সকালে উঠেই কার্টুন, দুপুরে মোবাইলে ভিডিও, রাতে ঘুমের আগে আবার স্ক্রিন—আজকের শিশুর দৈনন্দিন জীবনে স্ক্রিন যেন নিত্যসঙ্গী। অনেক অভিভাবকেরই অভিযোগ, বেশি কার্টুন দেখলে বাচ্চারা মনোযোগ হারায়, পড়তে বসতে চায় না, অল্পতেই অস্থির হয়ে ওঠে।
Advertisement
এত দিন ধারণা ছিল—ভিডিওর দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তনই বুঝি এর জন্য দায়ী। তবে নতুন গবেষণা বলছে—সমস্যা ভিডিওর গতিতে নয়, গল্পের ‘অযৌক্তিকতায়’।
সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, বিষয়টি সরল নয়। সমস্যার মূল কারণ ভিডিওর গতি নয়, বরং সেখানে দেখানো ফ্যান্টাস্টিকাল বা বাস্তবতার নিয়ম ভাঙা কনটেন্ট।
কোন গবেষণার কথা বলা হচ্ছে?এই তথ্য উঠে এসেছে - দ্য ইফেক্টস অব ফ্যান্টাস্টিকাল কনটেন্ট অন চিল্ডরেন’স এক্সিকিউটিভ ফাংশন - শীর্ষক একটি গবেষণা থেকে। গবেষণাটি ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল চাইল্ড সাইকোলজি–তে।
Advertisement
এই গবেষণায় মূলত দেখা হয়েছে — কার্টুন বা ভিডিওর ধরন শিশুদের মানসিক সক্ষমতার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে।
গবেষকরা প্রিস্কুল বয়সী শিশুদের কয়েকটি দলে ভাগ করে এক দল শিশুকে ফ্যান্টাস্টিকাল কনটেন্ট দেখতে দেন, যেখানে বাস্তব জগতের নিয়ম ভেঙে যায় - প্রাণী কথা বলে বা বস্তু হঠাৎ উড়ে যায়।
আরেক দল শিশুকে দেখানো হয় রিয়ালিস্টিক কনটেন্ট, যেখানে গল্প ও দৃশ্য বাস্তবসম্মত, বাস্তব জীবনের নিয়ম মেনে চলে।
ভিডিও দেখার পর শিশুদের ওপর নেওয়া হয় কিছু এক্সিকিউটিভ ফাংশন টেস্ট। সেই টেস্টে তাদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা, ওয়ার্কিং মেমোরি, নিজের আচরণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা ইত্যাদি দেখা হয়।
Advertisement
গবেষণাটির ফল বেশ চমকপ্রদ। গবেষণার ফলাফল দেখায় যে, ভিডিওর দ্রুত গতি বা দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তন শিশুদের মনোযোগ কমানোর প্রধান কারণ নয়। বরং ফ্যান্টাস্টিকাল বা অযৌক্তিক কনটেন্ট দেখার পর শিশুদের এক্সিকিউটিভ ফাংশন সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
অর্থাৎ, কার্টুন দেখার পর শিশুরা কিছু সময়ের জন্য কম মনোযোগী, একটু বেশি অস্থির বা নির্দেশ মানতে অনীহা দেখাতে পারে।
তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো - এই প্রভাব স্থায়ী নয়। সাধারণত ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই শিশুর মানসিক সক্ষমতা আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে।
কেন ফ্যান্টাস্টিকাল কনটেন্টে এমন হয়?গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শিশুর মস্তিষ্ক খুব দ্রুত চারপাশের জগতের নিয়ম শেখে। যখন স্ক্রিনে এমন কিছু দেখানো হয় যা সেই নিয়ম ভেঙে দেয় - যেমন, একটি গরু কথা বলছে বা মানুষ হঠাৎ উড়ে যাচ্ছে - তখন শিশুর মস্তিষ্ক বাড়তি মানসিক শক্তি খরচ করে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করে।
এই অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণেই মনোযোগ, স্মৃতি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক শক্তি সাময়িকভাবে কমে যায়।
তাহলে কি কার্টুন দেখানো বন্ধ করা উচিত?গবেষকরা কার্টুন দেখা বন্ধ করতে বলছেন না। কারণ কার্টুন বা ফ্যান্টাসি খারাপ নয়, বরং কখন এবং কীভাবে দেখা হচ্ছে, সেটাই আসল বিষয়।
গবেষকদের মতে, শিশুকে ফ্যান্টাস্টিকাল ভিডিও দেখার পর সঙ্গে সঙ্গে পড়াশোনা বা কঠিন কাজ না করানো ভালো। ১০–১৫ মিনিট বিরতি দিলে মনোযোগ আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে।
আবার মাঝে মাঝে বাস্তবসম্মত কনটেন্ট বেছে নেওয়া উপকারী। বাবা-মা পাশে বসে গল্পটা ব্যাখ্যা করলে শিশুর বোঝাপড়া বাড়ে, মানসিক চাপও কমে।
তবে কনটেন্ট ফ্যান্টাসি নির্ভর হোত আর বাস্তবসম্মত হোক, অনিয়ন্ত্রিত সময়ের জন্য শিশুকে স্ক্রিনের সামনে রাখা তার জন্য উপকারী নয়।
সূত্র: সাইপোস্ট
এএমপি/জেআইএম