার এবং সহকারী কলেজ পরিদর্শক রাসেদুল ইসলাম ও সেকশন অফিসার জামাল উদ্দীন। রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হাসিবুল হোসেন এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, লিয়াজোঁ ও প্রটোকল অফিসার ইসমাঈল হোসেনের বিরুদ্ধে জাল শিক্ষাগত সনদে চাকরি গ্রহণের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। নিয়োগের সময় তিনি স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে প্রাপ্ত বিবিএ সনদ দাখিল করেছিলেন, যা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই শেষে লিখিতভাবে ‘জাল সনদ’ বলে নিশ্চিত করে। যাচাই-বাছাইয়ের আগে ওই জাল সনদ দিয়েই তিনি রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নেন। সিন্ডিকেট সভায় বিষয়টি বিস্তারিত পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, জাল সনদের মাধ্যমে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি গ্রহণ আইনগতভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ হওয়ায় ইসমাঈল হোসেনের নিয়োগ শুরু থেকেই বাতিল ও অকার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। সে অনুযায়ী তার নিয়োগ বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একইসঙ্গে জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরিকালে তিনি যে বেতন, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা হিসেবে গণ্য করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাল সনদ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও সিন্ডিকেট অনুমোদন দেয়।
তবে তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে ইসমাঈল হোসেনের দায়ের করা একটি রিট পিটিশন হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন থাকায় আদালতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তার বিরুদ্ধে চলমান বিভাগীয় কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। এরপরও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত নিয়োগের কোনো বৈধতা না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষা ও সরকারি অর্থের অপচয় রোধে প্রশাসনিক আদেশে তার নিয়োগ বাতিল করা হয়। এ বিষয়ে এফিডেভিটের মাধ্যমে আদালতকে অবহিত করা এবং আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
Advertisement
অন্যদিকে সেকশন অফিসার ও চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাক্তন সহকারী রেজিস্ট্রার ও সহকারী কলেজ পরিদর্শক রাসেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে লিয়াজোঁ ও প্রটোকল অফিসার ইসমাঈল হোসেনের জাল সনদে চাকরি গ্রহণে সহায়তা করতে গিয়ে ফাইল টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে অসদাচরণ এবং একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগের পর্যাপ্ত ভিত্তি পাওয়ায় গত ৭ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয় এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে মো. রাসেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো বিধিমালার ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এবং ৩(ঘ) অনুযায়ী ‘দুর্নীতিপরায়ণতা’ হিসেবে প্রমাণিত হয়। বিষয়টি ১৯তম সিন্ডিকেট সভায় পর্যালোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা প্রায় ২০ বছর ইউজিসি ও রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেছেন। উপাচার্যের সহানুভূতিশীল অভিমত ও সিন্ডিকেট সদস্যদের মানবিক বিবেচনায় তাকে চাকরি থেকে স্থায়ী অপসারণ না করে গুরুদণ্ড হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হবে।
এদিকে সেকশন অফিসার জামাল উদ্দীন ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। নিয়োগপত্রের শর্ত অনুযায়ী তার দুই বছরের প্রবেশনকাল চলমান ছিল। সিন্ডিকেট সভা মনে করে, তার নিয়োগকালীন শর্তাবলি, প্রবেশনকালীন সার্বিক কর্মকাণ্ড ও কর্মদক্ষতা সন্তোষজনক নয়। ফলে নিয়োগপত্রের শর্ত অনুযায়ী প্রবেশনকাল সন্তোষজনক না হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হাসিবুল হোসেন জানান, তিন কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে এবং সোমবার তাদের নামে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। তবে তারা চিঠিগুলো গ্রহণ করেছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
Advertisement
সাখাওয়াত হোসেন/এফএ/জেআইএম