লাইফস্টাইল

গর্ভপাতের গল্পে দায় কি শুধুই নারী-শরীরের

কোনো নারীর অপ্রত্যাশিত গর্ভপাত হলে আমাদের সমাজে সেই নারীকেই দোষারোপ করার একটা চল আছে। শিক্ষিত অনেক পরিবার আবার সরাসরি দোষারোপ না করলেও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নারীর হরমোন, খাওয়া-দাওয়া, হাটাচলা, বয়স – এসবের প্রসঙ্গ তুলে আনে।

Advertisement

অথচ আধুনিক চিকিৎসা গবেষণা বলছে, গর্ভপাতের দায় সব সময় নারীর শরীরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার শিকড় লুকিয়ে থাকে পুরুষের শুক্রাণুর ভেতর। বিশেষ করে শুক্রাণুর ডিএনএ-তে।

গর্ভপাত আসলে কেন হয়

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, অধিকাংশ গর্ভপাত ঘটে ভ্রূণের ক্রোমোজোমগত ত্রুটির কারণে। অর্থাৎ ভ্রূণের জেনেটিক গঠন ঠিকভাবে তৈরি না হওয়ায়। এই জেনেটিক উপাদানের অর্ধেক আসে মায়ের ডিম্বাণু থেকে, আর অর্ধেক আসে বাবার শুক্রাণু থেকে। ফলে শুক্রাণুর মান খারাপ হলেও ভ্রূণের জিনগত স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

শুধু শুক্রাণু নয়—গর্ভপাতের পেছনে আরও কিছু কারণ কাজ করে। যেমন, নারীর থাইরয়েড বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকা, জরায়ুর গঠনগত সমস্যা, গুরুতর সংক্রমণ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং বয়সজনিত ডিম্বাণুর গুণগত পরিবর্তন। তবে আধুনিক গবেষণা জোর দিয়ে বলছে — পুরুষের ভূমিকা আর উপেক্ষা করার মতো নয়।

Advertisement

আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দম্পতির বারবার গর্ভপাত হচ্ছে, এমন দম্পতিদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ পুরুষের শুক্রাণুতে ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ শুক্রাণুর ভেতরের জেনেটিক তথ্য ক্ষতিগ্রস্ত থাকছে, যা ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

তবে এর মানে এই নয় যে সব গর্ভপাতের ৩০ শতাংশের জন্য শুক্রাণুই দায়ী। চিকিৎসকেরা বলছেন, অধিকাংশ গর্ভপাত এখনও ভ্রূণের ক্রোমোজোমগত ত্রুটির কারণে হয়, তবে শুক্রাণুর খারাপ মান সেই ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, বিশেষ করে বয়স, জীবনযাপন ও পরিবেশগত চাপের সঙ্গে মিলিত হলে তা আরও বেড়ে যেতে পারে।

শুক্রাণুর ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন কী?

সহজভাবে বললে, শুক্রাণুর ভেতরের ডিএনএ যদি ভাঙা বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাকে বলা হয় ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন। বাইরে থেকে শুক্রাণু দেখতে স্বাভাবিক হলেও ভেতরের জেনেটিক তথ্য যদি ছেঁড়া থাকে, তবে নিষেক ঘটলেও ভ্রূণ ঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। ফলাফল হতে পারে — বারবার গর্ভপাত, ভ্রূণের বৃদ্ধি থেমে যাওয়া বা গর্ভপাত।

কেন শুক্রাণুর ডিএনএ নষ্ট হয়?

শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ আছে—>> দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ>> ধূমপান>> মদ্যপান>> স্থূলতা>> অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস>> অতিরিক্ত তাপ (যেমন ল্যাপটপ কোলে রাখা)>> পরিবেশ দূষণ এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিএনএ মিউটেশনের ঝুঁকি বৃদ্ধি। এসব কারণ শুক্রাণুর জেনেটিক স্থিতিশীলতা ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়।

Advertisement

দোষারোপ নয়, বোঝাপড়াই সমাধান

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — গর্ভপাত কোনো একক ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়। এটি একটি জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া, যেখানে নারী ও পুরুষ—দু’জনের শরীরই সমানভাবে জড়িত। শুক্রাণুর ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লে নারীর ওপর অযথা অপরাধবোধ, সামাজিক চাপ ও মানসিক আঘাত অনেকটাই কমানো সম্ভব।

আজ বিজ্ঞান স্পষ্ট করে বলছে — গর্ভধারণের দায় শুধু নারীর নয়। সুস্থ সন্তান আসার পথে পুরুষের শরীর, জীবনযাপন ও জেনেটিক স্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: পাবমেডে, মায়ো ক্লিনিক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট

এএমপি/জেআইএম