মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করাা শুল্কের চাপ সত্ত্বেও ২০২৫ সালের শেষ দিকে শক্তিশালী গতি বজায় রেখেছে চীনের রপ্তানি। দেশটির উৎপাদন সক্ষমতা অটুট থাকায় বছরে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত পৌঁছেছে রেকর্ড উচ্চতায়।
Advertisement
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) দেশটির শুল্ক বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে ডলারভিত্তিক চীনের রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা যেখানে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
গত বছরের নভেম্বরেও চীনের রপ্তানি ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছিল, যা মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপ থেকে বাড়তি চাহিদার ফল। পুরো ২০২৫ সালে চীনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে, যা ২০২৪ সালের ৫ দশমিক ৮ শতাংশের তুলনায় সামান্য কম।
ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি ৩০ শতাংশ কমে যায়। এটি ছিল টানা নবম মাসের মতো পতন, যদিও অক্টোবরের শেষ দিকে দুই দেশ একটি বাণিজ্য যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছিল। নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমেছিল ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ।
Advertisement
তবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির এই বড় পতন পুষিয়ে গেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকায় রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে। ডিসেম্বর মাসে এসব অঞ্চলে রপ্তানি যথাক্রমে ১২ শতাংশ, ১১ শতাংশ ও ২২ শতাংশ বেড়েছে।
পণ্যের ধরন অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে চীনা সেমিকন্ডাক্টরের রপ্তানি বেড়েছে ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ ও যানবাহন রপ্তানি বেড়েছে ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে একই সময়ে জুতা ও খেলনার রপ্তানি কমেছে।
এদিকে, ডিসেম্বরে চীনের আমদানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ হারে, যা রপ্তানির তুলনায় ধীরগতির। পুরো বছরে আমদানি প্রায় অপরিবর্তিত থাকায় চীনের বার্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১৮৯ ট্রিলিয়ন ডলারে (এক ট্রিলিয়ন = ১ লাখ কোটি)। এটি ২০২৪ সালের আগের রেকর্ড ৯৯২ বিলিয়ন ডলারকে ছাড়িয়ে গেছে।
এই বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতার একটি বড় কারণ হলো বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমানোর চীনের নীতি, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নিকট ভবিষ্যতে এই প্রবণতা বদলানোর সম্ভাবনা কম।
Advertisement
ফরাসি ব্যাংক সোসিয়েতে জেনেরালের অর্থনীতিবিদরা গত সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, আত্মনির্ভরতা অর্জনে চীনের লক্ষ্য শুধু দেশটির রপ্তানিকেই শক্তিশালী করেনি, বরং আমদানির প্রবণতাও কমিয়েছে। তারা বলেন, মূল্য সংযোজনের উচ্চ ধাপে ওঠার ফলে চীনের অটোমোবাইল খাত এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
চীনের সাধারণ শুল্ক প্রশাসনের উপ-প্রধান ওয়াং জুন বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সাংবাদিকদের জানান, যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চিপ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আমদানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, কিছু দেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ইস্যুকে রাজনৈতিক রূপ দিচ্ছে ও নানা অজুহাতে চীনে উচ্চপ্রযুক্তি পণ্য রপ্তানি সীমিত করছে। তা না হলে আমরা আরও বেশি আমদানি করতাম।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্পত্তি খাতের দীর্ঘস্থায়ী মন্দা ও ভোক্তাদের আস্থাহীনতার কারণে চলতি বছরও চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেকটাই রপ্তানিনির্ভর থাকবে।
ইউবিএসের জ্যেষ্ঠ চীন অর্থনীতিবিদ ঝাং নিং বলেন, শক্তিশালী ইউয়ান, ব্যবসায়িক লেনদেনে বাধা/জটিলতা ও কর ছাড় কমানোর মতো অভ্যন্তরীণ নীতির কারণে ২০২৬ সালে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বিনিয়োগ ব্যাংকটি ২০২৬ সালে চীনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
ঝাং নিং সাংহাইয়ে ইউবিএসের বার্ষিক বিনিয়োগ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বলেন, তবে এতে চীনের রপ্তানি খাতের শক্তিশালী বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ঢেকে যাবে না, কারণ পণ্যের মান উন্নত ও দাম তুলনামূলকভাবে অনুকূলেই থাকবে।
ম্যাককোয়ারি ব্যাংকের প্রধান চীন অর্থনীতিবিদ ল্যারি হু মনে করেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি বাড়ায় আগামী দিনগুলোতেও চীনের রপ্তানি ‘স্থিতিশীল’ থাকবে। তিনি চলতি মাসের শুরুতে এক নোটে লেখেন, ২০২৬ সালে যদি রপ্তানি প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা রক্ষায় বেইজিং অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ প্রণোদনা দিতে পারে। প্রণোদনা প্যাকেজের আকার নির্ভর করবে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির পতনের মাত্রার ওপর।
সূত্র: নিক্কেই এশিয়া
এসএএইচ