ইলিয়াস মশহুদ
Advertisement
আরবি বর্ষপঞ্জিতে রজব একটি বিশেষ ও মর্যাদাপূর্ণ মাস। এর পূর্ণ নাম ‘রাজাবুল মুরাজ্জাব’, যদিও সাধারণভাবে আমরা একে শুধু রজব মাস বলেই জানি। নামটির মধ্যেই রয়েছে গভীর অর্থ। ‘রজব’ শব্দের অর্থ হলো সম্ভ্রান্ত, মহান বা প্রাচুর্যময়। আর ‘মুরাজ্জাব’ মানে সম্মানিত। অর্থাৎ রজব হলো ‘প্রাচুর্যময় ও সম্মানিত মাস’।
ইসলামপূর্ব জাহিলি যুগেও মানুষ এ মাসকে অত্যন্ত সম্মান করত। সে কারণেই তারা এর নাম রেখেছিল রজব। ইসলামও এই মাসটিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। এই মাসের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কাছে গণনায় মাস ১২টি। তার মধ্যে ৪টি (সম্মানিত হওয়ার কারণে) নিষিদ্ধ মাস, এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান।’ (সুরা তাওবা: ৩৬)
মর্যাদাপূর্ণ মাস চারটি হলো: জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। মর্যাদার এ মাসটিতে আল্লাহ তাআলা যাবতীয় যুদ্ধ-লড়াই, হানাহানি ও রক্তপাত নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।
Advertisement
আবু বাকরা (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলার আসমান-জমিন সৃষ্টি করার দিন থেকেই সময় চক্রাকারে ঘুরছে। আর বছর হলো ১২ মাসে। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত; তিনটি একাধারে জিলকদ, জিলহজ ও মুহাররম এবং চতুর্থটি হলো ‘রজবে মুদার’, যা জমাদিউল আখিরা ও শাবানের মধ্যবর্তী মাস। (সহিহ বুখারি: ৩১৯৭, সহিহ মুসলিম: ১৬৭৯)
মর্যাদার এ মাসটি মুমিনদের জন্য ইবাদতের মাস। বরকত লাভের মাস। কেননা রাসুল (সা.) এই মাসে বেশি করে ইবাদত-বন্দেগি করতেন। রোজাও রাখতেন। আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত পশ্চিম আকাশে রজবের চাঁদ দেখা গেলেই রাসুল (সা.) আবেগময় কণ্ঠে বরকতলাভের আশায় নিচের দোয়াটি নিজে পড়তেন এবং উম্মতকেও পড়তে বলতেন:
اَللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِىْ رَجَبَ وَ شَعْبَانَ وَ بَلِّغْنَا رَمَضَانَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবানা ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।
Advertisement
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। (আদ-দাওয়াতুল কাবির লিলবায়হাকি: ৭৭৪)
এ কারণে রজব শুরু হতেই মুমিনরা রমজানের প্রতীক্ষায় দিন গুণতে থাকে। ‘আল্লাহহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান…’ এই দোয়া পড়া হতে থাকে নিয়মিত। ফলে এ মাসকে বরকতময় রমজানের আগমনীবার্তা বলা হয়ে থাকে।
রজবের পরেই আসে ‘শাবান’। এই মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি আবার বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। রমজানের মাত্র ১৫ দিন আগে তাই শবে বরাত এসে মৃমিন হৃদয়ে আলাদা এক উত্তাপ ছড়ায়। কারণ রমজান তখন আসি আসি করছে। তাই এই সময়টায় মুমিনহৃদে প্রশান্তির পাশাপাশি অন্যরকম একটা আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ভয় বিরাজ করে। ভয় বলতে মৃত্যুর ভয়; রমজান যেন কোনোভাবে মিস না হয়।
শাবানের পূর্ণ নাম হলো ‘আশ শাবানুল মুআজ্জাম’ অর্থাৎ, মহিমান্বিত শাবান। রাসুল (সা.) রমজানের আগের দুই মাস অর্থাৎ, রজব ও শাবানে বেশি বেশি নফল ইবাদত ও রোজা রাখার অভ্যাস করতেন।
আম্মাজান আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) শাবান মাসের (দিন-তারিখের হিসাবের) প্রতি বেশি লক্ষ রাখতেন, যা অন্য মাসের ক্ষেত্রে রাখতেন না। (সুনানে আবু দাউদ: ২৩২৫)
উম্মে সালমা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) শাবান মাস ছাড়া বছরের আর কোনো মাস পুরোটা রোজা রাখতেন না, তবে শাবানকে রমজানের সঙ্গে মিলিয়ে নিতেন। (সুনানে আবু দাউদ: ২৩৩৬)
অর্থাৎ, রাসুল (সা.) শাবান ও রমজান ছাড়া অন্য কোনো দুই মাসে একাধারে রোজা রাখতেন না।
আয়েশা (রা.) আরও বলেন, আমি রাসুল সা.-কে শাবান মাসের মতো এত বেশি নফল রোজা আর অন্য কোনো মাসে রাখতে দেখিনি। এ মাসের সামান্য কয়েক দিন ছাড়া সারা মাসই রোজা রাখতেন। (সহিহ বুখারি: ১৯৬৯)
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত একবার রাসুলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞেস করা হলো রমজানের পর কোন মাসের রোজা সবচেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ? রাসুল (সা.) বললেন, রমজানের সম্মানার্থে শাবানের রোজা। প্রশ্নকারী আবার বললেন, কোন (সময়ের) দান-সদকা সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন? তিনি বললেন, রমজান মাসের দান-সদকা। (সুনানে তিরমিজি: ৬৬০)
সাহাবি ও নবীপত্নীরাও বেশ গুরুত্বসহকারে শাবানে রমজানের প্রস্তুতি নিতেন। যারা শাবানে রোজা রাখতেন না, রাসুল (সা.) তাদেরকে রমজানের পরে অতিরিক্ত দুটি রোজা রাখতে উপদেশ দিতেন।
ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) তাকে অথবা অপর কাউকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি শাবানের মধ্যভাগে রোজা রেখেছিলে? তিনি বললেন, না। তখন রাসুল (সা.) বললেন, যখন তুমি রোজা রাখোনি, তাহলে তুমি রমজানের পরে দুটি রোজা রেখে নিয়ো। (সহিহ মুসলিম: ১১৬১)
নবীজিকে (সা.) অনুসরণ করে আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত, রজব ও শাবান থেকেই রমজানের প্রস্তুতি শুরু করে দেওয়া। বিশেষত কোরআন তিলাওয়াত, নফল রোজা ও তাহাজ্জুদের সময় বের করা। আল্লাহর কাছে দোয়া করা, তিনি যেন আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন।
ওএফএফ