১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষিত এই নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা আনুপাতিক হারে মাত্র ৪ শতাংশ। একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে নারীদের এত কম অংশগ্রহণ, সমাজের একটি ভারসাম্যহীন চিত্রের প্রতিফলন বলে মনে করছেন নারী অধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
Advertisement
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য বলছে, এবার মোট দুই হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ১০৯ জন, যা মোট প্রার্থীর মাত্র চার শতাংশের সামান্য বেশি। অথচ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী।
নারী অধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একটি জাতীয় নির্বাচনে নারীদের এত কম অংশগ্রহণ সমাজে বিদ্যমান কাঠামোগত বৈষম্য ও পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। তাদের আশঙ্কা, জাতীয় নির্বাচনে নারীর কম উপস্থিতি ভবিষ্যতে নারী অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে আরও দুর্বল করে তুলবে।
‘অশনিসংকেত’ হিসেবে দেখছেন অধিকারকর্মীরা
Advertisement
নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনে মাত্র ৪ শতাংশ নারী প্রার্থী থাকা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এক ধরনের অশনিসংকেত। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কম থাকলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও নারীর কণ্ঠ আরও দুর্বল হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি
গেলো সোমবার (১২ জানুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের সদস্যরা অভিযোগ করেন, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ন্যূনতম প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করেনি। ঘোষিত ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দলগুলো ব্যর্থ হয়েছে, যা নারী নেতৃত্বের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহারই বহিঃপ্রকাশ।
আরও পড়ুন:
Advertisement
৩০টির মতো রাজনৈতিক দলের কোনো নারী প্রার্থী নেইরাজনৈতিক দলগুলো কেন আলাদা নারী শাখা রাখবে?
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে।
জুলাই জাতীয় সনদ ও বাস্তবতার ফারাক
‘নারী প্রার্থী মনোনয়নের সংকট: রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের ব্যবধান এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি’ শিরোনামে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫-এর ধারা ২২(খ)-(ঘ) অনুযায়ী, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে এবারের সংসদীয় নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে তা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দলই এই ন্যূনতম শর্ত পূরণ করতে পারেনি। ন্যূনতম ৫ শতাংশ মনোনয়নও নারীর ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের জন্য যথেষ্ট নয়। তাদের দাবি, সাধারণ আসনে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
‘ন্যূনতম শর্ত না মানলে আস্থার সংকট তৈরি হয়’
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, জুলাই সনদের ন্যূনতম প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ দলগুলোর জনসমক্ষে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ন্যূনতম শর্তও যখন মানা হয় না, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হওয়াটাই তো স্বাভাবিক।
প্রকাশক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, নারী অধিকারকর্মীরা বরাবরই ৫ শতাংশ মনোনয়নের বিরোধিতা করে আসছেন। গত বছরের ৯ অক্টোবর নারী সংগঠনগুলো এ দাবি নিয়ে সমাবেশ করে। সেখানে প্রশ্ন তোলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলো কি নারীদের জিতিয়ে আনার জন্য বাস্তবে সহায়তা দিচ্ছে? পুরুষ প্রার্থীদের জন্য যেভাবে সহায়তা দেওয়া হয়, নারীদের ক্ষেত্রেও কি একই সমর্থন রয়েছে? নির্বাচনে নারীর জন্য সমক্ষেত্র আদৌ তৈরি করা হয়েছে কি না সে প্রশ্নও আসে।
‘অনেক নারী আগ্রহী, সুযোগ পান না’
নারীপক্ষের সদস্য সাদাফ সায্ সিদ্দিকী বলেন, অনেক নারী নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী হলেও তাদের সুযোগ দেওয়া হয় না। প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হলে আরও অনেক নারী রাজনীতিতে এগিয়ে আসতেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যখন ৫ শতাংশ মনোনয়নের ন্যূনতম প্রতিশ্রুতিও রাখে না, তখন তাদের নির্বাচনি ইশতেহারের ওপর জনগণ কেন আস্থা রাখবে?
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
জুলাই সনদে নারীর মনোনয়নের বিষয়ে ন্যূনতম ঐকমত্য থাকা সত্ত্বেও কেন রাজনৈতিক দলগুলো তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলো, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান আরও ১২টি সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে যেকোনো নির্বাচনি নীতিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্ত ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
বক্তারা বলেন, নারী প্রার্থী মনোনয়নকে কোনো অনুগ্রহ বা প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবে না দেখে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দলীয় কার্যক্রম, মনোনয়ন প্রক্রিয়া ও নেতৃত্ব বিকাশে বাস্তব ও কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন:
নারীদের কর্মঘণ্টা নিয়ে কেন এত আলোচনা?আপনারা আমাদের সুযোগ দেন, ভবিষ্যতে নারীরা সামনে আসবে
‘মানসিক কাঠামোর পরিবর্তন হয়নি’
গত বছরের নভেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় নারীদের নিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছি।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাজনৈতিক দলগুলো কেন আলাদা ‘নারী শাখা’ রাখবে? নারীরা মূলধারার রাজনীতিতেই সমানভাবে কাজ করতে পারবেন, এই মানসিকতা এখনও গড়ে ওঠেনি।
শারমীন এস মুরশিদ আরও বলেন, আমাদের সমাজে যে স্বৈরাচারী মূল্যবোধ ও বৈষম্যমূলক ধারণা রয়ে গেছে, তারই বহিঃপ্রকাশ রাজনীতিতে দেখা যায়। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও এই মানসিক কাঠামোর পরিবর্তন ঘটেনি।
৭১ সংগঠনের ক্ষোভ ও উদ্বেগ
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা আশানুরূপ না হওয়ায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়নবিষয়ক ৭১টি সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম ‘সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি’। কমিটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, এবার নারী প্রার্থী ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ, যা নারী-পুরুষের জনসংখ্যাগত অনুপাতের তুলনায় একটি ‘বিশাল ভারসাম্যহীন চিত্র’।
বিবৃতিতে বিস্ময় প্রকাশ করে আরও বলা হয়, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল থেকেই কোনো নারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এমনকি যে দলগুলো তাদের নেতৃত্বের ৪০ শতাংশ নারী বলে দাবি করে, সেখান থেকেও কোনো নারী প্রার্থী নেই।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যে ১০৯ জন নারী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন, তাদের মধ্যে ৭২ জনকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, বাকি ৩৭ জন হলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। তারা বলছে, ক্ষমতা কাঠামোতে নারীর অংশগ্রহণ ‘এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ’। নারীবিদ্বেষী সংস্কৃতি যেভাবে চলমান, সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নারীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণে শঙ্কা বোধ করছেন। এটি সমাজে পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চিত্রের প্রতিফলন এবং একইসঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতি টিকিয়ে রাখার একটি কৌশলও বটে।
এসএনআর/এমএমএআর/এমএস