দেশজুড়ে

খাসিয়া-চা শ্রমিক: পাশাপাশি বাস অথচ জীবনযাত্রা আকাশ-পাতাল তফাৎ

পাশাপাশি দুটি জাতির বসবাস। দূরত্ব বলতে এক থেকে দু’শো মিটার সর্বোচ্চ। মাঝে বয়ে চলেছে ছোট একটি ছড়া। যা পৃথক করেছে চা শ্রমিক ও খাসিয়া জনগোষ্ঠীকে। একটি জাতির জুমে পান চাষ করে কিছুটা ভাগ্য বদলালেও অপর জাতি চা চাষ বা চা বাগানে কাজ করে রয়ে গেছে সেই অন্ধকারেই। বলছি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ডবল ছড়া খাসিয়া পুঞ্জি ও ডবল ছড়া বা সুনছড়া চা বাগানের শ্রমিকদের কথা।

Advertisement

জানা যায়, ডবল ছড়াকে কেউ বলেন দেবল ছড়া। আবার সুনছড়া নামেও পরিচিত সীমান্তবর্তী এই চা বাগান। এই এলাকায় প্রায় ৩ হাজার চা শ্রমিকের বসবাস। ঘনবসতি থেকে প্রায় ৮-১০ কিলোমিটার দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় এই এলাকায়। এখানে চা বাগানের বাসিন্দাদের জন্য নেই কোনো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাসস্থান বা সুচিকিৎসার ব্যবস্থা। এলাকার শ্রমিকেরা বংশ পরম্পরায় বাগানে কাজ করেও বদলায়নি জীবন নামের ভাগ্যের চাকা।

চা বাগানের ঠিক পাশেই রয়েছে ডবল ছড়া খাসিয়া পুঞ্জি। এখানকার পরিবেশ ঠিক উল্টো। প্রায় অর্ধশতাধিক খাসিয়া পরিবারের বসবাস এই পুঞ্জিতে। তাদের মূল পেশা পানচাষ। পান চাষ করে কিছুটা হলেও জীবনযাত্রা পরিবর্তন হয়েছে, তা পরিবেশেই বোঝা যায়। বছরের বেশিরভাগ সময় পান বিক্রি করে আয়ের টাকায় চলে জীবন ও সংসার। বাজারে পানের দাম যত বেশি আয়ের সংখ্যাও তত বেশি।

সরেজমিনে সীমান্তবর্তী ডবল ছড়া চা বাগান এলাকা ও খাসিয়া পুঞ্জিতে দেখা যায়, যে কেউ ইচ্ছা করলেও পুঞ্জিতে প্রবেশ করতে পারবে না। পুঞ্জির মন্ত্রী বা হেডম্যানের অনুমতি পেলে প্রহরী গেট খুলে ভেতরে প্রবেশ করান। অনুমতি না মিললে ফিরে আসতে হবে। খাসিয়ারা জুম থেকে পান সংগ্রহ করে পুঞ্জিতে নিয়ে আসেন। এসব পান নারীরা বিক্রির জন্য পরিপাটি করেন। পুঞ্জিতে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন উপাসনালয়, বিদ্যালয়। পাহাড়ের ওপর পরিপাটি দোতলা, পাকা, আধা পাকাসহ মাটি ও বাঁশের বেড়ার ঘর। নিচ থেকে ওপরে ওঠার জন্য রয়েছে একাধিক পাকা সিঁড়ি। দেখলে মনে হবে কেউ যেন পর্যটকদের জন্য সুন্দর পরিপাটি করে কটেজ সাজিয়ে রেখেছে।

Advertisement

অপরদিকে চা বাগানে রয়েছে মাটি ও বাঁশের ঘর। ছোট ছোট ঘরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। সুনছড়া চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে ভাঙা একটি বিদ্যালয় রয়েছে। এখানকার বাসিন্দারা বঞ্চিত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার থেকে।

ডবল ছড়া খাসিয়া পুঞ্জির কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে জীবনযাপন করে আসছেন। প্রতিদিন পান সংগ্রহ করে বিক্রি করে জীবন চলে। যে যতবেশি পান চাষ করবেন তার আয় ততই বেশি। বর্তমানে এক কুড়ি পানের বাজার মূল ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। যা অনায়াসে বিক্রি করা যায়। পুঞ্জি থেকে পাইকার এসে পান নিয়ে যায়। পান চাষে খরচ বাড়লেও এখনোও প্রায় অর্ধেক লাভ হয়। বছরে একেকজন কয়েক লাখ টাকার পান বিক্রি করতে পারেন।

একই এলাকার চা শ্রমিকরা জানান, সারাবছর ১৭৮ টাকা মজুরিতে কাজ করতে হয়। একটি পরিবার থেকে মাত্র একজন শ্রমিক নিয়মিত বাগানে কাজ করতে পারেন। পরিবারের একজন কাজ করলে বাকি ৪ সদস্য বেকার থাকতে হচ্ছে। দূর্গম এই এলাকা থেকে বাইরে কাজে যাওয়াও অনেক কষ্টের। যাতায়াত ব্যবস্থা নেই। সবাই কষ্ট করে জীবনযাপন করছে। নেই পর্যাপ্ত খাবার ও থাকার ব্যবস্থা।

খাসিয়া জনগোষ্ঠী

Advertisement

সিলেট অঞ্চলে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ রয়েছে। যারা বংশপরম্পরায় তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রায় আগের চেয়ে অনেক উন্নতি ঘটেছে। বাংলাদেশের সিলেট ও ভারতের মেঘালয় অঞ্চলের মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত নৃগোষ্ঠী, যাদের মাতৃপ্রধান সমাজ, পান চাষে বিশেষ দক্ষতা এবং ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রার জন্য পরিচিতি রয়েছে। বেশিরভাগ খাসিয়া উঁচু জায়গায় বসবাস করেন। তাদের গ্রামকে ‘পুঞ্জি’ বলা হয়। তারা মূলত কৃষিনির্ভর হলেও এখন অনেকেই আধুনিক পেশায় যুক্ত। তবে তাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। খাসিয়া জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ পুরুষ জুমে পান চাষ করেন। আর নারীরা সেই পান পরিপাটি করে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করেন। এটাই তাদের মূল আয়ের উৎস।

চা বাগানের জনগোষ্ঠী

সেই ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনা শ্রমিকদের বংশধর, যারা বংশ পরম্পরায় চা বাগানে কাজ করছেন এখনো ১৭৮ টাকা মজুরিতে। স্বতন্ত্র প্রান্তিক চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর শিকড় বহু পুরোনো হলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৪ বছর পরও এখনো শোষণ ও বঞ্চনার ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, চা শ্রমিকেরা সবসময় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। রাষ্ট্র উদ্যোগ না নিলে এই বৈষম্য দূর হবে না।

খাসিয়া জনগোষ্ঠী বিষয়ে তিনি বলেন, খাসিয়ারা সরকারিভাবে বিভিন্ন সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি চাকরির জন্য তাদের কোটা রয়েছে, এজন্য তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে। এছাড়া আরও বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে তারা।

এম ইসলাম/এফএ/এমএস